আজও থামেনি যে ঝড়

আহমেদ উল্লাহ্

‘দুকাপ চা দাও মামা’, বলেই টুলের ওপর বসতে বসতে মুহিত আবারও বলল, ‘দুধ বাড়িয়ে দিও, আর এক পেকেট কফি মিক্স করতে ভুল করো না কিন্তু; বন্ধু ফয়সালকে দাওয়াত করে এনেছি তোমার দোকানের চা খাওয়াব বলে।’

বসতে গিয়ে এঁটো চা ও পানি পড়ে টুলটি ভেজা দেখে কিছুটা বিরক্তভেজা স্বরে মুহিত বলল, ‘এলাকার ভদ্দর লোকেরা তোমার দোকানে চা খেতে আসে, টুল-টেবিল পরিষ্কার করে রাখবা না; নেকড়াটা দাও; নিজেই পরিষ্কার করে নেই।’
একজন দক্ষ ও রুচিসম্মত চা বিক্রেতা হিসেবে হাতেম আলীর সুনামটা দীর্ঘ পঁচিশ বছরের। রাস্তার পাশের ছোট্ট টঙ দোকানটির ওপর ভর করে টিকে আছে ওর ছোট্ট সংসারের রুটি-রুজি। ছোটবড় অনেকেরই একটা ভিড় সবসময় লেগে থাকে দোকানে।
চায়ের কাপে গরম পানি ঢালতে ঢালতে হাতেম আলী বলল, ‘এক আতে কয়দিক সামাল দেমু কও! অন্তত ওই আতটাও যদি থাকত, তাইলে দুই আত হমানে চালাইতাম।’
হাতেম আলীর ডানহাতটা নেই, তার সঙ্গে ডান পা-টাও অকেজো; বাঁ-হাত দিয়েই সব কাজ সামাল দিতে হয়। এতেও হাতেম আলীর এতটুকুও দুঃখ নেই কারণ, একটি হাত ও একটি পা জীবনের চেয়ে বড় নয়। বাম হাতে চা-কাপটি ধরে, মোহিতের দিকে বাড়িয়ে হাতেম আলী বলল, ‘লও মুহিত।’
হাত বাড়িয়ে মুহিত কাপটি নিয়ে ফয়সালের হাতে দিয়ে, অপর কাপটির জন্য হাত পেতে বসে আছে। অপর কাপটি মুহিতের হাতে দিতে দিতে হাতেম আলী বলল, ‘মুখে দিয়া দ্যহো, চিনি লাগলে কইয়ো।’
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এক ঢোঁক চা গিলে ফয়সাল বলল, ‘বাহ! চমৎকার! বাঁ-হাতের চা-ই এত মজা! মামার ডান হাতটি থাকলে, হয়তো বোঝা যেত চায়ের আরো কত রকমের স্বাদ আছে।’
ঠোঁট থেকে চায়ের কাপটি নামিয়ে টুলের ওপর রেখে, একটি সিগারেটে আগুন ধরিয়ে মুহিত বলল, ‘তোমার বাঁ-হাতের কত চা খেয়ে তৃপ্তিতে মন ভরিয়েছি, অথচ একবারও জানতে চাইনি যে, তোমার ডানহাতটি কী করে বাহু থেকে বিচ্ছিন্ন হলো।’
কেটলি থেকে ঢাকানাটি উঠাতে গিয়ে ঢাকানায় সঞ্চিত তাপে চট্ করে হাত থেকে ছিটকে পড়ল নিচে। যে ইটের ওপর ভর করে চুলাটি বসে আছে, সেই ইটের সঙ্গে আঘাত খেয়ে ঝনঝন শব্দ করে উঠল। হাত বাড়িয়ে টঙের নিচ থেকে ঢাকনাটি তুলে এককাপ পানিতে ধুয়ে পুনরায় কেটলির মুখে চাপিয়ে আর্দ্র কণ্ঠে হাতেম আলী বলল, ‘যেই তুফান আইজও থামে নাই, হেই তুফানের কতা আর মনে কইরো না। মনে হইলেই দুনিয়ার কাম-কাইজ থাইম্যা যায়! কোনো বুঝ মানতে চায় না মন।’
বিস্ময়াভূত চাহনিতে তাকিয়ে থাকল মুহিত, বলল, ‘তুফান! তুমি কোন তুফানের কথা বলছ?’
