তারিক এ আল-মায়েনা
তারিক এ আল-মায়েনা

রক্ত ঘাম ও অশ্রু

তারিক এ আল-মায়েনা

সুদীর্ঘকাল ধরে সৌদি আরবে বসবাস করে আসছেন এবং সৌদি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন ও রাখছেন এমন প্রবাসীদের সৌদি আরবের নাগরিকত্ব দেয়ার আমি একজন ঘোর সমর্থক তথা প্রবক্তা। আমি মনে করি, তাদের নাগরিকত্ব দিলে শুধু তাদের অবদানের স্বীকৃতিই দেয়া হয় না, বরং এর মাধ্যমে তাদের এ দেশে ধরে রাখার ব্যবস্থাও হয়। আর তাদের অব্যাহত উপস্থিতি দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহায়ক।

অবশ্য আমার এসব কথার সাথে সৌদিরা সবাই যে একমত, তা কিন্তু নয়। এ রকম একজন হলেন সামির। এই ব্যবসায়ী মানুষটি আমার এসব কথা মানতে মোটেই রাজি নন। তার সাফ কথা, আমরা যদি অভিবাসীদের জন্য দরজা খুলে দিই তবে এমন সব মানুষ এসে দেশটি ভরে যাবে, যাদের দিয়ে এ দেশের একফোঁটা অর্থনৈতিক উন্নয়নও হবে না। উল্টো তারা আমাদের সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

সামির তার সমর্থনে যুক্তি দেখাতেও ভোলেন না। বলেন, শোনেন তারিক, আমার কথা সত্য না মিথ্যা বোঝার জন্য আপনাকে বেশি দূর যেতে হবে না। ওই দেখুন রাস্তার কোনায় কোনায় ভিক্ষা করছে কারা? বিদেশীরা। ওরা এমন সময় আমাদের দেশে, যখন আমাদের ছেলেরা একটা চাকরি পাচ্ছে না। আচ্ছা বলুন তো, এই বিদেশীরা যখন সারা দিন হাত পেতেও তিন বেলা খাবার জোটাতে পারবে না, তখন কী করবে? ওরা তখন নিজেদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেই নানারকম অপরাধ সংঘটনে নেমে পড়বে।

সামিরের এসব কথার একপর্যায়ে আর হস্তক্ষেপ না করে পারি না। তাকে বলি, কিন্তু যারা নাগরিকত্ব লাভের যোগ্য তাদেরই নাগরিকত্ব দেয়ার পক্ষে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে যারা অন্যের সাহায্যের আশায় হাত বাড়িয়ে রাখে, তাদের তো নাগরিকত্ব দিতে আমি বলি না!

সামিরের মতোই আরেকজন হচ্ছেন মোনা। তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। তার রয়েছে মাল্টিমিলিয়ন রিয়ালের একটি গ্রুপ অব কোম্পানিজ। অভিবাসন আইন শিথিল করে বিপুলসংখ্যায় বিদেশীকে সৌদি আরবে ঢুকতে দেয়ার প্রশ্নে সামিরের মতো এই নারীও যারপরনাই উদ্বিগ্ন। তার বিশ্বাস, এভাবে ঢলের মতো বিদেশীদের অনুপ্রবেশ আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর একটা বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

মোনার এ কথায় আমার বিরক্ত লাগে। বলি, কী সব বাজে বকছ, মোনা! বলো তো, কী এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমরা সৌদিরা ধারণ করি? পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির চেয়ে আমরা আলাদা কিছু নই এবং আজকের বিশ্বের যে চ্যালেঞ্জ তা আমাদেরও চ্যালেঞ্জ। ‘আমরা অন্যদের চেয়ে আলাদা’Ñ এই ধারণা বরং আমাদের সমাজকে সম্ভবত দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দেশ হিসেবে এগিয়ে যাওয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে।

মোনাকে আরো বলি, দেখো, একের পর এক পরিসংখ্যান কিন্তু বলছে, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও জনকল্যাণে আমরা অনেক উন্নত দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছি। শিক্ষা বলো, সামাজিক সুরক্ষা বলো কিংবা এ রকম অন্য আরো অনেক কিছু- কোনো কিছুতেই কি আমরা যে অনন্য একটি সমাজ, তার কোনো ব্র্যান্ড তৈরি করতে পেরেছি? অথচ আমার মনে হয়, আমরা পরতাম। এরকম সম্ভাবনা আমাদের ভেতরে সুপ্ত ছিল।

