গাড়ি নয় প্রাধান্য দিতে হবে মানুষকে

উড়াল সড়ক উপকারী না আত্মঘাতী (শেষ)
মেহেদী হাসান

গাড়ি চলাচলের জন্য একের-পর-এক উড়াল সড়ক না বানিয়ে হাঁটা ও সাইকেল চলার রাস্তা বানানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা বিশ্বে ভয়াবহ দূষিত বাতাসের নগরীর তালিকায় বারবার উঠে আসছে ঢাকার নাম। অপর দিকে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য নগরীর তালিকায়ও বারবার স্থান করে নিচ্ছে ঢাকা। চলতি বছর মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত বিশ্বের ভয়াবহ দূষিত বাতাসের নগরীর তালিকায় ঢাকার স্থান পঞ্চম। বিষাক্ত অ্যামোনিয়া বাতাসের হিসাবে তালিকায় ঢাকার স্থান দ্বিতীয়। ঢাকার বাতাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫১ গুণ বেশি বিষাক্ত অ্যামোনিয়া রয়েছে। নাসার তথ্যে বলা হয়েছে ১০ বছরে ঢাকার বাতাসে বিষাক্ততা বেড়েছে ৮০ ভাগ।
অপর একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তালিকায় বিষাক্ত বাতাসের নগরীর তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি, তারপরই ঢাকা।
আর চলতি বছর বসবাসের উপযুক্ততার দিক দিয়ে বিশ্বের ২৩০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান হয় ২১৪ নম্বরে। পরিবেশ অধিফতরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যেসব কারণে ঢাকার বাতাস দূষিত হচ্ছে তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ব্যাপক সংখ্যক গাড়ির ধোঁয়া।
নির্দিষ্ট পরিমাণ বাতাসে যেখানে ভাসমান ক্ষতিকর পদার্থের মাত্রা (পিপিএম) ১০০ পার হলে বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে সেখানে ঢাকায় এর মাত্রা ৪১৬ পিপিএম। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকার বাতাসে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ছয়গুণ বেশি বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে। এ তথ্য অনুযায়ী নগরের মানুষ বাতাসের সাথে ক্রমাগতভাবে টেনে নিচ্ছে বিষ। আক্রান্ত হচ্ছে নানা ধরনের জটিল রোগে। অনেকে মারা যাচ্ছে এ দূষণজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে শহর মানুষের জন্য, গাড়ির জন্য নয়। মানুষ তার প্রয়োজনে যানবাহন ব্যবহার করে। সে জন্য পরিবহন পরিকল্পনায় মানুষকে আগে প্রাধান্য দিতে হবে। কিন্তু আমাদের নগর পরিবহন পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে যানবাহনের জন্যই হলো শহর, মানুষের জন্য নয়। যেভাবে পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তাতে গণপরিবহনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এতে করে ভবিষ্যতে ঢাকার বাতাস দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য নগরীতে পরিণত হতে পারে ঢাকা। এ ছাড়া অধিক যানবাহনের কারণে যদি সমস্ত রাস্তা গাড়ির দখলে চলে যায় এবং প্রচণ্ড যানজটের কারণে গাড়ির কোনো গতি না থাকে, মানুষ ঠিকমতো চলাচল না করতে পারে এবং ভোগান্তি পোহাতে হয় তবে সে ক্ষেত্রেও যানবাহনে চড়ার উপযুক্ততা হারিয়ে যায়। বায়ুদূষণের কারণে দিল্লি ছাড়তে শুরু করেছে অনেকে। সেখানে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বন্ধ রাখতে হচ্ছে স্কুল। বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার জন্যও এ পরিণতি অপেক্ষা করছে যদি এখনই সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক প্রফেসর নজরুল ইসলামের মতে হাঁটাকেন্দ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা সাজাতে পারলে যানজট সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে। যারা হেঁটে যাতায়াত করে তাদের অধিকার সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।
রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ হেঁটে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের প্রায় সবাই হেঁটে যাতায়াত করেন। যারা যানবাহনে চড়েন তাদেরও কমবেশি হাঁটতে হয়। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও অসংখ্য মানুষ হাঁটেন। কিন্তু হেঁটে যাতায়াতকারী বিপুল সংখ্যক এ মানুষের জন্য বর্তমানে হাঁটার কোনো ভালো পরিবেশ নেই। অনেকে শহরে হেঁটে যাতায়াত করতে চান কিন্তু পরিবেশের অভাবে তারা হাঁটতে পারছেন না। যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক সময় মানুষ গাড়ি থেকে নেমে হাঁটার চেষ্টা করেন কিন্তু পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করে যে, হাঁটারও সাধ্য থাকে না এ নগরীতে। বিশেষজ্ঞদের মতে হাঁটার উন্নত ব্যবস্থা এবং পরিবেশ থাকলে অনেক মানুষ হেঁটে যাতায়াত করার ব্যাপারে উৎসাহী হতো। এতে যানবাহনের ওপর চাপ অনেক কমত। কমত যানজটও। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে হাঁটাকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থা সাজাতে হবে যানজট কমাতে হলে। এতে এক দিকে পরিবেশ দূষণ কমবে অন্য দিকে রক্ষা হবে মানুষের স্বাস্থ্য। শহর হবে বাসোপযুক্ত। তাদের মতে যারা হেঁটে যাতায়াত করে তাদের সুবিধা সবার আগে নিশ্চিত করা উচিত। কারণ তারা যানবাহন ব্যবহার করে না, মূল্যবান তেল খরচ করে না, পরিবেশ দূষণ করে না এবং যানজট সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছে না। সারা বিশ্বে এখন পথচারীদের প্রাধান্য দিয়ে নগর পরিবহন ব্যবস্থা সাজানো হচ্ছে।
