ট্রাম্পের বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত
ট্রাম্পের বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত

ট্রাম্পের বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত

দাউদ কুতুব

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সেই সাথে ঘোষণা দিয়েছেন তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তরের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলি দূতাবাস তেলআবিব থেকে সরিয়ে কী হবে এর প্রভাব, তা নিয়ে এ লেখাটি দাউদ কুতুব লিখেন ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার আগের দিন। সে প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই এই লেখাটি পাঠকদের পাঠ করতে হবে


১৯৪৮ সালে মার্কিন সরকার ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকেই কারো সন্দেহ থাকার কথা নয় যে, আরব বিশ্বের সাথে ইসরাইলের দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কোথায়। তার পরেও সর্বদাই ইসরাইলপন্থী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বজনমতকে শ্রদ্ধা করত। এটাও সত্য, বিভিন্ন সময় ফিলিস্তিন প্রশ্নে কিছু পদক্ষেপযোগ্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে তারা; কিন্তু জেরুসালেম প্রসঙ্গ সামনে এলেই যুক্তরাষ্ট্রের আসল অবস্থানটি স্পষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ দিন সারা বিশ্বের মতো যুক্তরাষ্ট্রও সবসময় ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেম দখলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে এবং শহরটিকে ফিলিস্তিনের অন্যান্য শহরের মতোই দখল করা ভূখণ্ড হিসেবে দেখে আসছে। আন্তর্জাতিক আইনেও স্পষ্টভাবে বলা আছে, ইসরাইল তাদের সামরিক বা বেসামরিক শাসনের অধীনে থাকা কোনো এলাকার মর্যাদা বদলাতে পারবে না।

ইসরাইলপন্থী হোয়াইট হাউজ
মার্কিন পার্লামেন্ট অতীতে অনেকবার ইসরাইলবান্ধব আইন পাস করেছে, যা দেশটির সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পররাষ্ট্রনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এ জন্য কেউ কেউ মার্কিন পার্লামেন্টকে ‘ইসরাইল অধিকৃত ভূখণ্ড’ হিসেবেও অভিহিত করেন। তবে ধারাবাহিকভাবেই মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এসব আইনের বিরোধিতা করে আসছেন এবং এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বারবার পিছিয়ে দিয়েছেন।

উদাহরণ- জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তরের আইনটি মার্কিন পার্লামেন্টে পাস হয়েছে ১৯৯৫ সালে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি বাস্তবায়ন না করলে সেটি হবে আইনের লঙ্ঘন; কিন্তু এ রকম একটি কঠোর ও গুরুতর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টরা প্রতি ছয় মাস পরপর একটি অস্থায়ী আদেশে স্বাক্ষর করতেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পও চলতি বছর জুলাইয়ে এ রকম একটি আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। আর ট্রাম্পের সেই আদেশের সূত্র ধরেই তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার’ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। তবে গত ছয় মাসে সেই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।

নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের প্রচারণা দলের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক নিয়ে তদন্তে নতুন করে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন জ্যারেড কুশনার, ফলে হোয়াইট হাউজে তার তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে। অন্য দিকে, ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের ওপর বেড়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের প্রভাব। ইহুদিবাদী খ্রিষ্টান পেন্স দীর্ঘ দিন ধরেই জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তরেরর পক্ষে চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। আর গত মঙ্গলবার তিনি তার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করেন, যে দিন ট্রাম্প ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ফোন করে তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তরে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানান।

ট্রাম্প যদি এ পদক্ষেপ নেন (ইতোমধ্যে নিয়ে ফেলেছেন) তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হবে প্রথম দেশ, যারা জেরুসালেমে ইসরাইলি দূতাবাস স্থানান্তর করল। এটি হবে বিরোধপূর্ণ শহরটি নিয়ে কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক ঐকমত্যকে উল্টে দেয়া। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর শহরটির অর্ধেকের বেশি দখল করে নেয় ইসরাইল।

স্পর্শকাতর ইস্যু
আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারি না ট্রাম্প পদক্ষেপটি নেবেন কি না। ট্রাম্প হয়তো আইনটি বিলম্বিত করার আরো একটি আদেশে স্বাক্ষর না করার হুমকি দিয়ে নতুন কোনো সমঝোতার খেলা খেলতে পারেন। আবার এমনো হতে পারে তিনি স্বাক্ষর করলেন, আবার হোয়াইট হাউজও জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করল। তবে দুটোতেই সমস্যা রয়েছে। তিনি যদি পুরো জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন তাহলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ফিলিস্তিনি জনগণকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা এবং পুরো অঞ্চলে শান্তি আনতে তার জামাতার যে প্রচেষ্টা, তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়া।

অন্য দিকে, তিনি যদি শুধু ইসরাইলের দখলে থাকা পশ্চিম জেরুসালেমকে রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন তাতে ইসরালিরা ক্ষুব্ধ হবে এবং এতে তাদের খুব একটা লাভও হবে না। ট্রাম্প কী করবেন- যারা ইতোমধ্যে তার ওপর সন্তুষ্ট তাদের আরো খুশি করবেন!

দূতাবাস স্থানান্তর কিংবা শুধু রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি- জেরুসালেম নিয়ে ট্রাম্পের যেকোনো পদক্ষেপে বাড়বে সঙ্ঘাত। জেরুসালেম শুধু একটি ফিলিস্তিনি ইস্যু নয়, আরব ও পুরো মুসলিম বিশ্ব বিষয়টির সাথে জড়িত। এ ছাড়া খ্রিষ্টান ধর্ম ও বিশ্বের যেকোনো ধর্মের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের প্রতীক। ট্রাম্প জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নিলেও অন্য কোনো দেশ তাকে অনুসরণ করবে না। তার সবচেয়ে শক্তিশালী পশ্চিমা মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে তারা এ রকম একতরফা সিদ্ধান্ত সমর্থন করবে না।

আরব লিগ ও মুসলিম দেশগুলোর জোটও এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান হুমকি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তার দেশ ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি জনগণ, এমনকি অনেক বিশিষ্ট ইসরাইলি নাগরিকও জেরুসালেমের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে একক সিদ্ধান্ত না নিতে ট্রাম্পকে হুঁশিয়ার করেছেন। কাজেই সারা বিশ্বই একমত যে, জেরুসালেম কখনোই প্রেসিডেন্টের খেয়ালখুশি হতে পারে না।

বিকল্প পন্থা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তরের অঙ্গীকার পূরণ করতেই চান সে জন্য একটি সহজ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই রাষ্ট্র সমাধান গ্রহণ করা। তারপর পশ্চিম জেরুসালেমকে ইসরাইলের ও পূর্ব জেরুসালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন। এ রকম একটি ঘোষণা ট্রাম্পের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ ও একই সাথে স্থায়ী শান্তিপ্রক্রিয়ার জন্য তার দূতদের প্রতিও সমর্থন হতে পারে। এর বাইরে কোনো কিছুই সময়োপযোগী ও ন্যায়সঙ্গত নয়। দুর্ভাগ্যবশত ট্রাম্প সব সময়ই শান্তির ওপরে যুদ্ধ এবং ন্যায়বিচারের ওপরে আগ্রাসন ও অবিচারকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

লেখক : খ্যাতিমান ফিলিস্তিনি সাংবাদিক
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : আহমেদ বায়েজীদ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.