প্রভাতের ফুল সন্ধ্যায় ঝরে যায় : জীবনের বাঁকে বাঁকে

১ নভেম্বর ছড়াকার ইসমাইল হোসেনের অকালমৃত্যুতে শোকাহত হয়ে লেখাÑ

হ এস আর শানু খান

ফেসবুকে প্রতিনিয়ত বিভিন্নজনের রিকোয়েস্ট আসে। আর সবার বেলায় কেমন জানি না তবে আমার কাছে ফেসবুকে নতুন নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসা মানে এক নতুন আনন্দ। নিজেকে কেমন যেন একটা মনে হয়। মাঝে মধ্যে যখন মন ভালো হয় একচোটে সব অ্যাকসেপ্ট নিই। এভাবেই হয়তো আমার ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড হয়েছিল ছেলেটি। একদিন একটা মেসেজ এলো ‘ভাইয়া আপনি কি মাগুরার? আমি উত্তরে জানালাম, হ্যাঁ। সে-ও জানাল সে মাগুরার আড়পাড়া থাকে। আমার থানা ও গ্রামের নাম শুনে বলল, আপনি কি সাংবাদিক? আপনার লেখাগুলো খুব ভালো লাগে। অনেক দিন ধরে আপনার লেখা পত্রিকায় পড়ি। আর ফেসবুকে আপনার নাম লিখে সার্চ দিই; কিন্তু পাই না। অনেক কষ্ট করে পেয়েছি। যা হোক আমি তাকে বললাম, না আমি কোনো সাংবাদিক নই। পেশা নয় শখের বশে লেখালিখি করি টুকিটাকি। মাঝে মধ্যে সেই লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় ছেপে ফেলে। এই আর কি ভাই! মেসেজ এলো ‘আমিও টুকিটাকি লেখালিখি করি! পত্রিকায় পাঠাই; কিন্তু কোনো পত্রিকায় আসে না।
এরপর সে কিছু পত্রিকার মেইল চাইল। নানা রকম কথা হলো। আমাকে ২৯ পৌষে তাদের এলাকায় অনুষ্ঠিত পৌষমেলা দেখার আমন্ত্রণ জানাল। এরপর প্রায়ই নানা রকম মেসেজ দিত আমাকে। কখনো উত্তর দিতে পারতাম আর কখনো দিতে পারতাম না। এরপর ফেসবুকে আমার প্রতিটা পোস্টেই নানা রকম কমেন্ট দিত। মজা করত। আড়পাড়া আমাদের এখান থেকে বেশি দূরে নয়; কিন্তু সচরাচর যাওয়া হয় না। তাই তো ওর সাথে দেখা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি কখনো। ছেলেটির নাম ইসমাইল হোসেন। মাগুরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা করেছিল। এখানে পড়াকালেই তার লেখালিখিতে হাতেখড়ি হয়েছিল। লেখক হওয়ার স্বপ্ন বাসা বেঁধে ছিল তার হৃদয়কুঠিরে। তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে রোজই নানা রকম স্ট্যাটাস বের হতো। মজার মজার সব স্ট্যাটাস। ছন্দে ছন্দে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখত এক দুই লাইন করে। ফেসবুক মারফত জানতে পারলাম সে ঢাকায় আছে এবং একটা বেসরকারি অনলাইন পোর্টালে কাজ করছে। তার নিজের পোর্টালে নানা বিষয় নিয়ে মাঝে মধ্যে লিখে। এরপর একদিন আমাকে মেসেজ দিলো। মেসেজটা ছিল ‘ভাই আমি একটা শিশুদের ছড়ার বই বের করেছি। নাম ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। পারলে এক কপি সংগ্রহ করিয়েন।’ আমি বললাম চেষ্টা করব। আসলে সত্য বলতে গেলে আমি এমন একটা মানুষ যে বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রত্যন্ত একটা অজপাড়াগাঁয়ের হতদরিদ্র ঘরের এক কর্মা। এক কথায় বলা যায় হতচ্ছাড়া। জীবনে এক পয়সা রোজগার করতে পারিনি। আব্বুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে নেট কিনি আর সেই নেট দিয়ে পেপারে লেখা পাঠাই। তা আবার ফেসবুকে পোস্ট করি। এটাই আমার কাজ। আর তাই তো ছোট ভাই ইসমাইল হোসেনের লেখা ছড়ার বইটাও কখনো সংগ্রহ করা হয়নি। তবে এটুকু বলতে পারি যে, ইসমাইলের লেখা ভালো হওয়ারই কথা, কেননা আমি দেখেছি সাহিত্যের প্রতি ছিল তার এক অনন্য ভালোবাসা, আগ্রহ ও উৎসাহ। বয়সে ছোট হলেও বাংলা সাহিত্য নিয়ে সে বড় বড় স্বপ্ন দেখত। বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে দেশের বড় বড় লেখকের বই সংগ্রহ করত। বই পড়ার অনুভূতি শেয়ার করত সবার সাথে।
২৪ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত ১০টায় ফেসবুকে তার দেয়া স্ট্যাটাস ‘এতটাই অসুস্থ বোধ করছি যে, বসে থাকাটা যন্ত্রণাদায়ক। মাথায় প্রচুর যন্ত্রণা, আমার জ্বর। গা কাঁপছে। আমার সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন।’
বি: দ্র: এইটা পোস্ট দিতাম না। দিলাম এই কারণে যে, এখন আমি একা, খুবই একা, পাশে বসে একটু সেবা বা সান্ত¡না দেয়ার মতো কেউই নেই। চার দেয়ালের মধ্যে আমার নিঃসঙ্গ আকুতি। বাড়িতে থাকলে মা পাশে থেকে সেবা করত। অসুস্থতার কথা মাকে জানাইনি। এমনিতেই মা আমার জন্য একটু বেশিই টেনশন করে। একাকিত্ব আমার যন্ত্রণাটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এই পোস্টের মাধ্যমে আপনাদের কাছে দোয়া কামনা করছি। আপনারা দোয়া করলে হয়তো দ্রুত সুস্থতা পেতে পারি।
যদি বলেন অসুস্থতা নিয়ে ফেসবুকে কেন?
‘আসলে আপনাদের সবুজ সিগন্যালে ভাবছি যে, আমি একা নই!’
এটাই তার শেষ স্ট্যাটাস।
দিনটি ছিল ৩ নভেম্বর। রোজ শুক্রবার। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে ঢুকতেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একটা স্ট্যাটাস চোখে পড়েÑ ছড়াকার ইসমাইল হোসেন আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই পৃথিবীর সব বাঁধন ছিঁড়ে পাড়ি জমিয়েছে এক অন্য ভুবনে। যেখানে যাওয়া যায়; কিন্তু আর ফেরা যায় না। ফেসবুকে স্ট্যাটাস থেকে একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মুখের সব ভাষা কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। বিমর্ষ হয়ে তাকিয়ে রইলাম ইসমাইলের ছবির দিকে।
আসলে এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। এখানে কেউই চিরকাল থাকবে না। জন্মিলে মরিতে হইবে এটাই নিয়ম। এটাই নিয়তি। হয়তো কারো আগে কারো বা খানিকটা পরে। তবে জীবের মৃত্যু অনিবার্য। জন্মের সময়ই প্রতিটি মানুষ একটা নির্দিষ্ট সময় আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আবির্ভূত হয় এবং সময় শেষ হলেই, আয়ু অস্তমিত হলেই জীবন নামের বৃত্ত থেকে ছিটকে পড়ে। তাই তো বলতে হয়... এটাই প্রকৃতির নিয়ম। মানুষের জীবন যতই সৌর্ন্দযময় হোক না কেন ফুলের মতোই দিন ফুরালে ঝরে যেতে হয়। মানুষের জীবন ফুলের মতো। যেমন করে প্রভাতের ফুল সন্ধ্যায় ঝরে যায়।
মনোখালী, হরিতলা, শালিখা, মাগুরা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.