সাইকেল বালিকারা

আসাদুজ্জামান আসাদ

সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য এখন আর বিরল নয়। অনেক এলাকায়ই এ দৃশ্য চোখে পড়ে। স্কুলড্রেস পরা একঝাঁক মেয়ে দলবেঁধে সাইকেলে করে স্কুলে যাচ্ছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এ দৃশ্য ছিল অচিন্তনীয়। এভাবেই নারীরা একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে।
এসব নিয়ে লিখেছেন আসাদুজ্জামান আসাদ
‘ঘড়ির কাঁটা সকাল সাড়ে ৮টা। স্কুলে পৌঁছাতে হবে সাড়ে ৯টায়। অনেকটা পথ। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়ি।’ দম বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল বোদা উপজেলা সদরের পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সীমা রায়। তার বাড়ি বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের বলরামহাট গ্রামে। চার দিকে সবুজ ভরা মাট। পিচঢালা আঁকাবাঁকা পথ। প্রতিদিন সকাল-বিকেলে বাইসাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে যেতে হয় বিদ্যালয়ে।
সীমা রায়। গায়ে সাদা-গাঢ়, সবুজ রঙের স্কুলড্রেস। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। মুখে মিষ্টিভরা চাঁদনি হাসি। জীবন, দেশ ও জাতির উন্নয়নের চিন্তা মাথায় নিয়ে ছুটে চলেছে সামনের দিকে। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী সীমা রায়। তার মা কৃষ্ণা রানী। বাবা প্রান্তিক কৃষক। বাবা কষ্ট করে মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করে যাচ্ছেন। পড়ালেখার জন্য মেয়েকে একটি সাইকেল কিনে দেন। এই অজপাড়াগাঁ থেকে প্রতিদিন মেয়েটা বাইসাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। আমার মেয়ে সীমাকে দেখে অনেকে কথার ছলে সাইকেল বালিকা বলে ডাকে।
শুধু সীমা নয়, বাইসাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে শতাধিক মেয়ে প্রতিদিন ৮-১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে আসে। পথেঘাটে বখাটে ছেলেরা উৎপাত করে। থাকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। তবুও থেমে থাকে না তাদের চলার পথ। এমনি ভাবে শীতের ঘন কুয়াশা, চৈত্র-বৈশাখের তাপদাহ আর জৈষ্ঠ্যের খাঁ খাঁ রোদ, বর্ষার ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার আলো ছিনিয়ে নিতে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হাজির হয় নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এমন মনোরম দৃশ্য দেশের আর কোথাও দেখা না গেলেও জেলার বোদা উপজেলায় প্রতিদিন সবার দুই নয়নে ভাসে। পিয়ারা, রশিদা, সেলিনা, নূপুর, রোজিনা, সাবিনা, মনীষা, পারভীন, তিথি, সীমা, রুনা, সমাপ্তি, শান্তনাসহ অসংখ্য ছাত্রী রয়েছে। এলাকার সবাই তাদের সাইকেল বালিকা বলে ডাকে। প্রতিদিন বোদা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সড়ক-মহাসড়ক পাড়ি দিয়ে তারা স্কুলে আসা-যাওয়া করে। এদের সবারই বাড়ি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। গাঁয়ের কাঁচাপাকা সড়ক দিয়ে যখন তারা লাইন ধরে স্কুলে যাতায়াত করে, তখন সবাই একনজর সে মনোরম দৃশ্য না দেখে থাকতে পারে না। অভূতপূর্ব মনোরম দৃশ্য! এমন দৃশ্য কয়েক বছর আগেও দেখা যায়নি।
এসব মেয়ে সাইকেল চালাবে? সমাজপতিরা একসময় তা সহ্য করত না। এখন তা বদলে গেছে। বলা যায়, সময়ের ব্যবধানে বদলে যাওয়াই স্বাভাবিক। এমন সামাজিক সংস্কার আইন করে হয়নি। তাই সমাজের প্রয়োজনে সামাজিক নিয়মকানুন বদলে যাওয়া, সামাজিক এই রীতিনীতিÑ নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক আন্দোলনেরই শুভসূচনা। আন্দোলনের এই সূচনা কেবল বোদা পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে পঞ্চগড় জেলার সর্বত্র।
জেলার গ্রামগঞ্জ থেকে স্কুল, কলেজের ছাত্রীরা সামাজিক কুসংস্কার ও বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এখন দলবেঁধে বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুল-কলেজে যাচ্ছে। দেশে সার্বিক ও টেকসই উন্নয়ন অর্জনের সব ক্ষেত্রে অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। একে কার্যকর করতে কিশোরী শিক্ষার্থীরা অনেক স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনে ছুটে চলেছে। ইচ্ছা পূরণের এ প্রবল আত্মবিশ্বাসের জোরে বহু প্রতিকূলতা মাড়িয়ে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে শহরের মানুষের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এসব সাইকেল বালিকা। যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে স্কুলে যেতে চায় না বেশির ভাগ ছেলে, সেখানে মেয়ে হয়ে তারা সাইকেল নিয়ে এত দূর পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসা করে। সাইকেল বালিকা সেলিনার বাড়ির কাছাকাছি আরো ১৫-২০টি পরিবারের স্কুলপড়–য়া মেয়েদের মায়ের সাথে কথা হয়। সবাই তাদের মেয়েদের নিয়ে গর্ববোধ করেন। সেলিনার বান্ধবী অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী রোজিনা আকতারের ঝটপট উত্তরÑ ‘সাইকেল চালিয়ে পড়াশোনা করে প্রকৌশলী হতে চাই।’ তার কথার সুর ধরে কৃষ্ণা হতে চায় চিকিৎসক এবং বোদা মহিলা মহাবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী রিক্তানা আক্তারও হতে চান ডাক্তার। স্কুলপড়–য়া সাইকেল বালিকাদের স্বপ্ন পূরণের এই অদম্য ইচ্ছা পূরণ হলে একদিন আলোকিত করে তুলবে আমাদের সামাজিক জীবন। সমৃদ্ধ হবে দেশ ও জাতি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.