রবিউল এখন সফল ব্যবসায়ী

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

রবিউল। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ভুশ্চি গ্রামের দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলু বাবুর্চির তৃতীয় ছেলে। ছোটখাটো গড়নের অল্প বয়সী হাসিখুশি মানুষ রবিউল। কিন্তু অল্প বয়সী হলেও তিনি নিজে একাই একটি প্রতিষ্ঠান। বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজে রবিউল সবার কাছে পরিচিত একটি নাম। ‘রবিউল কন্ট্রাক্টর’ নামে সবাই চেনেন। নিজের অধ্যবসায় ও কর্মদক্ষতায় চতুর্দিকে তার চাহিদাও আজ আকাশচুম্বী। এই বয়সে তিনি স্বনির্ভরতা অর্জন করার পাশাপাশি শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন। সৃষ্টি করে যাচ্ছেন বর্তমানে চাকরির দুর্লভ বাজারে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সহজ ও চাট্টিখানি কথা নয়, অথচ শতাধিক মানুষের নিয়মিত রুটি ও রুজিরোজগারের ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন রবিউল। তার অধীনে প্রতিদিন অনেক মানুষ কাজ করে যাচ্ছে। তারা নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছে, তেমনি আয়রোজগার করে পরিবারেরও ভরণপোষণ করে যাচ্ছে। তারা তাদের পরিবারের মুখে নিত্যহাসি ফুটিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে শ্রমবাজারে বাংলাদেশী শ্রমিকদের চাহিদা অনেক বেশি। প্রতি বছর এ দেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিক ভাগোন্নয়নে নিজের শেষ সহায় সম্বলটুকু বিক্রি করে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমাচ্ছে। কেউ কেউ উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে থালাবাটি বিক্রি করে বিদেশে যাচ্ছে চাকরির অন্বেষণে। যদিও ওখানে গিয়ে বেশির ভাগ শ্রমিককে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কনস্ট্রাকশনের কাজ করে যেতে হচ্ছে। তদুপরি মাস শেষান্তে বেশির ভাগ শ্রমিকের মজুরিও নানা ছলছুতোয় আটকে যাচ্ছে। কখনো কখনো এভাবে মাসের পর মাস কাজ করেও দেশে অপেক্ষমাণ পরিবার-পরিজনের জন্য তারা কার্যত কোনো টাকা পাঠাতে পারছেন না। ফলে দেশের মাটিতে অভাব অনটনে জর্জরিত পরিবারগুলো ধুঁকে ধুঁকে সীমাহীন দুঃখকষ্টে সদা ক্ষতবিক্ষত হতে দেখা যায়। তাদের আর্তনাদ ও আহাজারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রবিউলের মুখোমুখি হলে অনেক অজানা বিষয় বেরিয়ে আসে। তিনি জানান, কনস্ট্রাকশন কাজে বেড়ে ওঠার গল্প। পরিবারের তৃতীয় ছেলে হলেও পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক ছিল তার খুব বেশি। পারিবারিক আর্থিক দৈন্য ও টানাপড়েনের কারণে পড়ালেখার দৌড় প্রাইমারি গণ্ডি পেরিয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রথম দিকে বড় ভাই আকতার মিয়ার কাঠ-ফার্নিচারের দোকানে কাজ শুরু করলেও মেজো ভাই শহিদের সাথে স্টিল ওয়ার্কশপের দোকানেও কিছু দিন কাজ করেন। এরপর একদিন অভাবের সংসারে রাগ করে বেরিয়ে যান রবিউল। এক বছর পর্যন্ত রাস্তার ঠিকাদারিতে জোগালি কাজে সহায়তা করেন। এরপর বাড়ি এসে পরিবারের সম্মতি নিয়ে আরো দুই বছর ধরে ঠিকাদারি কাজে নিজেকে পুরোপুরি ব্যস্ত রাখেন। এরপর একদিন বাড়ি ফিরে এসে নিজের উদ্যোগে এলাকায় স্বল্পপরিসরে কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু করেন। মাত্র তিন-চারজন জোগালি সাথে নিয়ে রবিউল কাজে নেমে পড়েন। নিজের শ্রম আর অধ্যবসায়ের জোরে আজ রবিউল একজন বড় কন্ট্রাক্টর। শতাধিক লোক আজ তার সাইটে প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে রবিউল জানান, মানুষের সহযোগিতা ও অব্যাহত সমর্থন পেলে এ কাজে নিজেকে আরো মেলে ধরতে চাই। নিজেকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে চাই। আজ রবিউল নিজেই জানালেন, তার পরিবারে কোনো দুঃখ-দুর্দশা কিংবা কষ্টের লেশমাত্র নেই। নিজে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে না পারলেও নিজের সন্তানদের প্রয়োজনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে রবিউল বদ্ধপরিকর ও প্রত্যয়ী। পাশাপাশি বেকার তরুণ-যুবকদের কর্মসংস্থানে নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে এগিয়ে আসতেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রবিউল নিজেই জানালেন, একটু সচেতন ও কর্মঠ হলে এই অযাচিত দুঃখকষ্ট থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাওয়া যায়। তিনি স্বীয় কর্ম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন, একটু চেষ্টা ও সচেতন হলে নিজ দেশে থেকেও আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী হওয়া যায়। আজ রবিউলের কনস্ট্রাকশন সাইটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শতাধিক লোক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মজার বিষয় হচ্ছে, মাস শেষে তাদের অর্জিত টাকা বৈদেশিক প্রাপ্ত রেমিট্যান্স থেকেও কোনো অংশে কম নয়। এ বিষয়ে কথা বলেছি কাউসার মিয়ার সাথে। যিনি বৃহত্তর রংপুরের বাসিন্দা হলেও রবিউলের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় চার বছর ধরে। হাসিমুখে জানালেন, তিনি প্রতি মাসে তার পরিবার-পরিজনের জন্য টাকা পাঠিয়ে থাকেন। বর্তমানে তার পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা নেই বললেই চলে। তার দেখাদেখি রংপুর থেকে অনেকেই বর্তমানে এই সাইটে কাজ করে যাচ্ছেন। তারাও তাদের পরিবারের জন্য সমান অবদান ও যথাযথ ভূমিকা রাখছেন। তাদের পাঠানো টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়ালেখাও চালিয়ে যাচ্ছেন। নীলফামারীর বাসিন্দা সুমন মিয়া। তিনিও কথা বললেন চোখেমুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে। বিদেশে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে তিনি আজ এখানে দুই বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। আজ নিজেই বললেন, পায়ের তলায় মাটি কিছুটা হলেও খুঁজে পেয়েছি। আশা করছি, শরীর সুস্থ থাকলে আরো কয়েক বছরের মধ্যে নিজের পায়ের তলার মাটি আরো শক্তপোক্ত করে তুলতে পারবেন। দেশের দারিদ্র্যবিমোচন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে ছোট্ট রবিউলের অবদান মোটেও কম নয়। অনেক বড় ও সাফল্যমাখা। তার ঈর্ষান্বিত সাফল্য বর্তমান দিশেহারা বেকার যুবসমাজের জন্যও দৃষ্টান্ত হতে পারে। রবিউল বেকারদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের ওপর বসা বেকারত্বের বিরাট বোঝা কিছুটা হলেও লঘু করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন মাত্র। বর্তমান বেকারত্বের গ্লানিময় পরিবর্তিত সময় ও পরিস্থিতিতে এটাই বা কম কী।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.