অপারেটরদের আপত্তির মধ্যেই ফোর-জি তরঙ্গ নিলামের ঘোষণা

জাকির হোসেন লিটন

অপারেটরদের আপত্তির মধ্যেই ফোর-জি লাইসেন্স আবেদন ও তরঙ্গ নিলামের সময়সূচি ঘোষণা করেছে বিটিআরসি। গতকাল কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে বিটিআরসি সচিব সরওয়ার আলম নয়া দিগন্তকে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, আগামী ১৪ জানুয়ারি ফোর-জি লাইসেন্স আবেদন জমা দেয়ার সর্বশেষ সময়সীমা এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি তরঙ্গ নিলামের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই কমিশনের ওয়েবসাইট ও পত্রিকায় এ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন দেয়া হবে। গতকাল কমিশন বৈঠকের আগেই প্রস্তাবিত ফোর-জি গাইডলাইন ও তরঙ্গ নিলামের বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি তুলে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেয় মোবাইল ফোন অপারেটররা। চিঠিটি গ্রহণ করা হলেও তা আমলে না নিয়েই গাইডলাইন ও তরঙ্গ নিলামের সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ফোলি, রবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহতাবউদ্দীন আহমেদ এবং বাংলালিংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরিক অসের যৌথ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে তরঙ্গ ও প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা, ফের-জি গতি, ফাইবার নেটওয়ার্ক, ভ্যাট, কন্ট্রিবিউশন ফ্যাক্টরসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাবিত গাইডলাইনের ব্যাপারে আপত্তি জানানো হয়। আর সেই আপত্তির মধ্যেই ফোর-জি লাইসেন্স আবেদন ও তরঙ্গ নিলামের সময়সীমা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি।

কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফোর-জি লাইসেন্স আবেদনের সর্বশেষ সময়সীমা আগামী ১৪ জানুয়ারি। এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই আগ্রহীরা ফোর-জি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

টু-জির ৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড এবং থ্রিজির ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ নিলামে সময়সূচিও অনুমোদন দেয় কমিশন।
সময়সূচি অনুযায়ী ৪ ডিসেম্বর আবেদনপত্র আহ্বান, কোনো প্রশ্ন থাকলে তা জমা দেয়ার সময় ১৯ ডিসেম্বর, প্রি-বিড মিটিং ২১ ডিসেম্বর, কমিশনে আবেদনপত্র জমা ১৪ জানুয়ারি, যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ ২৫ জানুয়ারি, নিলাম প্রক্রিয়া নিয়ে পরামর্শ ২৯ জানুয়ারি, বিড আর্নেস্ট মানি জমা দেয়া ৫ ফেব্রুয়ারি, নিলামে অংশগ্রহণকারীর স্বীকৃতি/প্রত্যাখ্যানের চিঠি ৭ ফেব্রুয়ারি, মক নিলাম ১২ ফেব্রুয়ারি, নিলাম ১৩ ফেব্রুয়ারি এবং বিজয়ী আবেদনকারীদের নাম ঘোষণা ও নোটিশ দেয়া হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি।

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর ফোর-জি সেবার লাইসেন্স ও তরঙ্গ নিলামের নীতিমালা ২৯ নভেম্বর হাতে পায় টেলিযোগাযোগ বিভাগ।

ফোরজি লাইসেন্সের খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করে গত মে মাসে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠায় বিটিআরসি। পরে তা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যায়।

নীতিমালা অনুযায়ী, ফোর-জি লাইসেন্সের জন্য নিলাম হবে না। আবেদন করে নির্দিষ্ট অর্থ জমা দিয়ে লাইসেন্স নেয়া যাবে। অপারেটরদের আবেদন ফি হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। লাইসেন্স পেতে দিতে হবে ১০ কোটি টাকা। আর বার্ষিক নবায়ন ফি হবে পাঁচ কোটি টাকা। এ লাইসেন্স নিতে অপারেটরদের ১৫০ কোটি টাকা ব্যাংক গ্যারান্টিও দিতে হবে। রেভিনিউ শেয়ারিংয়ে সরকারকে দিতে হবে আয়ের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

অপারেটরগুলোকে ফোর-জি তরঙ্গ বরাদ্দ পেতে অংশ নিতে হবে নিলামে। নীতিমালায় এক হাজার ৮০০ মেগাহার্টজের তরঙ্গ নিলামের ভিত্তিমূল্য ঠিক করা হয়েছে প্রতি মেগাহার্টজে ৩০ মিলিয়ন ডলার। আর থ্রি জির দুই হাজার ১০০ মেগাহার্টজের প্রতি মেগাহার্টজ ২৭ মিলিয়ন ডলার এবং ৯০০ মেগাহার্টজের প্রতি মেগাহার্টজ ৩০ মিলিয়ন ডলার ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। টু জি ও থ্রি জি সেবার জন্য বরাদ্দ করা তরঙ্গে প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা পেতে (যাতে ওই তরঙ্গ যেকোনো প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা যায়) প্রতি মেগাহার্টজের জন্য চার্জ দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী গাইডলাইন অনুমোদনের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছিলেন, মোবাইল ফোন অপারেটরদের আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি করে ফোর-জি লাইসেন্সিং গাইডলাইন এবং তরঙ্গ নিলাম গাইডলাইন প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছে অপারেটররা যে ২৩টি বিষয় বিবেচনার জন্য অনুরোধ করেছিল তার মধ্যে ২২টি সম্পূর্ণভাবে এবং ২৩ নম্বরটি আংশিকভাবে বিবেচনা করেছি।

সজীব ওয়াজেদ জয়সহ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের একাধিকবার ঘোষণা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে টেলিকম অপারেটরদের দরকষাকষিতে এ বছরের মধ্যে আর ফোর-জি চালু হলো না।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে দেশে থ্রি-জি সেবা চালু করতে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেই অপারেটরগুলো। কিন্তু এখন পর্যন্ত লাভ তো দূরে থাক সেই বিনিয়োগের মধ্যে মাত্র ছয় হাজার কোটি টাকা মূলধন ফেরত পেয়েছে অপারেটররা। এরই মধ্যে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে, আবার ফোর-জি চালুর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। থ্রিজি সেবা চালু করে মোবাইল অপারেটরগুলো যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেজন্য ২৪টি বিষয়ে মত দিয়েছে অপারেটররা। এসব ইস্যুর সমাধান না করে আগের পথে হাঁটলে টেলিযোগাযোগ খাত একই ধরনের জটিলতায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। সেজন্য ফোর-জি নিলামের আগেই বিদ্যমান সমস্যার সমাধান চেয়ে আসছিল অপারেটররা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.