বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট

আলমগীর কবির

বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট দীর্ঘতর ও স্থায়ী হয়ে উঠেছে। শঙ্কা হয়, পরিত্রাণের পথ রুদ্ধ হয়ে আসছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এ সঙ্কটে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া দেশটি নানা প্রতিকূলতার সাথে সংগ্রাম করে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সামাজিক নেতৃত্ব ভেঙে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি, সততা, ত্যাগ, জনগণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ আছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের সবচেয়ে বড় জোগানদার দেশের কৃষকসাধারণ, প্রবাসীদের শ্রম আর ঘামে অর্জিত ও প্রেরিত অর্থ, পোশাক শিল্পের সুফল, দেশের তরুণ শক্তির উৎপাদন উদ্যোগ, মেধা ও জ্ঞানের বিকাশ এ দেশের মাথা উঁচু করে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্ঘটনা, ভবনধস, লঞ্চডুবি, ভুল চিকিৎসা, অর্থাভাব ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যু প্রভৃতি মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনার অংশ। বাংলাদেশ আত্মীয় ও অতিথিবৎসল সমাজে অভ্যস্ত; ধর্মের প্রতি অনুরাগী, সহানুভূতিশীল ও সংবেদনশীল। ধারদেনার সংস্কৃতি ও সহজ-সরল সাদাসিধে জীবনবোধে উজ্জীবিত। তাই ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, সহজিয়া, আখড়া সংস্কৃতি মানুষের মর্মমূলে; হৃদয় উৎসারিত করে; কিন্তু এসব কিছুর অস্তিত্ব অনেকটা হারিয়ে গেছে।

গণতন্ত্রের নামে বাংলাদেশের সমাজে নতুন এক করপোরেট শ্রেণী ও তাদের সংস্কৃতির উদয় ঘটেছে, যারা রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার, দল করে, দলের নেতা, সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, কর্মবিমুখ, তাদেরই দোসররা, অন্যের ইনকামের লভ্যাংশের ভাগীদার। রাষ্ট্র ও সমাজ এই শ্রেণীর হাতে বিপন্ন। তাদের হাতেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি, টেন্ডারবাক্স ছিনতাই, আগ্নেয়াস্ত্র, আত্মসাৎ, নিয়োগ-বাণিজ্য, ভর্তি-বাণিজ্য, মনোনয়ন-বাণিজ্য, পদ-পদবি বণ্টন-বাণিজ্য; গ্রেফতার-বাণিজ্য, চাকরির প্রমোশন ও পোস্টিং-বাণিজ্য, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, গুম, অপহরণ, থানার দালালি, মিথ্যা মামলা, প্রতিপক্ষ নির্যাতন, অপদস্থ করা, ধরপাকড়, অর্থ আদায়, রিলিফের মাল আত্মসাৎ, নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদ, অপরাধীর অবাধ বিচরণ, বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজের এক বীভৎস রূপ ও নতুন কাঠামোর অপপ্রকাশ। এই ভয়াবহ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন সংগঠিত শক্তি হয়ে দানবশক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ বাধ্য হয়ে দুর্বৃত্তায়ন মেনে নিচ্ছে; এক দুর্বৃত্তের বদলে অন্য দুর্বৃত্তকে কাছে টানছে। অথচ দল ও ক্ষমতার শীর্ষ পদে বসা ‘নেতা ব্যক্তিরা’ জানেন, দেশে কিসের তাণ্ডব চলছে। তাদের সংসদ সদস্যরা (বেশির ভাগ) গরিব মানুষের রিলিফের চাল আত্মসাৎ করেন, প্রজেক্টে ভাগ বসান। প্রতিটি নিয়োগে টাকা খান, এমনকি হাসপাতালের সুইপার নিয়োগেও। বাংলাদেশ বেহায়া-বেতমিজদের কবলে পড়েছে যেন উদ্ধার করবে কে? শুধু একটি নির্বাচনই কি উদ্ধারের পথ?