ক্যাশের ওপর সাজিয়ে রাখা বিড়ি-সিগারেটের সারি থেকে বিড়ির প্যাকেট খুলে একটি বিড়ি ঠোঁটে ঝুলিয়ে কাগজ দিয়ে চুলা থেকে আগুন এনে ধরিয়ে বেদম টানতে শুরু করল হাতেম আলী...
হা-করে ধোঁয়া ছেড়ে, বাষ্পবৎ উড়ে চলা ধোঁয়ার দিকে বাষ্পাকুল চোখে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে হাতেম আলী বলল, ‘ঊনসত্তরের ঘূর্ণিঝড়, যে ঘূর্ণিঝড়ের কতা শ্রীমদ্দির মানুষ আইজও ভুলবার পারে নাই, অহনো বহুলোক খোয়াবে ওই ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব দেইখ্যা হাউমাউ কইর‌্যা চিল্লাইয়া ওঠে।’
ভুরু কুঁচকিয়ে হাতেম আলীর দিকে তাকিয়ে থাকল মুহিত! আতঙ্ক ও হতাশার কালো আঁধার যেন আচমকা এসে ছায়া মেলে বসেছে হাতেম আলীর রুক্ষ চেহারায়, চোখের কোটরায় ভয়সঙ্কুল বাষ্পবিন্দু সৌদামিনীর আলোতে ঝলমল করছে! নিজের অজান্তে কয়েক ফোঁটা অশ্রু চোখের পাপড়ি ভেদ করে শুভ্র দাড়ির ফাঁকে জমাট বেঁধেছে!
‘শ্রীমদ্দি, কোন জায়গায়?’ মুহিতের জিজ্ঞাসা হাতেম আলীর ঠোঁট চিরিয়ে আর কোনো শব্দ বের করতে পারেনি। ভেজা পাখির মতো চুপটি মেরে বসে বিড়ি টানছে আর থিরথির করা চোখে তাকিয়ে থাকল!
ক’দশক আগের কোনো এক সন্ধ্যায় শ্রীমদ্দি গ্রামের ওপর প্রকৃতির এক উলঙ্গ অত্যাচারের দৃশ্যগুলো ভয় ও আতঙ্কের কাঁপন জাগিয়ে হাতেম আলীকে বাস্তব জগত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল ঊনসত্তরের ওই দিনগুলোতে...
মেঘনা নদীটি যে ভূ-খণ্ড দিয়ে কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জকে দু’দিকে রেখে এগিয়ে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে, তার পশ্চিম পাড়ে সুবিশাল জায়গাজুড়ে কদমীরচর; পূর্ব পাড়ে শ্রীপতিরচর, এর উত্তর প্রান্তে শ্রীমদ্দি গ্রাম, কুমিল্লার সর্ব উত্তর ও পশ্চিম কোন। কৃষি ও নদীনির্ভর শ্রীমদ্দি গ্রামটি আশপাশের কয়েক উপজেলায় আয়তন ও জনসংখ্যায় বড়। হিন্দু-মুসলমানের এক অনন্য মেলবন্ধন, স্ব স্ব ধর্মাদির পূজা ও উৎসবে একে অপরের সাথী হয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায় নিদ্বির্ধায়। চর ও আবাদি জমির গোলাভরা চাল এবং মেঘনার তরতাজা মাছ গ্রামবাসীকে খাদ্যের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে।
মেঘনার নির্মল বাতাস আর ঢেউয়ের কলকল বিমুগ্ধ জলসঙ্গীত গ্রামের মানুষের মনে সুখের স্বপ্ন দেখায়। এমন সুখের পালকিতে চড়ে দিন অতিবাহিত হওয়ার সময় আচমকা এক দৈব-দুর্বিপাকে শ্রীমদ্দিবাসীর ভবিষ্যৎ জীবন মোড় নেয় অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে...
