রাতের গল্প : চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

জীবন ফার্মেসির রঞ্জিত বাবু বললেন আমার নাকি যক্ষ্মার লক্ষণ। শিগগিরই কফ পরীক্ষা করানো জরুরি। দম ফাটানো কাশি নিরাময়ের কিছু ওষুধ প্যাকেট করে তিনি মূল্য জানালেন ৩৫০ টাকা। আকরাম মূল্য পরিশোধ করে যখন জীবন ফার্মেসি থেকে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো, তখন সন্ধ্যার অনেক পর।
Ñস্যার, আপনি বাড়ি চলে যান। ওষুধগুলো নিয়মিত খাবেন।
Ñতুমি কিছু খাবে আকরাম? চা?
Ñনা স্যার। ধন্যবাদ। আমি যাই।
Ñআচ্ছা।
আকরাম চলে যাচ্ছে। কত বড় হয়ে গেছে ছেলেটা। একসময় ওকে প্রাইভেট পড়াতাম। আমার জ্ঞান বিতরণে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করত বলে আকরামের ব্যারিস্টার আব্বু আমাকে মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতনের থেকেও কিছু পয়সা বাড়তি দিতেন খুশি হয়ে। সেই টিউশনির টাকায় কোনো রকম টেনেহিঁচড়ে পার হতো আমাদের বাবাহীন অভাবের দিন।
আজ এতটা বছর পর আমার ছাত্র সেই আকরামের সাথে এই গঞ্জের হাটে দেখা। দম ফাটানো অবিরাম কাশ আর হাবভাবে দরিদ্রতার ছাপ দেখে আকরাম সম্ভবত বুঝে গেছে আমার আর্থিক সঙ্কটে এখনো দিন কাটে। তা না হলে তার এই এক সময়ের হোম টিচারকে এত ওষুধ কিনে দেবে কেন!
২.
ঘরে ফিরতেই শুভর কচি গলার কান্না কানে বাজল। আমার চার বছরের অবুঝ ছেলে। ডালিম খাবে বলে ওর মাকে জ্বালাচ্ছে। কিন্তু সুবর্ণা নিরুপায়। ছেলের জন্য ডালিম পাবে কোথায়! বিকেলে পাশের বাড়ির হিন্দু ছেলে প্রতাপকে ডালিম খেতে দেখে মায়ের কাছে শুভর বায়নাÑ ‘আমাকে ডালিম এনে দাও’।
সুবর্ণা ডালিমের গল্প আমাকে বলে আবদারের সুরে বলল ‘পোলাকে ডালিম এনে দাও। কান্না থামছে না। গলা টিপে ধরেছি একবার, তবু ভ্যা ভ্যা থামছে না।’
বলে কি সুবর্ণা? শুভর গলা টিপে ধরেছে সে! আমি আহত হলাম। আমি এখনই হাটে যাবো আমার ছেলের জন্য ডালিম কিনতে। কিন্তু টাকা? পকেটে তো এক টাকাও নেই। অভাবের এই সংসারের বোঝা আমি আর বইতে পারছি না। আজ দুই দিন, ঘরে চাল-ডাল নেই।
শুভর কান্না বাড়ছে। কাছে এসে বলল, ‘বাবা, ডালিম খাবো। এনে দাও।’ বুকটা হু হু করে উঠল। আহারে, ছেলে তো জানে না তার বাবার কাছে কোনো টাকা নেই।
প্যাকেট থেকে ওষুধগুলো খুললাম খাবো বলে। হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা, ওষুধগুলো রঞ্জিত বাবুকে ফেরত দিলে টাকাটা ফেরত পাবো তো? ৩৫০ টাকা। শুভর জন্য ডালিম কেনা যাবে। হ্যাঁ, এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ঘর থেকে বের হতেই সুবর্ণা বলল, ‘কই যাও আবার’? ক্ষীণ গলায় বললাম, ‘যাই, শুভর জন্য ডালিম আনি। আমার ছেলে ডালিম খাবে। হা হা হা।’
৩.
রঞ্জিত বাবু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভ মাখা গলায় বলল, ‘ওষুধ ফিরিয়ে রাখব মানে? মিয়া, ধান্ধা করো! ওই ছেলে ওষুধ কিনে দিয়েছে আর তুমি ফেরত দিয়ে টাকাটা...? ধান্ধাবাজ কোথাকার। তোমাদের মতলব সব জানা আছে।’ অনুনয় করে বললাম, ‘বাবু, টাকাটা বড় দরকার। একটু দয়া করুন।’ আমার কথা শেষ হতেই রঞ্জিত বাবু গায়ের সব শক্তি দিয়ে আমার গালে কষে এক চড় বসিয়ে দিয়ে উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘ওষুধ ফেরত রাখি না। বিদায় হও বলছি। নয়তো ঠ্যাং ভেঙে দেবো।’
আমার চোখে পানি চলে এলো। ঘরে আমার ছেলে ডালিমের অপেক্ষায়। বাড়ি গেলে সে যখন আগ্রহী গলায় বলবে, ‘ডালিম কই’, তখন আমি কী জবাব দেবো! এটা ভাবতে গিয়ে আমার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।
৪.
ডালিম কিনতে না পেরে এলোমেলো পায়ে বাড়ি ফিরছি। চার দিকে রাতের সুমসাম নীরবতা। আমার বুকের ভেতর যন্ত্রণার এক বাঁশি বাজছে। আমার হাতে আকরামের কিনে দেয়া ওষুধের প্যাকেট। না, এই ওষুধ আমার গলা দিয়ে নামবে না। ছুড়ে ফেলে দিলাম রাস্তার ধারে।
ঘরে আসতেই সুবর্ণা বলল, ‘ডালিম কই? শুভ তো ডালিমের অপেক্ষায় বসে থেকে একটু আগে ঘুমিয়ে গেছে। সকালে উঠে ডালিম চাইবে।’ কোনো কিছু না বলে আমি শুভর পাশে গিয়ে বসি। অঘোরে ঘুমাচ্ছে শুভ। ভাঙা জানালা দিয়ে দূরের চাঁদের আলো ছেলের মুখে পড়েছে। কী সুন্দর ফর্সা ছেলে আমার।
ঘুমন্ত ছেলের কপালে আলতো করে একটা চুমু খেলাম। মনে মনে বলি, কাল যেভাবেই হোক তোর জন্য ডালিম আনব বাপ। সুবর্ণা আমার পাশে এসে মøান গলায় বলল, ‘তোমার মুখে লাল ওটা কিসের দাগ’?
তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারলাম না। রূপবতী সুবর্ণার কাঁধে হাত রেখে বললাম, ‘চলো আমরা উঠোনে যাই। কী সুন্দর চান্দের আলো পড়েছে। সারা রাত আমরা চাঁদ দেখব। চলো চলো...।’
সুবর্ণা হাসছে। তবু তারে খুব দুঃখী দেখাচ্ছে। আমার সংসারের অভাব দেখতে দেখতে সে বড় দুঃখবতী হয়ে উঠেছে। আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.