মুস্তাফা জামান আব্বাসী : অন্য আনন্দের মানুষ

জাকির আবু জাফর

কবিতা-প্রেম আমার ভেতর বাসা বেঁধেছিল খুব কম বয়সেই। একটি অদম্য আকর্ষণ ছিল কবিতার প্রতি। কবিতা পাঠ, মুখস্থ করা এবং আবৃত্তি করা ছিল এক ধরনের নেশা। হৃদয়ের গভীর থেকে ভালো লাগার এক আশ্চর্য অনুভূতি খেলা করত আমার ভেতর। ফলে দিন-রাত, সকাল-দুপুর-বিকাল কিংবা সন্ধ্যা ছিল আমার কবিতার সঙ্গী। এভাবেই কবিতা আমাকে নিক্ষেপ করে এক ধরনের ঘোরের ভেতর। সেই ঘোরের জাল ক্রমাগত বিস্তৃৃত হচ্ছে আজো। এভাবে কবিতার ঘোরের সাথে গলাগলি হলো গানের সুর। তাও সেই কিশোর কালেই। গান শুনলেই তার সুর কণ্ঠে তুলে নেয়ার অবাক প্রেরণা জোগাত আমার মনই। শুরু হতো গুনগুন ধ্বনির প্রকাশ। হৃদয় থেকে অথবা হৃদয়ের গভীর থেকে সুরের মায়া জেগে উঠত আমার ভেতর। পেয়ে বসেছিল কবিতার মতো গান মুখস্থ করার পাগলামি। এভাবে কত গান মুখস্থ করেছি তার কোনো সংখ্যা নেই। কবিতার প্রতি, গানের প্রতি অদম্য আকর্ষণ আমার ভেতর জাগিয়ে দিলো অন্য পৃথিবী। আনন্দকে আমার করে তোলার প্রেরণায় দুলতে থাকি। এমন দোলাদুলির প্রেরণা গান ও কবিতাঙ্গনের মানুষদের প্রতি এক দুর্বার প্রেম জাগিয়ে দেয়। কবি কিংবা শিল্পীর প্রতি জেগে ওঠে ভালোবাসার জোয়ার। এমন ভালোবাসার একজন মানুষই মুস্তাফা জামান আব্বাসী। তার সুর যেমন আমাকে আকর্ষণ করেছে তেমনি তার অবয়ব। তার রুচি এবং তার পোশাক-আশাক সবই ছিল আমার পছন্দের। দূর থেকে তার গান শুনি। কথা শুনি। দেখি উপস্থাপনা। তাও গান নিয়েই। প্রথম কবে দেখা হয়েছিল মনে নেই। কোথায় তাও না। কিন্তু মনে আছে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি আমাকে মন থেকেই গ্রহণ করেছিলেন। গ্রহণ করেছিলেন আনন্দের সাথে। তার প্রতি আমার যে ভালোবাসা শ্রদ্ধা জেগেছিল তা বেড়ে গেল বহুগুণে। বেড়ে গেল তার কারণে। তার আচরণে। তার অকৃত্রিম সম্ভাষণে এবং অকপট উচ্চারণে। তার শিল্পীসুলভ সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে। মনের স্বচ্ছতা আমাকে আকর্ষণ করে। ফলে আমি তাকে অনুভব করি অন্যভাবে। তাকে দেখি চেতনার গভীর থেকে। আমি যেমন ভালোবাসি তাকে, তিনিও আমাকে ভালোবাসেন। আমার কবিতার প্রতি আছে তার অসাধারণ মুগ্ধতা। উচ্চকণ্ঠে আমার কবিতার প্রশংসা করতেও দ্বিধা নেই তার। তিনি যা বিশ্বাস করেন তার প্রতি অকপট। তার প্রতি উচ্চকণ্ঠ। ব্যক্তিগতভাবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবেও। প্রসঙ্গ এলেই প্রশংসা করতে ভোলেন না তিনি। কার্পণ্যও নেই। উদার হৃদয়ের মানুষ তিনি। তার উদারতার ঐশ্বর্য সত্যিই প্রশংসা পাওয়ার মতোই। তাকে প্রশংসা করি। তাকে শ্রদ্ধা করি। তাকে ভালোবাসি। আমার এ ভালোবাসাও অকৃত্রিম। আমাদের সম্পর্কও এক ধরনের বন্ধুত্বসুলভ। বয়সের ব্যবধান যা-ই থাক আমরা বন্ধু। তাকে বরাবরই প্রশান্তচিত্তের দেখেছি। ফুরফুরে মন। ফুরফুরে মেজাজ। মন্দ ব্যবহার নেই কারো সাথে। কাউকে অপছন্দ হলে এড়িয়ে যান। পছন্দ হলেই গ্রহণ করেন। যা বলার বলে ফেলেন। চাঁছাছোলা নয়। শিল্পের মোড়কে। বুদ্ধিবৃত্তিক আবরণে। যে বোঝার বোঝে। না বোঝার যারা চেয়ে থাকে হা হয়ে। কিন্তু তার কথা বলে ফেলেন তিনি। বলে ফেলেন অকপটে। তার বিশ্বাসের প্রতিও তিনি অকপট। বিশ্বাসের চৈতন্য তাকে দিয়েছে দৃঢ়তা। দিয়েছে প্রেরণা। সে প্রেরণায় পথ চলেন তিনি। পথ দেখান অন্যকেও। ফলে পথে পথেই দেখা মেলে তার। দেখা মেলে বিভিন্ন সঙ্গীত আসরে। সাহিত্য জলসায়। টেলিভিশন রেকর্ডিং সেন্টারে।

