আরব বিশ্বকে বাঁচাতে হলে
আরব বিশ্বকে বাঁচাতে হলে

আরব বিশ্বকে বাঁচাতে হলে

নাবিল ফাহমি

গত নভেম্বর মাসজুড়েই ভয়াবহ কিছু ঘটনা ঘটেছে আরব বিশ্বে, যা অঞ্চলটির রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরেছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হারিরি বিদেশ গিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন, পরে তা প্রত্যাহার করেছেন। ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি আরব বড় ধরনের একটি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালিয়েছে, যাতে আটক হয়েছেন শীর্ষপর্যায়ের কয়েক ডজন ব্যক্তি। এ দিকে মিসরে স্মরণকালের ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে যাতে নিহত হলেন ৩০০’র বেশি, আহত হয়েছেন আরো অনেকে। লিবিয়ায় দাস হিসেবে অভিবাসীদের নিলামে বিক্রির ভিডিও ফাঁস হয়েছে, যা অব্যাহত বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলা দেশটির সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত অবস্থারই প্রকাশ।

আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয় এবং ফিলিস্তিনে গাজা ও পশ্চিম তীরের মধ্যে সমঝোতা এ অঞ্চল নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত করেছে। তবে এই একটি মাত্র ইতিবাচক দিক আরব বিশ্বকে ধ্বংসের কিনার থেকে ফেরার বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারে না। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে বিদেশী হস্তক্ষেপ নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেভান্ট-এর জাতীয়তা ও সীমানা সঙ্কট নিয়ে চলমান বিতর্ক নির্দেশ করে যে, আরো বড় ও মৌলিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে সামনের দিনগুলোতে। তবুও আরব বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন এমনকি ফিলিস্তিন-ইসরাইল সঙ্কট নিরসনেও পদক্ষেপ নেয়নি কোনো আরব রাষ্ট্র। বরং অনেক ঘটনায় আরবদের চেয়ে বাইরের শক্তিগুলো বেশি ভূমিকা রেখেছে।

ক্রুসেড থেকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতা- ঐতিহাসিকভাবে বিদেশী হস্তক্ষেপের নজির আছে মধ্যপ্রাচ্যে। এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর লোভাতুর দৃষ্টি পড়েছে তাদের এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময় ছায়াযুদ্ধের ময়দান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে অঞ্চলটি। তাই অঞ্চলটির রাষ্ট্রগুলোতে বিশৃঙ্খলার জন্য বিদেশীদের দায়ী করা যায়; কিন্তু বিদেশীদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে কিংবা নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে দায়ী করার মাধ্যমে কোনো সমাধান আসবে না। কারণ সব কিছুর পরেও আরব বিশ্বের এমন কিছু সমস্যা রয়েছে, যা তাদের নিজেদেরই সৃষ্ট। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ও অকার্যকর শাসন, আঞ্চলিক গ্রুপিং এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অভাব। যে অঞ্চল নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে যথাযথ পদক্ষেপ নেয় না তাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার ওপর এই অঞ্চলটির জনগণের স্বাধীনতা অনেকটাই শাসকদের মর্জিনির্ভর। আরব বিশ্ব ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল হলেও বর্তমানে এর ৭০ শতাংশ জনগণের বয়স ৩৫-এর নিচে। আর বেশির ভাগ দেশেই এই যুবসমাজ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে বসবাস করছে। এটি শুধু মানবসম্পদের অপচয়ই নয়, এর ফলে সৃষ্টি হবে দীর্ঘমেয়াদি আর্থসামাজিক সমস্যা। আর এটি এই অঞ্চলের দেশগুলোর অসংখ্য অভ্যন্তরীণ সমস্যার একটি।

আরবদের কর্মপরিকল্পনার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে এবং অঞ্চল তথা নিজ নিজ দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অগ্রগামী হতে হবে নিজেদেরই। এর পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ এবং কৌশলগত সম্পর্ক ও মিত্রতা জোরদার করতে হবে। আর এটি যারা শুরু করবেন তাদের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে হুমকি প্রতিরোধে আধিপত্যবাদীদের আগ্রাসন ঠেকাতে। অন্য দিকে, এটিই তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করবে এবং আঞ্চলিক সমস্যা সমাধান ও সামরিক সঙ্ঘাত ঠেকাতে কূটনৈতিক সক্ষমতা জোগাবে। পাশাপাশি, আরবদের অবশ্যই তাদের জাতীয় পরিচয়কে সমুন্নত রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যথাযথ না হলেও ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার চেয়ে এটি অনেক ভালো। ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা অঞ্চলটির জন্য আরো বেশি হুমকি সৃষ্টি করবে। তাই এই হুমকি ঠেকাতে বর্তমান জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রগুলোতে কার্যকর শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত, বেশির ভাগ আরব দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই দাবি পূরণে সক্ষম নয়।

আরবদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, বিদেশী হস্তক্ষেপ ঠেকানো এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সেরা উপায় হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সংস্কার। কয়েক বছরে আরব জনগণের জাগরণ প্রমাণ করে যে, অঞ্চলটির মধ্যবিত্তরা একটি পরিবর্তনের অপেক্ষা করছেন। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে চেয়েছে একদল সুযোগসন্ধানী। কিন্তু এসব পদক্ষেপ যে চিরস্থায়ী ব্যর্থ শাসন ও শাসকদের একটি অংশের সংস্কারের ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আরবদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিকল্প দেয়া উচিত যাতে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে। বিশ্ব এখন আর দুই মেরুকেন্দ্রিক বা ইউরোপকেন্দ্রিক নয়। বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ আরব বিশ্বের জন্য যা দরকার তা হলো, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের মোকাবেলা ও আরব ভূখণ্ডে অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ করা। বর্তমান সঙ্কটের সমাধানে অবশ্যই জনগণের আকাক্সক্ষা ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে। শুধু স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি আনে এমন কৌশল ও কার্যক্রম ত্যাগ করতে হবে। মূলত মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা দিতে পারবে না এমন কোনো নীতি সফল হবে না। একক বা সম্মিলিত যেভাবেই হোক আরব দেশগুলোর অবশ্যই একটি স্বয়ংসম্পন্ন কৌশল থাকতে হবে, যা ভবিষ্যতে দেশী বা বিদেশী হুমকি থেকে তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আরবদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক রক্ষা ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে অনারব প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের বিষয়ে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেয়ার এটিই সর্বোৎকৃষ্ট সময়। আর আরব নেতাদের এটিও জানাতে হবে যে, কিভাবে তারা তাদের জনগণকে সুশাসন উপহার দেবেন। আরব বিশ্ব যদি নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের কথা বলতে চায়, বর্তমানে যেভাবে চলছে সেভাবে সম্ভব নয়। আরব নেতা ও জনগণকে এখনই নতুন করে পরিকল্পনা নিতে হবে।

লেখক : মিসরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত। বর্তমানে কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর : আহমেদ বায়েজীদ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.