সময়টা পাকিস্তান আমলের শেষদিক। পুরো দেশ তখন পরাধীনতার নিগড়েবদ্ধ, পাকিস্তানি শাসক-শোষণের নেমির তলে পিষ্ট হয়ে শতাব্দীর সঞ্চিত ক্ষোভ ও ঘৃণায় ফুঁসে ওঠে জটপাকানো পানখ সাপের মতো চুপ করে আছে বাঙালি জাতি; কেবল ছোবল মারার সময় গুনছে...
ঊনসত্তরের বৈশাখের প্রথম দিন। বিকাল হওয়ার আগেই আকাশজুড়ে মেঘের গর্জন শুরু হয়। আকাশের গর্জিত মেঘপুঞ্জ, বিস্ফারিত বিজলির আগুন, আকাশ ও মাটি কাঁপানো ভয়শঙ্কুল বজ্রপাত মানুষের মনে অজানা আশঙ্কার জন্ম দেয়। ত্বরিত হাতের কাজ ফেলেই কৃষক-শ্রমিক মাঠ ছেড়ে বাড়ির দিকে দে দৌড়...
চরে ঘাস খাওয়ায় মগ্ন গরু-বাছুরগুলোও নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে দাপাদাপি শুরু করে খুঁটিতে আটকানো রশি ছিঁড়ে ফেলার জন্য। কিছু কিছু বলদ ইতোমধ্যে খুঁটির রশি ছিঁড়ে কিংবা খুঁটি উপড়ে দৌড়াতে শুরু করল গাঁয়ের দিকে...
কে আশ্রয়ে ফিরছে, কে-বা এখনও ফিরতে পারেনি; সেই অপেক্ষা না করে মাঝারি ধরনের বাতাসসহ বৃষ্টি শুরু হলো। টানা দু-এক ঘণ্টা ভারী বর্ষণের পর বৃষ্টি পুরোদমে থেমে গেল ঠিকই কিন্তু আকাশের বুক মেঘমুক্ত হয়নি। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরই শুরু হয় শিলা বর্ষণ; বৃষ্টি নেই কেবল শিলা পড়ছেÑ টিনের ওপর সজোরে নিক্ষেপিত পাথর খণ্ডের আঘাতের মতো ঠনঠন শব্দ করে। মানুষ নির্বাক, নিঃস্তব্দ ও হতবিহ্বল! বৃষ্টিবিহীন শিলা পতিত হওয়া শ্রীমদ্দিবাসী এই প্রথম দেখল। সন্ধ্যার কিছুটা আগে শিলাবর্ষণের অবসান হলে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোয় মানুষ। পথে-ঘাটে, ফসলের মাঠে শিলাখণ্ডের স্তূপ দেখে সবাই স্তম্বিত, হতচকিত! লোকের মুখে একই কথাÑ এটি খোদায়ী গজব ছাড়া কিছুই নয়।
শিলাবর্ষণের পর থেকেই প্রকৃতি ঝিম ধরে কী এক গম্ভীরতার জাল বুনছে! চার দিক সুনসান, গতিহীন, প্রাণ-চাঞ্চল্যহীনতায় মূক হয়ে আছে গোটা প্রকৃতি। সাড়াশব্দ নেই, গাছের শাখা-প্রশাখাও কেমন নীরব, ঝিম ধরে আছে, অনড় পাতাগুলোও যেন কেমন স্তব্ধতায় আড়ষ্ট। প্রতিদিনের মতো সেদিনের সন্ধ্যায় পাখিদের ওড়োউড়ি, ডাকাডাকি কিংবা নীড়ে ফেরার আনন্দ চোখে পড়েনি।
সন্ধ্যা হওয়ার আগেই কোত্থেকে কুয়াশাবৎ ধোঁয়া এসে জড়ো হতে থাকল... বোঝার উপায় নেই এখনো সন্ধ্যা হলো কিনা!
