সারপ্রাইজ : চারাগল্প

কোরবান আলী

স্বর্ণা আমার থেকে তিন বছরের ছোট। শৈশবের দুরন্তপনায় তিন বছর পিছিয়ে হাইস্কুল জীবনটা শুরু হয়। ওর বাড়ি আর আমার বাড়ির মধ্যে একটি পুুকুর, পুকুরের পাড়ে কিছু নারিকেল গাছ আর সাথে সারি বাঁধা সুপারি গাছ। তারপর একটা খাল। এই খালের ওপর ওর বাড়ি। বাড়ি থেকে আধা মাইল দূরে আমাদের স্কুল। আমরা দুইজন একসাথে স্কুলে যেতাম। বর্ষার সময় ও প্রায় দিনই ছাতা নিয়ে যেত না। আমার ছাতার মধ্যে দুইজন একসাথে স্কুলে যেতাম। ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠার কারণে তুই সম্বোধন করতাম দুইজনায়। আমি ওকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘তোর সাথে কি ছাতা ভাগে কিনি যে, তোকে প্রত্যেক দিন আমার ছাতার মধ্যে নিতে হবে? ‘হ, ভাগে কিনেছি তুই জানিস না! টাকা তোর মার কাছে আগে থেকে দেয়া আছে। তুই বাড়ি যেয়ে চাচীর কাছে শুনিস।’ আমি অতশত বুঝি না, তুই একটা ছাতা কিনবি আর আমার ছাতার মধ্যে আসবি না। নিত্যনতুন ঘটনার একটি মাত্র হলো এটা। প্রতিদিন কোনো না কোনো ঝামেলা বাধাবেই। স্কুলের বন্ধুরা আমার আর ওর নামে বিভিন্ন ইয়ার্কি করত। স্কুলের বিভিন্ন স্থানে অমুক প্লাস অমুক লিখে রাখত। এক দিন নারায়ণ স্যারের গণিত ক্লাসের আগে কে যেন ব্ল্যাকবোর্ডে আমার নাম প্লাস স্বর্ণা লিখে রেখেছে। এমনিতেই স্যারের জ্যামিতি পড়া হয়নি, তার ওপর এই অকাজ। স্কুলজীবনের সর্বোচ্চ শাস্তি পেলাম। মন খারাপ করে বাড়ি চলে এলাম। রাগে এক সপ্তাহ ওর সাথে কথাই বলিনি। চাঁদনি রাতে নারিকেল গাছের ফাঁকে লুকিয়ে চাঁদ দেখতাম দুইজন। পুকুর থেকে শাপলা তুলে ওকে দিতাম। আমি ওর থেকে গণিতে অনেক কাঁচা ছিলাম। তারপরও গণিত শেখার বাহানায় আমার রুমে আসত। মাঝে মধ্যে এসে অহেতুক কিছু আবদার করত। এই আমার একটা লাল প্রজাপতি ধরে দিবি ? গণেশ দাদার বাড়ি থেকে মেহেদী পাতা চুরি করে এনে দিবি?
হাসি খেলার ছলে কখন যে ওকে ভালোবেসে ফেলেছি সেটা নিজেও বুঝতে পারিনি। মা ভালো কিছু রান্না করলে ওদের বাড়ি দিতে যেতাম। আর মাঝে মধ্যে ওর মাকে বলতাম, চাচী স্বর্ণার তো বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে। ওকে বিয়ে দেবেন না? চাচী বলত, ‘হ দিমু। চাকরিওয়ালা একখান রাজপুত্রের সাথে বিয়া দিমু’। বিয়ের কথা বললে ও বলত, ‘তুই যদি আবার আমার বিয়ের কথা কইতে আসিস তোকে ঝাটাপিঠা করব কিন্তু!’ গ্রামের পাঠ চুকিয়ে শহরে চলে এলাম। মাঝে মধ্যে ওর সাথে চিঠি দেয়া-নেয়া হতো। প্রতিটা চিঠির শেষে লিখতাম, আর কিছুদিন অপেক্ষা কর, তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। কিন্তু কী সারপ্রাইজ সেটা কখনোই বলিনি। ও বারবার জানতেও চেয়েছিল। চাকরি পাওয়ার পরের দিন সকালে ট্রেনে চড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম।
নিজের মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা আর স্বর্ণা নিয়ে রংধনুর রঙে আঁকা সাত রঙে হাজারো স্বপ্ন, যা কাউকে বোঝানো যাবে না। চাকরির খবরটা সবার আগে স্বর্ণাকে দেবো। ওর মার কাছে আমাদের বিয়ের কথা বলব। পথের মধ্যে ট্রেনের লাইনচ্যুত। যখন বাড়ি পৌঁছলাম রাত তখন সাড়ে ১২টা বাজে। ভাবলাম এখনি ওর বাড়িতে যেয়ে বলে আসি। না থাক, সকালেই বলব। ঘুমিয়ে আছি, কে যেন জোরে জোরে ডাকছে চাচী, ও চাচী শুনলাম আপনার নবাবজাদা নাকি বাড়ি ফিরেছে! কণ্ঠস্বর চিনতে ভুল হয়নি এটা স্বর্ণার কণ্ঠস্বর। তাড়াহুড়া করে দরজা খুলে আমার বলার আগেই ও বলল, ওহে নবাবজাদা তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। আগামীকাল আমার বিয়ে। ছেলে বিদেশ থাকে। তুই আসিস কিন্তু!
খুলনা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.