রাষ্ট্রক্ষমতা, দল ও রাজনীতির সুবাদে এসব দুর্নীতি ও লুণ্ঠন আপাতত ধরাছোঁয়ার বাইরে। ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলে দুর্নীতি অব্যাহত রাখা যায় এবং সম্পদ নিরাপদ থাকে। ক্ষমতার শক্তি, অপকর্ম ঢেকে রাখে এবং প্রতিপক্ষকে দমন করা, চরিত্র হনন, মিথ্যা মামলার বেড়াজালে দিশেহারা করা সহজ হয়। দেশে নিরাপত্তা সঙ্কট, রোহিঙ্গা সঙ্কট, সীমান্ত সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, কৃষি ও শিল্পে সঙ্কট, বিদেশী বিনিয়োগ সঙ্কট, সর্বগ্রাসী আমলাতন্ত্র, ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ত্রাস (উগ্রবাদ), বিচারহীনতা, দুর্নীতি দূরীভূত করে দেশকে মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং আমাদের প্রাচীন সমাজকাঠামো ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনা যখন করণীয়, তখন সব কিছুকে ছাপিয়ে নির্বাচন আর নির্বাচন কমিশন নিয়ে সঙ্কট আজ বড় হয়ে উঠেছে। দল ও দলীয় রাজনীতি এখন অন্তঃসারশূন্য। সমস্যা ও সঙ্কটে পর্যুদস্ত জনগণের জন্য চিন্তাভাবনা রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে তেমন নেই। শেয়ারবাজার লুণ্ঠন, ডেসটিনি ও হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বহু ব্যাংক প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া করে ফেলা ইত্যাদি রাষ্ট্রের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।

‘আরব্য রজনীর চল্লিশ চোর’ তাদের সম্পদ লুকিয়েছিল পাহাড়ে চিচিং ফাঁকে, বাংলাদেশের চোররা টাকা ‘বৈধ’ করে নেয় এবং তা লুকাতে হয় না। অপকর্ম ও ইতরামির হিসাব পর্যন্ত দিতে হয় না। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না ওদের। দেশের জেলায় জেলায়, থানায় থানায় ‘চেতনাওয়ালা’ লুটেরা নতুন একটা শ্রেণী গড়ে উঠেছে। ক্ষমতার বলে তারা তাদের সব কিছু বৈধ করেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গণতন্ত্র, সমাজ, রাষ্ট্রকাঠামোকে ওলটপালট করে দিয়েছে। অথচ বলা হয় এটি ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ জাতীয় নির্বাচনকে ছলচাতুরী, উসকানি, ঠাট্টা-মশকারা প্রভৃতির মধ্যে ফেলে দিয়ে স্বার্থ হাসিল কারা করেছে? এ সঙ্কট কাদের সৃষ্ট? ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে সরকারের ‘ধারাবাহিকতা রক্ষা’র ব্যবস্থাপত্র নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত সফরে আসেন এবং অনুগত সেবক এরশাদকে জোর করে রাজনৈতিক বটিকা গেলানো হয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনও এ খেলায় অংশগ্রহণ করেছিল।

আন্দোলনরত বিরোধী দল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে সরে যেয়ে ওই খেলারই অংশ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বিরোধী দলের ভেতরে কিছু লোক কখনো নির্বাচনবিরোধিতা আবার মাঝপথে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনীতিকদের মধ্যে অনেকেরই ন্যাশনাল সেন্টিমেন্ট নেই। তারা ক্ষমতায় থাকা অথবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য খুবই আপত্তিকর রাজনীতির চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছেন। নীতি-আদর্শের রাজনীতি বেশি নেই। যা হোক, সুজাতা সিংয়ের আচরণ আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ছিল সরাসরি হস্তক্ষেপ, বাংলাদেশের জাতীয় সেন্টিমেন্টে আঘাত; কিন্তু রাজনীতিকেরা ছিলেন নিশ্চুপ। এটা এক আত্মঘাতী বিপজ্জনক প্রবণতা, যাতে জড়িয়ে পড়েছিল রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান। জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিশ্বের বহু দেশ বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচন, সংসদ ও ঐকমত্যের সরকার গঠনের তামাশা মেনে নেয়নি। সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং নতুন নির্বাচনের ওয়াদা কিন্তু পালন করেননি ক্ষমতাসীনরা।

নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ায় গণতন্ত্র দুর্বল হচ্ছে। সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক সঙ্কট নিরাপত্তার সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটে জাতি দিশেহারা। দেশের মূল সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যাসহ নতুন নতুন সমস্যায় জড়িয়ে দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। পরিত্রাণের উপায় অর্থবহ নির্বাচন। এ ছাড়া উত্তরণের আর কোনো পথ নেই।

লেখক : রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.