ডাক্তার জামালের কথাই ধরা যাক। তার নিজের একটি ক্লিনিক আছে। এই ডাক্তার মনে করেন, বিদ্যমান নাগরিকত্ব আইনটিই যথেষ্ট। আইনটি নিয়ে আর নড়াচড়া করা ঠিক হবে না। তা করতে গেলে স্থানীয় ও প্রবাসীদের সংখ্যায় যে ভঙ্গুর ভারসাম্য, তা বিপন্ন হতে পারে। জামাল আমাকে বলেন, আমরা কি দুবাইয়ের মতো হতে চাই, যেখানে অফিস-আদালতে কাজ করছে এমন একজন স্থানীয় লোক খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর!
জামালকে বাধা দিয়ে বলি, আরে বাবা, আমি তো আমাদের আইন নিয়ে কিছু বলছি না। আমি যেটা বলতে চাইছি তা হলো, কোয়ালিফাইড লোকজন আজকাল যেসব বাধার মুখে পড়ছেন তা তুলে নিয়ে তাদের নাগরিকত্ব লাভের পথ সুগম করার কথা।

আমি আরো একটু পরিষ্কার করে বলি। একজন সৌদি নারী। তার স্বামী ছিলেন একজন বিদেশী। তিনি মারা গেছেন। এখন সন্তানদের নিয়ে ওই মহিলা ভাসছেন অকূল পাথারে। কেননা তিনি নিজে সৌদি হলেও স্বামী বিদেশী হওয়ায় তাদের সন্তানেরা কেউ অটোমেটিক্যালি সৌদি নাগরিকত্ব পাচ্ছে না। এ দেশীয় আমলাতন্ত্রের কাজের ধারার সাথে যারা পরিচিত তারা জানেন, এ দেশে নাগরিকত্ব লাভের পন্থাটি দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক। পত্রপত্রিকায়ও আমরা প্রায়ই এ রকম খবর দেখতে পাই এবং লোকমুখেও শুনতে পাই যে, এ রকম পরিস্থিতির শিকার সন্তানদের একজনকে হয়তো নাগরিকত্ব দেয়া হলো আর অপরজনকে দেয়া হলো না। এটা কি আপনার সন্তানদের বড় করে তোলার কোনো উপযুক্ত পরিবেশ হলো? ওদের তরুণ মনে এর কী বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা কি কেউ ভেবে দেখে?

আমি এবার বলি, আরেকটা ঘটনা। আমি এক ইন্ডিয়ানকে চিনি, যিনি ৩০ বছর ধরে আমাদের দেশে বসবাস ও কাজ করছেন। তিনি এ দেশেই এক ইন্ডিয়ান নারীকে বিয়ে করেছেন এবং তাদের তিন সন্তানের সবাই এ দেশেই জন্মগ্রহণ করেছে। পরিবারের জন্য বছরের পর বছর তিনি কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন না তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, বহু সৌদিকে তিনি ট্রেইনিং দিয়েছেন, যাদের কেউ কেউ এখন তার কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করছেন।

তিনি আমাকে বলছিলেন, এটাই তার দেশ। এমনকি তিনি যখন ইন্ডিয়াতে আত্মীয়স্বজনের কাছে বেড়াতে যান, সব কিছুই তার কাছে অনাত্মীয় মনে হয়। এত দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর নিজের দেশকেও কেমন যেন আপন মনে হয় না। এখন তার দুই সন্তান বড় হচ্ছে, ক’দিন পরেই ওদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। তখন ওদের তিনি কোথায় পাঠাবেন তাও তার জানা নেই। ভাবছেন, আমেরিকা বা কানাডা পাঠাবেন। কিন্তু এত দূরে এবং এত ভিন্ন সংস্কৃতির একটা দেশে ছেলেরা কী করে থাকবে, ভাবতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তাই তিনি এ দেশের নাগরিক হতে চান। কিন্তু এ দেশের নাগরিকত্ব আইনের যেসব শর্ত, সব তো তিনি পূরণ করতে পারছেন না!

আমার প্রশ্ন হলো, তার সৌদি নাগরিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কেন পূর্ণ হবে না? আমাদের সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতাকে বন্দী করে রাখার চেয়ে একে উন্নত করে আমাদের ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি লাভ হয়েছে। অভিবাসীদের ছোঁয়ায় আমাদের রুচি ও চাহিদার অনেক রদবদল ঘটেছে, যদিও আমরা এখনো সেই আদিকালের ‘ইউনিক অ্যান্ড স্পেশ্যাল সোসাইটি’র ধারণা আঁকড়ে ধরে বসে আছি।
যারা আমাদের দেশকে অনেক কিছু দিয়েছেন এবং যারা দিতে ইচ্ছুক, আসুন, এবার আমরা তাদের আমাদের পতাকার নিচে সমবেত করি। নিজেদের রক্ত, ঘাম ও অশ্রু দিয়ে তারা এ অধিকার অর্জন করেছেন।

সৌদি গেজেট থেকে অনুবাদ : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.