স্ত্রীর উদ্দেশ্যে হায়দার আলী বলল, ‘কই গো হাতেমের মা, অহনো আজান পড়ে না ক্যান? চার দিক কেমন আন্ধার হইয়া আইল, অহনো কি সইন্ধ্যা হয় নাই?’
ঘর থেকে বের হয়ে দুয়ারে এসে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির এমন ঝিমধরা স্তব্ধ পরিস্থিতি দেখে, বাড়ির দক্ষিণ দিকের হিজল গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়েই হতবাক হয়ে পড়ল হায়দার আলী!
তালতলীর সামনে মেঘনার মাঝ পানির উপরিভাগ থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে ধোয়ার মতো কী যেন আকাশ স্পর্শ করে এগিয়ে আসছে উত্তর দিকে...
উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে বড়ভাই মুনছর আলীর উদ্দেশ্যে হায়দারের হাঁক- ‘ময়নার বাপ ঘরে আছো নি? জলদি বাইর হইয়া দেইখ্যা যাও- গাঙের মধ্যে ধুমার মতন কী জানি শ্রীমদ্দির দিকে আইত্যাছে! দুনিয়া বুঝি ধ্বংস হইয়া যাইব আইজ।’
মুনছর আলী ঘর থেকে বেরুবার সময়ও পায়নি, হায়দার আলীও ঘরে ঢোকার সময় পায়নি। তুফান শুরু হলো...
ঘরে ঢোকার সময় আচমকা ঘরের চাল ভেঙে মাথায় আঘাত করে মাটিতে ফেলে দিল হায়দার আলীকে। বাতাসের ঘূর্ণনে হায়দার আলীকে কখনো মাটিতে কখনো শূন্যে দোলাতে থাকল...
ঘরের চাল উড়ে গেছে দেখে হায়দারের স্ত্রী চিৎকার করে দশ-বারো বছরের পুত্র হাতেম আলীকে জড়িয়ে ধরে ঘর থেকে বেরোবার সময় ঘরের বেড়াসমেত খুঁটি উড়ে এসে আছড়ে পড়ল ওদের ওপর। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মা ও পুত্র! হাতেম আলীও চিৎকার করে কঁকিয়ে উঠল! ঘরের বেড়াটি তার ডানহাত ও পায়ের ওপর এমনভাবে চেপে বসেছে যে, চেষ্টা করেও বেড়াটিকে সরাতে পারছে না হাতেম আলী। কঁকানো কণ্ঠে ‘বাঁচাও... বাঁচাও’ বলে জোর গলায় চিৎকার করতে থাকল হাতেম আলী। একসময় বেড়াটি তার ওপর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু সে কিছুতেই শোয়া থেকে উঠতে পারল না; মাটিতে লুটিয়ে থাকাবস্থায়ই কঁকিয়ে কাঁদছে...
প্রকৃতির বিরূপ আচরণে অসহায় হয়ে পড়ল মানুষ ও জীবকুল! ঘন আঁধার আর জোর বাতাসের ঘূর্ণনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না! মানুষের চিৎকার ও বাতাসে ঘূর্ণনরত অবস্থায় কোথায় কী ঘটছে কিছুই অনুমান করতে পারছে না কেউ। মানুষের করুণ আর্তনাদ আর জোর বাতাসের দাপটময় হুঙ্কারে কেঁপে উঠছে শ্রীমদ্দির আকাশ-বাতাস!
চার দিক দুমড়ে-মুচড়ে ঘূর্ণিঝড় যখন শ্রীমদ্দি অতিক্রম করার সময় যাত্রীসহ নৌকোটি আছড়ে পড়ল মেঘনার বুকে তখন হুঁশ ফিরে এলো হোড়ন মাঝির।
দশ-পনেরো মিনিটের ঘূর্ণিপাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে- শ্রীমদ্দিবাসীর বসতঘর, গরু-ছাগল, ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কোথায় নিয়ে গেল পরে আর খোঁজ মেলেনি।
গ্রামজুড়ে মানুষের আর্তচিৎকার! কেউ কারও দিকে তাকাবার জো নেই। একে অপরকে সাহায্য করবে তো দূরের কথা! নিজেদের টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে। পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে এখানে ওখানে ছিটকে পড়ে থাকল মানুষ...।
অনেকের পরনের কাপড়চোপড়ও কোথায় নিয়ে গেছে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঘরের কুপি-লণ্ঠন, হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে সবই হাতছাড়া হয়ে গেল। একমাত্র কালী মন্দিরটি ছাড়া কোনো বসতবাড়ির চিহ্নও থাকল না শ্রীমদ্দি গ্রামে। নদীতীরের পুরনো বটগাছটি সমূলে উপড়ে পড়ে থাকল অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে!
