বিষখালী নদীর তীরে সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীনদের আবাসন : নয়া দিগন্ত
বিষখালী নদীর তীরে সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীনদের আবাসন : নয়া দিগন্ত

বিষখালীতে ভূমিহীনদের আবাসন বিলীন হওয়ার পথে

গোলাম কিবরিয়া বরগুনা

‘মোরা কূলহারা (সর্বস্বহারা) হইয়া এই সরকারি বস্তির ঘরে আশ্রয় লইছিলাম। মোগো কোনো লাভ হইল না। বিষখালী নদী মোগো আবার কূলহারা কইরা দিতেছে। এই বেবাক (সব) ঘর যদি নদীর প্যাডে যায় তাইলে আমাগো দশা আবার কী অইবে?’Ñ আবাসনে থাকা বাসিন্দা বৃদ্ধ আব্দুল আজিজ দুঃখের সাথে এমনটাই বললেন। আবাসনে থাকা শংকর কর্মকার (৩৮) বললেন, ‘সিডরের পর সরকারি ঘরের লাইগ্যা (জন্য) তিন বছর বাজারের টলশেডে রইছি, হ্যার পর এই ঘর মোরা পাইছি। এহন আবার ঘর জোয়ারে ডোবে। গাঙের পানি আবার ভাসাইয়া নেতে (নিতে) পারে, রাইতে এই ডরে (ভয়ে) চোহে ঘুম আয় না।’ ভূমিহীন জেলে বিমল হাওলাদার (৪৫)। ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর চার সদস্যের পরিবার নিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েন তিনি। তিন বছর অপোর পর বিপন্ন এই জেলে পরিবারটির এক করে একটি অপরিসর ঘরে ঠাঁই হয়। একটি চরে সরকারিভাবে পুনর্বাসনের ব্যারাকে মাত্র ছয় মাস বসবাসের পর জেলে বিমলের পরিবারটি আবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে নদীর প্রবল ¯্রােত, জোয়ার আর ভাঙনে তার ঘরটি আবার কেড়ে নেয় বিষখালী নদী। আতঙ্কে বিপর্যস্ত জেলেপরিবারটি ঘর ছেড়ে এখন অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। শুধু বিমলের পরিবার নয়, উপজেলার পাঁচ নম্বর বুড়া মজুমদার ইউনিয়নের বিষখালী নদী-তীরবর্তী বদনীখালী বাজারের অদূরে একটি চরে গড়ে তোলা আবাসনের ঘর নদীর স্বাভাবিক জোয়ার আর জলোচ্ছ্বাসে বিলীন হচ্ছে। ওই আবাসন প্রকল্পের পাঁচটি পরিবার আতঙ্কে পুনর্বাসনের ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। ঘরহারা এই পাঁচটি পরিবারই শুধু নয়, ওই আবাসন প্রকল্পের ছয়টি ব্যারাকের ৬০টি দুর্গত পরিবার বিষখালী নদীর জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে আবার গৃহহীন হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে ওই ৬০ পরিবার স¤পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়ায় ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় বদনীখালী চরের নদী লাগোয়া ছয়টি ব্যারাক নির্মাণ করে। এতে জাপান সরকার অর্থসহায়তা দেয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিষখালী নদীর জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে ব্যারাকের ভিত্তি স¤পূর্ণ ধসে গেছে। এতে একটি ব্যারাকে আশ্রয় নেয়া পাঁচটি পরিবার বাধ্য হয়ে বিপন্ন ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। বদনীখালী চরের আবাসনের ৬০টি ঘর বিষখালী নদীর জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে বিলীনের মধ্যে থাকলেও দুর্গত এসব পরিবারের কেউ খোঁজ নিচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপকুলীয় এ উপজেলার পুনর্বাসনের ঘরগুলো বেশির ভাগই নির্মাণ করা হয়েছে কোথাও নদীর চর, ভাঙনকবলিত খালের পারজুড়ে। ফলে জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে এসব আবাসন প্রকল্পের ঘরগুলোতে দেখা দিয়েছে নানা দুর্যোগ। এক দিকে অপরিসর ক আর জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকা এসব পুনর্বাসনের ঘর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এ উপজেলার ৪৫টি ব্যারাকই নির্মাণ করা হয়েছে নদী ও খালের পারজুড়ে। এমনকি ভাঙন ও জোয়ারের প্লাবনের ঝুঁকিতে থাকা এসব ঘর নির্মাণের আগে মাটির ভিত্তি যথাযথভাবে উঁচু না করা ও ভাঙনকবলিত এলাকায় বেড়িবাঁধ কিংবা পাইলিং না দেয়ায় পুনর্বাসনের এসব ঘর বিলীনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে বেতাগী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জি এম ওয়ালিউল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, সিডরদুর্গতদের পুনর্বাসনের ঘর নির্মাণে যথাযথ স্থান না পাওয়ায় বেশির ভাগ ব্যারাক নদী ও খালের পারে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। জমি সঙ্কটের কারণেই এমনটা হয়েছে। বদনীখালী চরের ছয়টি আবাসনের ব্যারাক নদীর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়। সেখানে বেড়িবাঁধ দরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগ ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.