সালেহ হত্যাকাণ্ড : ইয়েমেন যুদ্ধের নতুন রূপ
সালেহ হত্যাকাণ্ড : ইয়েমেন যুদ্ধের নতুন রূপ

সালেহ হত্যাকাণ্ড : ইয়েমেন যুদ্ধের নতুন রূপ

আদিবা শাইয়ারা

ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ আরো প্রলম্বিত হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। ২০১১ সালে আরব বসন্তের পর এ অঞ্চলে যে ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটতে থাকে তার প্রভাব পড়েছিল ইয়েমেনে। আরব বসন্তের প্রভাবে সবচেয়ে রক্তাক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ইয়েমেন আর সিরিয়ায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতায় ২০১১ সালের মার্চ মাসে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান আলী আবদুুল্লাহ সালেহ। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি রাজনীতির মাঠে আর ফিরবেন না। ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার পর তার দলের নেতা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দু রাব্বো মনসুর হাদি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির উদগ্র বাসনা তাকে আবার টেনে নিয়ে যায় রক্তাক্ত রাজনীতির মাঠে। শেষপর্যন্ত জীবন দিয়ে রাজনীতির সমাপ্তি ঘটালেন। কিন্তু এই মৃত্যু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আরো নতুন মাত্রায় রূপ নিতে পারে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় দেশগুলো যখন মনসুর হাদি সরকারকে নিয়ে ইরান সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। তখন সালেহ হাউছি বিদ্রোহীদের সাথে যোগাযোগ করে হাদি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। বলা যায় সানায় হাউছিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সালেহের অনুগতরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অথচ তিনি একসময় ছিলেন সৌদি আরবের বিশ্বস্ত শাসকদের একজন। মনসুর হাদি সরকার রাজধানী সানায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলেও সালেহ হাউছিদের সাথে সানায় অবস্থান করেন। কিন্তু সানায় প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে হাউছিদের সাথে সালেহের জোট শেষ পর্যন্ত টেকেনি। কারণ দুই গ্রুপের আদর্শিক অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্ষমতা থাকাকালীন শিয়া হাউছিদের দমনে তার সরকার বহু অভিযান চালিয়েছে। ফলে দুই দলের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ছিল না।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে ২ নভেম্বর হঠাৎ করে তিনি ঘোষণা দেন ইয়েমেনের যুদ্ধ ও অবরোধ অবসানে সৌদি আরবের সাথে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন। শিয়া হাউছিদের সাথে তার বিপরীত আদর্শিক অবস্থানের দিকটি তুলে ধরেন। এ ঘোষণার এক দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর হাউছি বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তিনি সাপের ঘরে বসবাস করে সাপ নিয়ে খেলছিলেন। তার এই পরিণতি অস্বাভাবিক ছিল না।

আরব বিশ্বে যে কয়েকজন শাসক দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন, আলী আবদুল্লাহ সালেহ তাদের একজন। ১৯৭৮ সালে সেনাকর্মকর্তা আলী আবদুল্লাহ সালেহ উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালে দুই ইয়েমেন একত্র হলেও অখণ্ড ইয়মেনের প্রেসিডেন্ট হন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের পক্ষে অবস্থান নিলে তিনি সৌদি আরবসহ পশ্চিমা বিশ্বের প্রবল চাপের মুখে পড়েন। কিন্তু পরবর্তীকালে তার অবস্থান বদল করে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন।

আলী আবদুল্লাহ সালেহের দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার মূল সূত্র ছিল বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ে সক্ষমতা। তার মৃত্যুর পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধে উপজাতীয় সঙ্ঘাত তীব্র রূপ নিতে পারে। তার সমর্থকেরা শিয়া হাউছিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য যুদ্ধ প্রলম্বিত করতে পারে। ইয়েমেনের যুদ্ধে ইতোমধ্যে মারা গেছে ১০ হাজার মানুষ। সৌদি আরবের অবরোধ আর দুর্ভিক্ষে সাত লাখ মানুষ চরম অমানবিকতার মধ্যে আছে। রিয়াদে অবস্থানরত মনসুর হাদি তার প্রতিদ্বন্দ্বী আলী আবদুল্লাহ সালেহ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে হাউছিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। একই আহ্বান জানিয়েছেন আরব আমিরাতে অবস্থানরত তার পুত্র। আরব লিগ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ফলে ইরান সমর্থিত হাউছিদের বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে এখন ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। ফলে যুদ্ধ আরো ভয়াল রূপ নিতে পারে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.