সর্বস্বান্ত মানুষের চিৎকারে আশপাশের গ্রামের লোকজন এবং নিকটতম আত্মীয়-স্বজন লণ্ঠন, হারিকেন নিয়ে ছুটে আসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে।
খবর পেয়ে তৎকালীন উপজেলার নেতারা হোমনা বাজার থেকে কুপি-কেরোসিন, লুঙ্গি-গামছা-শাড়ি এবং পানি ও খাদ্যদ্রবাদি নিয়ে হাজির হলো সর্বহারা মানুষের পাশে।
হারিকেনের মৃদু আলোতে খুঁজে বেড়াতে থাকল আহত কিংবা নিহত মানুষ। সারারাত খুঁজে যাদের পাওয়া গেল, মৃতদের নিয়ে রাখা হলো কালীবাড়ি মন্দিরের আঙিনায়, আহতদের সাময়িক গ্রাম্য চিকিৎসার মধ্য দিয়ে ভোরের অপেক্ষা করতে থাকল মানুষ...
পরদিন সূর্যোদয়ের পর দেখা গেল- শ্রীমদ্দি গ্রামের ভয়ানক তাণ্ডবলীলা! বাড়িঘর তো দূরের কথা, কোনো গাছ-গাছালি পর্যন্ত দণ্ডায়মান ছিল না। টিউবওয়েরের পাইপসমেত মাটি থেকে উপড়ে নিয়ে গেছে দৃষ্টির আড়ালে। ঘূর্ণিপাকাক্রান্ত পুরো এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করা হলো আহত ও নিহত মানুষ। আহতদের লঞ্চযোগে পাঠানো হলো নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন হাসপাতালে।
নিহতদের একত্র করে স্বজনদের উপস্থিতির অপেক্ষা না করেই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গণকবর দেয়া হলো; কেননা সারারাত পড়ে থাকা মৃতদেহের রক্তাক্ত শরীরে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এমনও পরিবার আছে, যাদের পরিবারের একজনও বেঁচে থাকল না।
পরে জানা যায় ওই ঘূর্ণিপাকে শ্রীমদ্দির প্রায় চারশ’ কিংবা তদূর্ধ্ব মানুষ নিহত হয়েছিল, কিন্তু কত মানুষকে অঙ্গহানি কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে তার হিসাব কেউ করেনি। হাতেম আলীকে পাঠানো হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের কোনো এক হাসপাতালে, বহু দিন চিকিৎসার পর অবশেষে তার ডান পা’টি অকেজো অবস্থায় রক্ষা করতে পারলেও ডান হাতটি টিকিয়ে রাখতে পারেননি ডাক্তার, কেটে ফেলতে বাধ্য হন।
হাতেম আলী ব্যতীত তার পরিবারে কেউ বেঁচে থাকল না! একমাত্র বোনটিকে কোথায় নিয়ে মেরেছে ঘূর্ণিঝড়, শত চেষ্টা করেও আর খুঁজে পায়নি। তার মায়ের লাশ পাওয়া যায় লটিয়ার চরে এবং হায়দার আলী মৃতবাস্থায় পড়েছিল কালীবাড়ি শ্মশানের ধারে।
হাতেম আলীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা শেষ করতে যৎসামান্য জমি ছাড়াও বসত বাড়িটিও বিক্রি করতে হয়েছিল। জীবিকার তাগিদে নিরুপায় হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটতে হয়েছে তাকে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.