মান ইজ্জত

জোবায়ের রাজু

শুধু ইয়ং জেনারেশনরাই একচেটিয়া ফেসবুক ব্যবহার করবে, এই নীতি আমার কাছে তখনই ভুল প্রমাণ হলো, যখন খায়ের চাচার সাথে ফেসবুকে পরিচয় হয়। উনার আইডির নাম খায়ের খান। তার রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করার পর যখন প্রোফাইল পিকচার দেখি, প্রথমেই ধাক্কার মতো খেলাম। ওমা! ভদ্রলোক দেখি আমার ছোট চাচার কার্বনকপি। হুবহু এক চেহারা। ইনবক্সে বিষয়টি তাকে জানাতেই তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে চাচাই ডাকো।’
সেই থেকে খায়ের খানকে আমি খায়ের চাচা ডাকি। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এ বয়সেও একজন মানুষ ২৪ ঘণ্টা ফেসবুকে অ্যাক্টিভ থাকতে পারে, এটা আমার কাছে অনেকটা রহস্যের মতো।
সময়ের সাথে সাথে দেখলাম খায়ের চাচা আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। আমি যখনই কোনো পোস্ট আপডেট দিই, সাথে সাথে উনি লাইক কমেন্ট করে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। ঠিক সেভাবে আমিও। ফলে আমাদের মধ্যে একটি গুড রিলেশন তৈরি হয়ে ওঠে।
সময়ের আবর্তে কথায় কথায় জানলাম খায়ের চাচার তিন মেয়ে এক ছেলে। তিন মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছেন, সবার ছোট ছেলে ইমন। এবার সিক্সে পড়ে। সব চেয়ে বড় কথা হলো খায়ের চাচা আমার জেলারই মানুষ। সদরে তার বাড়ি। সদর আমার মহল্লা থেকে ম্যালা দূর। সেদিকে কম যাওয়া হয়।
একদিন খায়ের চাচা মেসেজ দিলেন- ‘আমার বাসায় আসো একদিন।’
রিপ্লাই দিলাম ‘দেখা যাক।’
তিনিও রিপ্লাই দিলেন ‘আসলে খুশি হবো।’
২.
সেদিন দাদাজানের হার্টের প্রবলেম দেখা দিলো। ডাক্তার বললেন, উনাকে দ্রুত সদরের প্রাইম হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। উপায় না পেয়ে আব্বা, আমি আর আমার দুই জ্যাঠা দাদাজানকে সদরের প্রাইমে নিয়ে গেলাম।
দুপুরে প্রাইমে ভর্তি করানো হলো দাদাজানকে। আধুনিক এই হাসপাতালের উন্নত চিকিৎসায় দাদাজান অল্পতেই সুস্থ বোধ করলেও ডাক্তারের নির্দেশ রোগীকে যেন এখানে আরো তিন দিন রাখা হয়। আব্বা আর দুই জ্যাঠা মিলে ডাক্তারের নির্দেশ সাদরে গ্রহণ করে দাদাজানকে কেবিনে নিয়ে গেলেন। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো দাদাজানের সেবায় এই তিন দিন বড় জ্যাঠার সাথে আমাকেও হাসপাতালে থাকতে হবে। মুরব্বিদের এ সিদ্ধান্ত আমি সানন্দে গ্রহণ করলাম।
পরদিন বিকেলে খায়ের চাচাকে মেসেজ দিলাম, ‘আমি সদরের প্রাইমে অসুস্থ দাদাজানকে নিয়ে আছি। তিন দিন থাকব।’
খায়ের চাচা রিপ্লাই দিলেন, ‘এই হাসপাতাল থেকে আমার বাড়ি খুব কাছে। ১০ টাকা রিকশা ভাড়া। আসবে?’
ভাবলাম চাচা যাতে অনেক দিন থেকে বলছেন তার বাড়ি যেতে, এবার না হয় তার কথা রাখি।
খায়ের চাচা তার বাড়ির ঠিকানা দিলেন, ‘তুমি রিকশায় করে এসে আমিনবাজার নামবে। আমিনবাজার প্রাইমারি স্কুলের পিছেই আমার বাড়ি। প্রাইমারি স্কুল থেকে আমার বাড়ির বিশাল গেট দেখা যায়।’
৩.
