মানবঘাতক এইচআইভি এইডস  

ডা: মহাদেব চন্দ্র মণ্ডল

বর্তমান বিশ্বে মানবজাতির জীবন ও সভ্যতার জন্য বড় হুমকি হলো এইডস। এর কোনো চিকিৎসা নেই, নেই কোনো প্রতিষেধকও। পরিণতি অবধারিত মৃত্যু। তাই প্রতিরোধই হলো এর হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। এইডসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা। যার সুযোগ নিয়ে এ রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে একজন থেকে বহুজনের শরীরে, মহামারীর রূপ নিচ্ছে বিশ্বজুড়ে। লিখেছেন ডা: মহাদেব চন্দ্র মণ্ডল
সারা বিশ্বে এইডসে মারা যাচ্ছে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে আট হাজার মানুষ। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষ নতুনভাবে এইচআইভিতে সংক্রমিত অর্থাৎ প্রতিদিন সাড়ে ১৩ হাজার নতুন সংক্রমণ ঘটছে, যাদের অর্ধেকের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। তবে নতুন সংক্রমণের শতকরা ৯৫ ভাগই উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। কাজেই এ রোগটা বাংলাদেশে একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনজনের মধ্যে প্রায় একজনের মৃত্যু ঘটে এইডসের কারণে। এ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫০ লক্ষাধিক মানুষের শরীরে এইচআইভি পজিটিভ চিহ্নিত হয়েছে এবং সেখানে মৃত্যুর প্রথম ৯টি কারণের মধ্যে এইডসই এখন এক নম্বর কারণ (শীর্ষস্থানীয় মৃত্যুর কারণ)।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে এইচআইভি মহামারীর পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এইচআইভির হার ১%-এর নিচে। ১ ডিসেম্বর ২০০৪-এ প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৬৪ জন মানুষের দেহে এইচআইভি জীবাণু শনাক্ত করা গেছে। এই ৪৬৫ জনের মধ্যে এইডস আক্রান্ত হয়েছেন ৮৭ জন। এ পর্যন্ত এইডসের কারণে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। বলাবাহুল্য, যাদের রক্ত পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে কেবল তাদের মধ্য থেকেই উল্লিখিতসংখ্যক আক্রান্ত মানুষ পাওয়া গেছে। এর বাইরেও অনেকে রয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যাদের রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি।
এইচআইভি ও এইডস কী?
এইচআইভি একটি অতি ক্ষুদ্র জীবাণু বা ভাইরাস, যা মানুষের দেহে প্রবেশ করে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে আক্রান্ত মানুষের দেহে এক বা একাধিক রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা যায়, রেট্রোভাইরাস দলের এইচআইভি ভাইরাসের মাধ্যমে এইডস মানবদেহে সংক্রমিত হয়। HIV-এর পুরো নাম হলোÑ H = Human (মানুষ),I = Immuno-deficiency (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি), V = Virus (ভাইরাস)। আর AIDS-এর পুরো নাম হলোÑ A = Acquired (অর্জিত),I = Immune (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা), D = Deficiency (ঘাটতি/হ্রাস জনিত), S = Syndrome (অবস্থা/রোগের লক্ষণসমূহ) অর্থাৎ অর্জিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঘাটতির লক্ষণ সমষ্টিকে এইডস বলে। এইডস এক ধরনের প্রতিরোধযোগ্য ভয়ঙ্কর সংক্রামক মারণব্যাধি। এইডস কোনো জন্মগত রোগ নয়। এইডস কিন্তু একটা যৌন রোগও বটে। যেহেতু এখন পর্যন্ত এ রোগের কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি সেহেতু এ রোগের পরিণাম মৃত্যু। মনে রাখতে হবে, এই ভাইরাসটি শুধু মানুষেরই ক্ষতি করে এবং মানবদেহের মধ্যেই বেঁচে থাকে। কিন্তু অন্য কোথাও এই ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না।
এইচআইভি কিভাবে শরীরে রোগ সৃষ্টি করে?
