একটি দুর্ঘটনা : জীবনের বাঁকে বাঁকে

এস আর শানু খান

সে দিন ছিল সোমবার। দুপুরের সময় চঞ্চলদের বাড়ির সামনের মাচালিতে বসে ছিলাম কয়েকজন। হঠাৎ দেখলাম ভ্যানে করে একটি লোক আসছে। দূর থেকে দেখেই কেমন যেন মনে হচ্ছিল। ভ্যানের ওপর লোকটার বসে থাকা দেখে মনে হচ্ছিল, লোকটা সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ নয়। আবার ভ্যানও তিনি নিজেই চালাচ্ছেন। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ভ্যানটা এসে আমাদের সামনে পৌঁছল। আমি তাকিয়ে রইলাম মানুষটির দিকে। অসহায়ত্বের এক বিশাল চাদরে ঢাকা লোকটার মুখ। চোখে মুখে তার নিদারুণ হতাশার ছায়া। মোটর সংযোজিত একটা ভ্যানগাড়ি। তার ওপর কয়েকটা বস্তা সাজানো। সব বস্তার মুখ খোলা। বস্তাগুলোর কোনোটায় চাল এবং কোনোটায় আবার ধান। শীতের কাপড়সহ আরো অনেক কিছু। ভ্যানের সামনে বসে থাকা মানুষটির দিকে তাকালেই পৃথিবীর আর কোনো কিছুই ভালো লাগছিল না। বাম পা ভ্যানের সিটের ওপর দিয়ে রাখা। ৫৫-৬০ বছর বয়সী এ মানুষটা পেশাগতভাবে ছিলেন ট্রাকড্রাইভার। জন্মসূত্রে বাড়ি মাগুরা। বালুবোঝাই ট্রাক নিয়ে ঝিনাইদহ রোড দিয়েই যাচ্ছিলেন, কোথায় পথিমধ্যে ঘটে যায় এক অবর্ণনীয় অঘটন। এক সিএনজির সাথে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে ট্রাকের। সিএনজিকে রক্ষা করতে গিয়ে বালুভর্তি ট্রাক নিয়ে রাস্তার খাদে পড়ে যায়। গাছের সাথে সংঘর্ষ হয়। ট্রাকের সামনের থেকে চেপে এসে ড্রাইভারকে বিরাট আঘাত করে। দুই দিন অজ্ঞান থাকার পর যখন জ্ঞান ফেরে বালুর ট্রাক নিয়ে রওনা হওয়া ট্রাকড্রাইভার তখন ঢাকা মেডিক্যালের বেডে। এরপর চলতে থাকে চিকিৎসা। এরপর দুই মাস চিকিৎসা হওয়ার পর বাড়ি ফেরেন ট্রাকড্রাইভার। কিন্তু তখন তার বাম পায়ের পাতার অর্ধেক নেই। আর ডান পায়ের এক ভয়ানক অবস্থা। ডান পায়ে একদমই বল নেই। হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়ার সময়ই বলে দিয়েছেন একটু সুস্থ হলেই ডান পায়ের একদম ওপর থেকে কেটে ফেলতে হবে। ডান পায়ের ভেতরের একটি হাড়ও ভালো নেই। ডান পা কাটতেও টাকা লাগবে অনেক। চার মেয়ে আর এক ছেলের সংসার। অর্থের বড় টানাপড়েন। বড় ছেলে এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করেও টাকার অভাবে পড়ালেখা বাদ দিয়েছে। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছিল আগেই। এখন নিজের চলাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। গ্রামের মানুষ সাহায্য-সহযোগিতা করেছে খুব। তাই তো এখন তাদের কাছে হাত পাততে লজ্জাবোধ হয়। তাই তো কোনো এক নেতার অনুগ্রহে মোটরচালিত ভ্যান ভাড়া নিয়ে এখন দূর-দূরান্তে ছুটে যান একটু সাহায্যের জন্য। জীবনের গল্পটা চোখে পানি নিয়ে এলো।
