ভুল স্বীকার করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়েছে ২৬ ব্যাংক

ডলার নিয়ে কারসাজি
আশরাফুল ইসলাম

ডলার কারসাজির দায়ে ২৬ ব্যাংককে শোকজ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের শোকজের জবাব দিতে তিন দিনের সময় দেয়া হয়েছিল। শোকজের জবাবে ভুল স্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়েছে ওই ব্যাংকগুলো। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অপর এক সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্ভাব্য শাস্তি আরোপ নির্ভর করছে ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ আচরণের ওপর। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২৬ ব্যাংকের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সব তদন্ত বিভাগে ব্যাংকগুলোর তালিকা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে ব্যাংকগুলো বড়ধরনের শাস্তি এড়াতে পারবে না বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে স্থিতিশীল থাকা দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার গত মাসের শুরু থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ডলারের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এর বড় কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে কিছু কিছু ব্যাংকের অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত ও কিছু ব্যাংকের বাজার ঘোলাটে করার অপচেষ্টা। অপরিপক্ব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে, কিছু কিছু ব্যাংক তহবিলের সংস্থান না করে ব্যাপক আকারে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) পণ্য আমদানির জন্য আমদানি ঋণপত্র স্থাপন বা এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। আর এলসির দায় নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ শতাংশ। অস্বাভাবিক হারে এলসি খোলা ও এলসির দায় নিষ্পত্তির সময় এসে ব্যাংকগুলো পড়ে বিপাকে।
এ দিকে কিছু ব্যাংক নিজেদের ডলার অফশোর ব্যাংকিং দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে। এর পাশাপাশি রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে সামান্য শ্লথগতি দেখা দেয়। সবমিলে চাহিদার তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে টান পড়ে। এ সুযোগটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করে কিছু অসাধু ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কিছু ব্যাংক ডলারের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার জন্য কারসাজির মাধ্যমে ডলারের দাম বাড়িয়ে দেয়। এভাবেই ৭৯ টাকার ডলার সাড়ে ৮৪ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল হওয়ার শুরুতেই ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রথমে ব্যাংকগুলোকে ডেকে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়। একই সাথে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়। সাথে সাথে বাজারে চাহিদার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করতে থাকে। গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ৮৫ কোটি ডলার সরবরাহ করা হয়। গতকালও তিন কোটি ডলার সরবরাহ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ দিকে বাজার তদারকিতে ব্যাংকগুলোর কারসাজি ধরা পড়েছে। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ডলারের যে দর সরবরাহ করে বাস্তবে তার চেয়ে বেশি দরে ডলার বিক্রির প্রমাণ পায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দল। এরই ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তিন দফায় ২৬টি ব্যাংককে শোকজ করা হয়। এতে তিন দিনের সময় বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো নির্ধারিত সময়েই তাদের জবাব দিয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকই তাদের ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়ার অঙ্গীকার করে। একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার কারসাজির দায়ে অভিযুক্ত ব্যাংকগুলোকে ছাড় দেয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সব তদারকি বিভাগে ব্যাংকগুলোর তালিকা সরবরাহ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ওপর নিগূঢ় তদারকি করতে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে দায় স্বীকার করে অভিযোগ অব্যাহতি চেয়েই পার পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর ওপর বড় আকারে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি হবে না তা নির্ভর করছে ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ আচরণের ওপর। কারণ ব্যাংকগুলো ভুল স্বীকার করে সতর্ক হওয়ার অঙ্গীকার করেছে। আবার ওই একই ভুল করে কি না তা তদারকি করা হচ্ছে। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.