কোনো গান প্রতিযোগিতার বিচারকের আসনে। এভাবে আমাদের দেখা। এভাবেই আমাদের মুখোমুখি। মুস্তাফা জামান আব্বাসী একজন লেখক। একজন সাহিত্য সাধক। লেখেন আপন আনন্দে। লেখেন বিবেকের তাড়নায়। লেখেন সমাজকে নিয়ে যেতে সুন্দরের দিকে। তার লেখায় আছে নিজস্ব ঢঙ। নিজস্ব উপস্থাপনা। নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তিনি তার মতো করে লেখেন। তার মতো উচ্চারণ করেন। তার মতোই উপস্থাপন করেন। তিনি লেখেন বিশ্বাস থেকে। ঐতিহ্যের চেতনা থেকে। সুস্থ সংস্কৃতির প্রেরণা থেকে। লেখেন মূল্যবোধের জায়গা থেকে। বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটতে দেখলে হাহাকার করেন তিনি। ঐতিহ্যের অবমূল্যায়নে ব্যথিত হন। অপসংস্কৃতির ছোবলে নীল হয়ে যান। সামাজিক অবক্ষয় তাকে পীড়া দেয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনায় দারুণ আহত হন। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্বেষ। জীবনের বিরুদ্ধে জীবনের সংহার এবং মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের কুৎসা রটনার বিরুদ্ধে তার উচ্চারণ। তিনি জীবনের পক্ষে। জীবন সুন্দরের পক্ষে। জীবনের নান্দনিকতার পক্ষে। সঙ্গীতের সৌন্দর্য এবং সুরের মাধুর্যতায় তিনি সাজাতে চান তার দেশকে। তার সমাজকে। তার সময়কে। আত্মোপলব্ধির জয়গানে মুখর তিনি। তিনি মানুষকে আত্মার দিকে ফেরার কথা বলেন। আত্মার সাথে কথা বলার কথা বলেন। আত্মাকে শাণিত করার কথা বলেন। আত্মার পবিত্রতা তার কাম্য। আত্মার শুদ্ধতা কামনা করেন তিনি। তিনি কামনা করেন বিশ্বাসের পবিত্রতা। বিশ্বাস পবিত্র হলেই মানুষ পবিত্র হয় এ কথাই বলেন তিনি। আধ্যাত্মিক চেতনায় তিনি আলোকিত। এ চেতনার সঞ্চারকও তিনি। লেখায় কথায় আচরণে থাকে তার প্রকাশ। জীবনযাপন পদ্ধতিতেও রূপায়ণ থাকে তার। তিনি এমন আনন্দময় জীবন বেছে নিয়েছেন যেখানে মালিন্য নেই। দাগ নেই। খেদ নেই। বেদনাও নেই। আছে সুন্দরের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। তার প্রিয় কবি রুমী। রুমীর মসনবীর একজন নিবিড় পাঠক। শেখ সাদীর প্রতি তার ভালোবাসা অগাধ। ফরিদ উদ্দীন আত্তারের প্রতি রয়েছে তার অনুভব। জামীকে ভালোবাসেন তিনি। শামসেদ তাবরিজির প্রতি তিনি বিশ্বস্ত। ফেরদৌসিকে উচ্চারণ করেন। আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের প্রতি তার অগাধ প্রেম। বিস্তর ভালোবাসা। নজরুলকে অনুভব করেন হৃদয়ের গভীর থেকে। নজরুলের গানে তিনি সমর্পিত। নজরুল তার আত্মার আত্মীয়। তার সুরের পৃথিবীতে নজরুল জোছনার মতো প্লাবিত। নজরুলের হামদ-নাত তার রক্তের সাথে সঞ্চারিত। হজ করতে গেলেন আব্বাসী ভাই। গেলেন মদিনায়। রাসূলের রওজার পাশে দাঁড়ালেন। দরুদ পড়লেন। তারপর শুরু হলো সুরের ঝরনাধারা। সে সুর সেই কবির যিনি আজীবন নবীর রওজায় দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন। রওজায় দাঁড়িয়ে নবীকে সালাম দেয়ার আকাক্সক্ষা পুষতেন। কিন্তু তার সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি কোনো দিন। যে বেদনার কথা কত গানে তিনি প্রকাশ করেছেন। কত গানে তাকে সুর দিয়েছেন। তিনি নজরুল। তিনি পৃথিবীর গানের ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ যুগ। রাসূল প্রেমের আশ্চর্য সুর তার মতো কে বেঁধেছে আর। তিনি যেতে পারেননি নবীর রওজায়। কিন্তু তার গান তার সুর চলে গেছে