আঞ্চলিক শক্তির যুদ্ধক্ষেত্র লেবানন
আঞ্চলিক শক্তির যুদ্ধক্ষেত্র লেবানন

আঞ্চলিক শক্তির যুদ্ধক্ষেত্র লেবানন

ডমিনিক মোসি

ইতিহাসবিদ নরম্যান ডেভিস অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগের পোল্যান্ডকে ‘ঈশ্বরের লীলাক্ষেত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর আজকের লেবাননের প্রসঙ্গেও একই উপমা ব্যবহার করা যায়। ওই সময়ের পোল্যান্ডের মতো বর্তমানে লেবাননও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সঙ্কটে ভুগছে। দেশটি শক্তিমত্তার দিক থেকেও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক দুর্বল।

গত কয়েক মাস ধরেই লেবানন দুই আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্বের মধ্যেখানে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র সিরিয়া ছাড়া আগে আর কোনো রাষ্ট্রে এমনটি ঘটেনি। আইএসের পরাজয়ের পর ইরাক ও সিরিয়ায় আধিপত্য জোরদার করেছে ইরান। আইএসের পরাজয়ের ফলে অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়ার চেয়েও তারা বেশি লাভবান হয়েছে। অন্য দিকে, একই সময়ে ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব মোকাবেলা করছে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের। গত কয়েক দশকে যা আর ঘটেনি দেশটিতে। শিয়াদের সাথে দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতেই সৌদি আরব সুন্নি মুসলিম দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে চেষ্টা করছে।

গত কয়েক সপ্তাহে সৌদি আররের তরুণ ও উচ্চাকাক্সক্ষী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (সংক্ষেপে এম বি এস বলা হয় তাকে) রাজনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে অতি সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সম্ভবত ইরানের প্রভাব রুখতেই তার এ তৎপরতা। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে যে সংস্কারপ্রক্রিয়া এমবিএস শুরু করেছেন তা সম্ভবত দীর্ঘ দিন ধরে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে চলে আসা দেশটির জন্য বাঁচা-মরার পদক্ষেপ।

লেবাননে গত দুই দশকে ইরান সমর্থিত রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠিত করেছে। গত বছর এই গোষ্ঠীটি প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি ও প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে। এর বিপরীতে সৌদি আরব ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির অজুহাতে অপরাধী ছাত্রের মতো সাদ হারিরিকে ডেকে পাঠিয়েছে রিয়াদে। সেখানে হারিরি হিজবুল্লার বিরুদ্ধে দেশ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অভিযোগ করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন পদত্যাগের। অবশ্য পরে তিনি সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, হিজবুল্লাহ এতই শক্তিশালী হয়েছে যে, তাদের দাপট এখন আর শুধু লেবানন নয়, ইয়েমেনেও প্রসারিত হয়েছে। সেখানে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ছায়া যুদ্ধে ইরান সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীদের হয়ে কাজ করছে এই গোষ্ঠীটি। ইয়েমেনে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির সময়ই সম্ভবত সূচনা হয়েছে লেবাননের এ সাম্প্রতিক সঙ্কটের।

আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হলেও লেবাননে নতুন আরেক ধাপ সহিংসতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ সহিংসতা হতে পারে সৌদিপন্থী ও ইরানপন্থী বাহিনীর মধ্যে কিংবা হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে। সাম্প্রতিক বিজয়ে ইরান যেমন সাহসী হয়েছে, বিপরীতে সৌদি আরবে এমবিএসের সংস্কার কর্মসূচিতে তার কোনো দুর্বলতা প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়নি। ইতালির স্বাধীনতার নেতা ক্যামিলো বেনসোর একটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ‘বিপ্লবী চেতনা বৃদ্ধি বাদ দিয়ে হলেও যথা সময়ে সংস্কার করো, পারলে এটি আরো কমাও।’ যদিও সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের পদক্ষেপগুলো ফরাসি ইতিহাসবিদ অ্যালেক্সিস দো টোকুইভিলের একটি বিখ্যাত হুঁশিয়ারির কথাও মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, ‘খারাপ সরকারগুলোর সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হচ্ছে যখন সেখানে সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু হয়।’

আইএসের পরাজয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি হওয়া উচিত? অনেক পর্যবেক্ষক আহ্বান জানিয়েছেন উগ্রবাদের উৎসগুলো ধ্বংস করতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের। কিন্তু একটি সংস্কার প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ হতে যে, অনেক সময় লাগবে তার সাথে কেউ কঠোরভাবে দ্বিমত পোষণ করবে কিভাবে।

অন্য দেশগুলোর জন্য দ্রুততার সাথে ইরানকে দমন করতে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এ দেশটি ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছে। গত সেপ্টেম্বরে ইরান নতুন একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এ ছাড়া ইসরাইল বলছে, সিরিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিও গড়ছে তারা, যা ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইলের দখলে থাকা গোলান মালভূমি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কাজেই দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সরকারের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপের এখনই সময়। এসব কিছুর আগে তৃতীয় আরেকটি বিষয় জরুরি, তা হলো নিশ্চিত বিশৃঙ্খলার হাত থেকে অঞ্চলটিকে রক্ষা করা। মধ্যপ্রাচ্য ইতোমধ্যে সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। আর সর্বশেষ বিষয়টি হলো এ অঞ্চলের আরেকটি যুদ্ধ লেবাননের চার পাশে ঘুরছে।

চলতি মাসের শুরুতে রিয়াদে সংক্ষিপ্ত সফরে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। কিন্তু পরিস্থিতি যখন উচ্চমাত্রায় আবেগনির্ভর তখন সবসময় যুক্তি কাজ করে না।

ইরানিদের কি এটি বোঝান সম্ভব যে, তারা বেশি অগ্রসর হলে এ পর্যন্ত যা অর্জন করেছে তা হারাতে হতে পারে? বিষয়টি নির্ভর করছে এমন কেউ আছেন কি না যিনি ইরানকে তার নীতি সীমিত করতে রাজি করাতে পারেন। সৌদি আরবকেও কি এটি বোঝানো সম্ভব যে, তারা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে? কাতারের ওপর অবরোধ ও ইয়েমেন যুদ্ধ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তাই লেবাননেও তারা যে ভালো কিছু অর্জন করতে পারবে তার সম্ভাবনা কম। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে উচ্চবাচ্য করা বিপজ্জনক কৌশল যার ফলাফল হতে পারে বিপর্যয়কর।

ফ্রান্সের ভূমিকা সম্পর্কে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ যুগে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে তারা যে ভূমিকা রেখেছে তা ছিল অপরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সুযোগই ছিল না এখানে নিঃস্বার্থভাবে মধ্যস্ততা করার, কারণ তারা ইতোমধ্যেই সৌদি আরবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে এটা ঠিক, ফ্রান্স কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না, তাই গুরুত্বপূর্ণ এই ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে ফ্রান্সকে ঐতিহাসিক ভূমিকা নিতে হয়েছে লেবাননে। সৌদি আরব ও ইরান ইস্যুতে ফ্রান্সের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। সৌদি ও ইরানিরা যদি উপলব্ধি করে, উত্তেজনা প্রশমন তাদের জন্য ভালো হবে তাহলে তাদের অবশ্যই ইউরোপের কথা শুনতে হবে। দুঃখজনক হলো উভয় পক্ষকেই লেবাননকে ধ্বংস করার বিষয়ে নিজ নিজ জিদে অটল মনে হচ্ছে।
লেখক : প্যারিসের ইনস্টিটিউট অব মন্টেগইনের সিনিয়র কাউন্সিলর।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর :
আহমেদ বায়েজীদ

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.