মানুষটার লুকানো চোখের পানি বুঝিয়ে গেলÑ মানুষের সাহায্য-সহযোগিতার গল্পটা অতটা সোজা নয়, যেমনটা লোকটি বলছিলেন। একটু এগিয়ে গিয়ে বসে পড়লাম ভ্যানের ওপর। জানতে চাইলাম গল্পটা। মানুষটি হায়হুতাশ করতে করতে বললেন, ‘বাজান তুমিই কওÑ একজন মানুষ মানুষের দ্বারে গিয়ে ভিক্ষা বা সাহায্যের জন্য গিয়ে দাঁড়াতে হয় কোন রকম পর্যায় গিয়ে ঠেকলে। অসহায়ত্বের কোন স্তরে গিয়ে ঠেকলে মানুষ অন্য মানুষের কাছে ভিক্ষার জন্য হাত পাততে পারে সেটা সে-ই ভালো জানে, যে এই রকম পরিস্থিতিতে পড়েছে। তা বাজান এই রকম হওয়ার পর মানুষের কাছে গেছি খুব। মানুষ নানা কথা কয়। চেনাজানা মানুষও নানা রকম কথা বলে যেটা বুকে গিয়ে লাগে। কলিজা ছিদ্র করে দেয়। তবুও চোখের পানি মুছে অন্যের কাছে যায়। দিতে চায় না কেউই। মানুষের প্রতি মানুষের দয়ামায়া আজ নেই বললেই চলে। মানুষ মানুষের দুর্বলতা নিয়ে মজা করে। হাসি-তামাশা করে। তিল পরিমাণ আত্মমর্যাদাবোধটুকু নিয়েও এমনভাবে টানাহেঁচড়া করে যেমনটা মিষ্টির পলিথিন কিংবা খাবারের পলিথিন নিয়ে দু-তিনটি কুকুরে টানাটানি করে। তার ওপর আবার ডেইলি তিন-চার শ’ টাকার ওষুধ লাগে। মাগুরা বাসমালিক সমিতির সাইদ মীরের কাছে গিয়েছিলাম বেশ কয়েকবার। তাকে সব সময় পাওয়া যায় না। ব্যস্ত মানুষ। যে দিন গিয়ে পায় সে দিন উনি একবারে চার-পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দেন। সাইদ মীরের ভাইও বেশ কয়েক দিন দিয়েছেন। আমি জানতে চাইলাম এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার কী বলে। উনারা ঠিক চিনতেই পারেন না। কয়েকবার বলেছি একটা কার্ড করে দিতে, তাই দেয়নি, আবার পকেটের টাকা দিয়ে সাহায্য। আরে বাজান এই দুনিয়ায় যার টাকা নেই তাকে কেউই চিনতে চায় না। সাহায্য তো দূরের কথা। টাকা ধার চাইলেও দিতে চায় না। ভাবে দেবেন কোথা থেকে।
আমি ভালোভাবে তাকিয়ে দেখালাম ডান পায়ের হাঁটুর ওপর থেকে একদম পায়ের গোড়ালি পযর্ন্ত বাঁশের চটা দিয়ে বাঁধা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই পায়ে কোনো বল নেই। তবুও বললাম চাচা এই পা একদমই অবশ। নাকি একটুও টের পান না? উনি বললেন একটুও বল দিতে পারি না। কিন্তু অসহ্য জ্বালাযন্ত্রণা হয় ওই পায়ের ভেতর। জ্বালা উঠলে মন চায় নিজের পা নিজেই দা-কাচি দিয়ে কেটে ফেলি। কেটে ফেললেও বুঝি এত যন্ত্রণা পোহাতে হতো না। তারপর উনি সামনের দিকে যেতে চাইলেন। আমি ভ্যান থেকে উঠে পড়লাম। পরামর্শ দিলাম কেটেই যখন ফেলতে হবে বলেছেন ডাক্তাররা তাহলে যত দ্রুত সম্ভব কেটে ফেলাই ভালো। কেননা ইনফেকশন হলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চাচা বললেন সবাইকে দোয়া করতে।
বাজান বাজান বলে বারবার সম্বোধন করছিলেন আমাকে। আমি আমার সহপাঠী নাজমুলকে বললাম একটা ছবি তুলতে। এবং সিঙ্গিয়া হাটের দিন ছিল, তাই পরামর্শ দিলাম হাটে একটু আদায় করতে। যদি দু-এক পয়সা হয়। কথায় আছে না ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। তাই সবার কাছে অনুরোধ, দয়া করে সবাই সাবধানে গাড়ি চালাবেন এবং রাস্তায় চলাচল করবেন চোখ কান খোলা রেখে। কেননা সামান্য অসতর্কতাবশত ঘটে যেতে পারে একটা বিরাট দুর্ঘটনা।
শালিখা, মাগুরা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.