মানবদেহে জন্মগতভাবেই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকে। প্রতিনিয়ত মানুষ নানারকম জীবাণুর সংস্পর্শে আসে। মানুষের রক্তে শ্বেতকণিকার এক ধরনের কোষসেল থাকে যা T-4 (CD4)বা ‘টি’ সাহায্যকারী সেল বা সংক্ষেপে ‘টি’ সেল নামে পরিচিত। এই ‘টি’ সেল প্রতিরোধ ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করে যার কাজ হচ্ছে, শরীরে অনুপ্রবেশকারী ভাইরাসের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে খবরাখবর ‘বি’ সেলকে অবহিত করা। ‘বি’ সেল এ খবরের ওপর ভিত্তি করে এন্টিবডি তৈরি করে, যা শরীরে প্রবিষ্ট জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে আমরা রোগাক্রান্ত হই না। এইচআইভি শরীরে প্রবেশ করে প্রথমেই সরাসরি আক্রমণ করে ‘টি’ সেলকে এবং এগুলোকে অক্ষম ও অকর্মণ্য করে ফেলে। ফলস্বরূপ এরা ‘বি’ সেলকে কোনো খবরই পাঠাতে পারে না। ফলে এক সময় শরীরে আর কোনো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে না। এ অবস্থায় কিছু সুবিধাবাদী জীবাণু যারা সাধারণ অবস্থায় দেহের কোনো ক্ষতি করতে পারে না; তখন তারা সুযোগ গ্রহণ করে। এদের আক্রমণে তখন দেহে নানারকম রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে এ অবস্থায় কোনো রোগ হলে সেটা আর ভালো হয় না। কোনো ওষুধও কাজ করে না। ধীরে ধীরে আক্রান্ত ব্যক্তি অবধারিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিরা এ কারণেই একই সাথে অনেক রোগে যেমনÑ যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগে ভুগে মারা যায়। তাই এইডস কোনো রোগের নাম নয়, কেননা এটা হলো অনেক রোগের লক্ষণের সমষ্টি (সিনড্রোম) দেখা দেয়, যার জন্য দায়ী এইচআইভি ভাইরাস।
আমরা এইডস কখন বলব?
এইচআইভি অনেকের শরীরে অনেক দিন থাকতে পারে। তবে শরীরে এইচআইভি থাকলেই এইডস হয়েছে এমন কোনো কথা বলা যাবে না। যাদের রক্ত পরীক্ষায় এইচআইভি পাওয়া যায় তাদেরকে ‘হিভ’ পজেটিভ কেস হিসেবে ধরা হয়। এই পজিটিভ ব্যক্তিদের মধ্যে কিছুসংখ্যক মানুষ ‘এইডস’-এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন, বিশেষ করে যাদের শরীরে ‘টি’ সেলের সংখ্যা যখন প্রতি কিউবিক মিলিমিটারে ২০০ বা এর নিচে নেমে আসে।
এইডস রোগ হতে কত দিন সময় লাগে? শরীরে এইচআইভি ঢোকার পর সাথে সাথে কোনো লক্ষণ থাকে না বা শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। শুধু রক্ত পরীক্ষা করে শরীরে এই ভাইরাস আছে কি না জানা যায়। এইচআইভি শরীরে ঢোকার পর থেকে কত বছর পর এইডস হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এটা দুই বছর হতে পারে আবার ১৫ বছর পরও হতে পারে (গড়ে ১০ বছর)। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের পদ্ধতির ওপর তা অনেকাংশে নির্ভর করে। তবে একবার এ ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে এক সময় এ রোগ দেখা দেবেই, এর হাত থেকে রক্ষার কোনো উপায় নেই অর্থাৎ অবধারিত মৃত্যু।
এইডস কিভাবে ছড়ায় না?
এইডস রোগীর সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করলে, একই বিছানায় ঘুমালে, একই পায়খানা ব্যবহার বা দৈনন্দিন সাধারণ কাজ করলে, চুমু খেলে বা শরীর স্পর্শ করলে; করমর্দন, কোলাকুলি বা একসাথে চলাফেরা করলে। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁচি, কাশি বা থুথুর মাধ্যমে। একই থালাবাসনে খাবার খেলে, একই গ্লাসে পানি বা একই কাপে চা পান করলে। জামাকাপড়, তোয়ালে বা গামছা বা বিছানার চাদর ব্যবহার করলে। একই গোসলখানা বা পায়খানা ব্যবহার করলে বা এইডস রোগীর বসার জায়গায় বসলে। মশা, মাছি বা অন্য কোনো পোকা-মাকড়ের কামড় বা ইঁদুর, বিড়ালের কামড় থেকে। একসাথে পুকুরে সাঁতার কাটলে।
লেখক : রেসিডেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, মনোরোগ ও মাদকাসক্ত বিশেষজ্ঞ, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, তেজগাঁও, ঢাকা

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.