বিকেলে বড় জ্যাঠাকে বলে বের হলাম খায়ের চাচার বাড়ির উদ্দেশে। প্রথমে রিকশায় করে আমিন বাজারে এসে নামলাম। প্রাইমারি স্কুল খুঁজতে তেমন সমস্যা হয়নি। প্রাইমারির মাঠ থেকে বিশাল এক গেট দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ দিকে। হ্যাঁ, ওটাই খায়ের চাচার বাড়ি।
হঠাৎ মনে হলো- না, এভাবে খালি হাতে যাওয়া ঠিক না। কিছু ফলফলাদি কেনা উচিত ছিল। কিন্তু পকেট তো একেবারে খালি। মাত্র ১০০ টাকা আছে।
একটা ছেলে আসছে। হাতের মুঠোয় কী যেন দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ, ওটা টাকাই। আচ্ছা ছেলেটাকে হাইজ্যাক করলে কেমন হয়! হ্যাঁ, ওটাই করতে হবে।
কাছে আসতেই ছেলেটিকে ডাকলাম। একটা বাচ্চা ছেলে। সে আমার সামনে এলো। এদিক-সেদিক তাকিয়ে দিলাম তার গালে কষে এক চড়। প্রথমে ছেলেটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার হাতের মুঠোয় থাকা টাকার নোটটি কেড়ে আনতে সে যখন বাধা দিলো, পিঠে বসিয়ে দিলাম সজোরে এক কিল। ‘বাবারে মারে’ বলে সে যখন কাঁদতে লাগল, তার হাত থেকে টাকাটা কেড়ে নিয়ে দিলাম ভৌঁ দৌড়। সে তখনো মাটিতে লুটিয়ে কাঁদছে। আমিনবাজার এসে টাকাটা মেলে দেখি এক হাজার টাকার কচকচে একটি নোট।
৪.
ব্যাগভর্তি হরেক রকম ফল কিনে খায়ের চাচার বাড়ি গেলাম। চাচা আমাকে দেখে মরা হাসি দিলেন। বুঝতে পারলাম চাচার মন ভালো নেই। তারপরও আমাকে যথেষ্ট স্নেহের সহিত বরণ করে নিলেন।
-আপনার কি মন খারাপ চাচা?
-না, আসলে...।
-কী?
জবাব না দিয়ে চাচা আমাকে নিয়ে গেলেন ভেতরের এক রুমে, যেখানে কে যেন খাটে শুয়ে যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছে। খায়ের চাচা বললেন, ‘ও আমার ছেলে ইমন। তুমি আসবে বলে ওকে এক হাজার টাকা নিয়ে বাজারে পাঠালাম কিছু ফল আর চা-বিস্কুট আনতে। কিন্তু পথে ওর টাকা ছিনতাই হয়েছে। টাকাটার জন্য দুঃখ নয়, ওই বদমাশ হারামি আমার হাঁপানি রোগী ছেলেটার পিঠে এমন জোরে কিল মেরেছে যে ছেলেটা ব্যথায়...।’
খায়ের চাচার কথায় আমার বুক ধক করে উঠল। যন্ত্রণায় কাতরানো খায়ের চাচার ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘আব্বু, এ তো সেই লোক! আমার থেকে টাকা নিয়ে আমাকে প্রথমে চড় মেরে পরে কিলও মেরেছে।’
খায়ের চাচা চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘বলো কী ইমন?’
হায় হায়! এ কোন পরিস্থিতিতে পড়লাম! মান-ইজ্জত ধুলায় মেশার আগেই ইমনকে বললাম, ‘তুমি ভুল দেখছো ভাইয়া।’
ইমন কড়া গলায় বলল, ‘ভুল নয়, আপনিই সেই লোক। কিলটা এত জোরে মেরেছেন কেন? আমি যদি মরে যেতাম!’
আমি খায়ের চাচার দিকে তাকালাম। আস্তে আস্তে আমার মান-ইজ্জত ধুলায় মিশে যাচ্ছে। আমার হাত-পা কাঁপছে। ভয়ে ও লজ্জায়। খায়ের চাচা আমাকে বললেন, ‘ইমন যা বলছে, সত্য?’
আমার মুখে কোনো কথা ফুটছে না। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওপরে ফুল স্পিডে সিলিং ফ্যান ঘুরছে, তবুও আমি ঘামছি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.