নবীর কাছে। পৌঁছে দিয়েছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। দরুদ পড়েই তিনি নজরুলের নাতগুলো একে একে গাইতে শুরু করলেন। আব্বাসী ভাইয়ের বর্ণনায়- ‘আমি নবীর রওজায় দাঁড়ালাম। দরুদ পড়লাম। তারপর শুরু করলাম নজরুলের নাতগুলো গাওয়া। আমার দু’চোখে অশ্রু নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে। মুখ বেয়ে ভিজে যাচ্ছে বুক। অনবরত চলতে থাকে সুরের ধারা। কতক্ষণ চলেছে আমি জানি না। যখন শেষ হলো তখন মনে হলো আমার বুকটা হালকা হয়েছে। নজরুলের প্রতি কিছুটা শোধ হয়েছে ঋণ।’ কী আশ্চর্য, যে কবি সারা জীবন বাসনা করেছেন নবীর রওজার। সে বাসনার তীব্রতায় পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাত রচনা করেছেন। তার সে সুর পৌঁছে গেল নবীর কাছে। পৌঁছে গেল আব্বাসী ভাইয়ের কণ্ঠে। আব্বাসী ভাই মদিনা থেকেই ফোন দিলেন আমাকে। বললেন আমি এখন মসজিদে নববীতে। আপনাকে মনে পড়ল। তাই ফোন। আনন্দে আমার বুকটা ভরে উঠল। আমি বললাম- আল্লাহু আকবার। একি আনন্দের কথা বলছেন আব্বাসী ভাই। তিনি বললেন- এটাই সত্য। সত্য বলেইতো এই ফোন। আমি দোয়া চাইলাম। বললেন- অনেক দোয়া করছি আপনার জন্য। এমন ভালোবাসা ক’জনের ভাগ্যে জোটে আমি জানি না। ভালোবাসার এ প্রশ্রয় পেয়ে আসছি তার কাছে। তার সঙ্গিনীর কথা না বললে অকৃজ্ঞতা হবে। তিনি আরেকজন। তিনি আরেক দিগন্ত। তিনিও অন্য মাপের মানুষ। তিনি আসমা আব্বাসী। তিনি আমার আপা। আমার বড় বোন। আমাকে ছোট ভাইয়ের মতোই স্নেহ-মমতা জমিয়ে দেন। বনেদি পরিবারের সদস্য তিনি। সৈয়দ মুজতবা আলী যিনি অন্যতম শ্রেঠ রম্যসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বাংলা সাহিত্যে। তিনি আসমা আব্বাসীর মামা। মুস্তাফা জামান আব্বাসী এবং আসমা আব্বাসী দু’জন একসাথে হলে আমার আনন্দ আর ধরে না। দু’জনই আমাকে প্রশংসার সুখে জাগিয়ে দেন। দু’জনই আমাকে দোয়া করেন। আসমা আপাও লেখালেখির মানুষ। তারও নিজস্ব ঢঙ আছে লেখার। আমার প্রফেশনের খাতিরে লেখালেখির জন্য জ্বালাই আসমা আব্বাসীকেও। বিশেষ করে ঈদ ম্যাগাজিনের জন্য। অবশ্য লেখার কথা বললে তিনি খুশিই হন। যখই চেয়েছি আনন্দেই দিয়েছেন। লিখেছেন নিজের মতো। লেখালেখির জন্য বেশি জ্বালাই আব্বাসী ভাইকে। বিশেষ সংখ্যার জন্য। সাহিত্য পাতার জন্য। ঈদ ম্যাগাজিনের জন্য। এভাবে বিভিন্ন উপলক্ষের জন্য। কখনো না বলেননি। কোথাও কোথাও অভিমান থাকে কিছুটা। কিন্তু লেখা তিনি দেনই। যখন চেয়েছি, যা চেয়েছি পেয়েছি। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার লেখালেখির কথা বলছিলাম। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে লেখেন। লিখেছেন। তার বই সংখ্যা নেহায়েতই কম নয়। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সংগীত ভ্রমণ এবং উপন্যাসমহ তার বই সংখ্যা ৪৯টি তার বড় কাজ নজরুল নিয়ে। নজরুলের গান নিয়ে লিখেছেন। লিখেছেন কবিতা নিয়ে। নজরুলের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে। নজরুল-আব্বাসউদ্দিনের সম্পর্ক নিয়ে। বিশেষ করে লিখেছেন নজরুলের জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস। মুস্তাফা জামান আব্বাসী অনুপ্রেরণার মানুষ। তাকে দেখলে আগ্রহ জাগে। স্বপ্ন জাগে। জাগে প্রেরণার মতো উৎসাহ। তিনি আমার। তিনি আমাদের। তিনি সবার। সমাজ ও দেশের। তার জন্য শুভ কামনা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.