লন্ডন মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের সাবেক ম্যানেজার, রুয়ান্ডা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ও আন্তর্জাতিক পরিবহন প্রকৌশলী ড. মাহবুবুল বারী বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত শহরে এখন রাস্তার চেয়ে ফুটপাথ বেশি চওড়া করা হয়েছে মানুষের হাঁটার জন্য। কিন্তু ঢাকায় কোনো কোনো রাস্তার ফুটপাথ সরু করে রাস্তা প্রশস্ত করা হয়েছে গাড়ির সুবিধার জন্য। এ ছাড়া ব্যাপকভাবে উড়াল সড়ক নির্মাণ করতে গিয়েও বিশ্বের অনেক শহরে ফুটপাথ রাস্তার সাথে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। মানুষের হাঁটার সুযোগ বন্ধ করে গাড়িতে চড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও যানজট কমাতে পারেনি।
ড. বারী বলেন, অধিক যান্ত্রিক নির্ভর হয়ে পড়া এবং শারীরিক পরিশ্রম না করায় সারা বিশ্বে বর্তমানে অধিক ওজন, স্থূলতা এবং স্থূলতাজনিত নানাবিধ রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশ্বের অনেক দেশ হাঁটাকেন্দ্রিক নগর পরিবহন ব্যবস্থা সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অনেকে হাঁটাকে ব্যবহার করছেন যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০২ সালে স্বাস্থ্য দিবসের শ্লোগান ছিল ‘স্বাস্থ্যের জন্য হাঁটুন’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতির লক্ষ্যে একটি নীতিমালা তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে মানুষকে যাতায়াতের জন্য হাঁটতে বা সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করার দায়িত্ব সরকারের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের ৫১টি দেশ মিলে ১৯৯৯ সালে সাইকেল এবং হাঁটাকেন্দ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটি চার্টার প্রকাশ করে।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, নেদারল্যান্ডসে বর্তমানে ৮৩ ভাগ শিশু স্কুলে যায় সাইকেলে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে শতকরা ৩৩ ভাগ চলাচল হয় হেঁটে। জার্মানির মতো ধনী দেশে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বে শতকরা ৮০ ভাগ লোক হেঁটে যাতায়াত করে। অনেক আগে নিউ ইয়র্কে চার হাজার কিলোমিটার সাইকেল লেন গড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কলাম্বিয়ার রাজধানী বগোতায় সাইকেলের জন্য ২০০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের পর থেকে স্থূলতার পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়েছে বিশ্বে। ২০১৪ সালে বিশ্বে ১৮ বছরের ওপরে ১৯০ কোটি মানুষ অধিক ওজনের সমস্যায় ভোগেন। এর মধ্যে ৬০ কোটি মানুষ স্থূলতায় আক্রান্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, সারা বিশ্বে বছরে ৩০ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মারা যায় অধিক ওজন, স্থূলতা এবং এ সংক্রান্ত নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে। ২০১২ সালে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় কার্ডিওভাসকুলার রোগে (প্রধানত হৃদরোগ এবং স্ট্রোক)। আর এ রোগের জন্য অন্যতম দায়ী হলো স্থূলতা। ডায়াবেটিক রোগীদের ৪৪ ভাগ এ রোগে আক্রান্ত হন স্থূলতার কারণে। হৃদরোগীদের মধ্যে ২৩ ভাগ এ রোগে আক্রান্ত হন স্থূলতার কারণে। স্থূলতার অন্যান্য কারণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে শারীরিক পরিশ্রম না করা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং নগর পরিকল্পনার ত্রুটির কারণে মানুষ অধিক ওজন এবং স্থূলতায় আক্রান্ত হচ্ছে।
ড. বারী বলেন, যাতায়াতে যানবাহন ব্যবহার করা বিত্তের প্রতীক নয় আর হেঁটে চলা দারিদ্র্যের লক্ষণ নয়। পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ঢাকা, জাকার্তা প্রভৃতি শহরে মাত্র এক কিলোমিটার পথ যেতেও বাসে চড়তে হয়। অথচ জার্মানরা এই দূরত্ব সাইকেলে বা সাধারণত হেঁটে যাতায়াত করে।
নির্বিচার উড়াল সড়কের বিরোধিতা করে ড. মাহবুবুল বারী বলেন, ইউরোপের কোনো শহরেই ১০ থেকে ১৫ ভাগের ওপরে রাস্তা নেই কিন্তু সেসব শহরে তেমন কোনো যানজট নেই। আবার বিশ্বে অনেক শহর আছে যেখানে ঢাকার সমান এমনকি ঢাকার চেয়ে কম রাস্তা আছে কিন্তু উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণে যানজট নেই। তাই ঢাকায়ও যানজট নিরসনে উন্নত ব্যবস্থাপনার প্রতি জোর দিয়ে ড. বারী বলেন, যানজট নিরসনে যতই উড়াল সড়ক বানানো হোক যদি টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায় এবং ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনা না হয় তবে যানজট থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.