বড় দুই দলের প্রধান সমস্যা কোন্দল

রাজবাড়ী-১ আসন
এম মনিরুজ্জামান রাজবাড়ী

দণি-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বারখ্যাত দেশের অন্যতম প্রধান নৌবন্দরের অবস্থানসহ নানা কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ (গোয়ালন্দ-রাজবাড়ী সদর) আসন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে এ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগাম নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হয়েছে। সেই সাথে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে উপদলীয় কোন্দলও প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।
তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজবাড়ীতে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলতি হচ্ছে। উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। মনোনয়নপ্রত্যাশী এসব নেতার ব্যানার পোস্টারে ছেয়ে গেছে শহর-গ্রাম। সম্ভাব্য প্রার্থীরা সারছেন নানা প্রস্তুতিমূলক কাজ। তবে এখন থেকেই সব কর্মকাণ্ডেই প্রচারণায় ব্যস্ত মনোনয়ন রাজবাড়ীর প্রত্যাশীরা।
২০০১ সালের নির্বাচনে জেলার দুইটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হন। ২০০৯ সালের নির্বাচনে দুই আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোর পাশাপাশি দলীয় কোন্দল মেটাতে ব্যস্ত রয়েছেন।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলই মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা ও সক্রিয় রাখতে নিয়মিত দিকনির্দেশনা, সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি, মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের শুভেচ্ছা ফেস্টুন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিসংবলিত পোস্টার আকারে পোস্টÑ এসব তৎপরতায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বড় দুই দল ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের তৎপরতা এখনো চোখে পড়েনি।
প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঝে মধ্যেই ছুটছেন ঢাকায়। কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে দেখা করতে। যাতে মনোনয়ন পেতে অসুবিধা না হয়। দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়-ঝাঁপে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। মনোনয়ন লাভের আশায় জেলার দুইটি আসনেই আওয়ামী লীগের পাঁচ-ছয়জন প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী বাদে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্যান্য দল প্রকাশ্যেই তৎপরতা চালাচ্ছে। আর জামায়াতের মিত্র দল বিএনপির সাথে আসন ভাগাভাগি না হলে জামায়াত স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে পারে বলেও প্রচার রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি গণসংযোগ করছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।
বর্তমান সংসদ সদস্যরা ছাড়াও আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের পাশাপাশি হাইব্রিড লোকজনও মাঠে বেশ জোরেসোরে প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ করছেন। তাদের প্রচারণার মূল কথা হচ্ছে নেত্রী আমাকে মাঠে কাজ করতে বলেছেন। আশা করছি, আমি মনোনয়ন পাব। তাই আমি আপনাদের কাছে এসেছি এলাকার উন্নয়ন এবং আপনাদের সেবা যাতে করতে পারি তার জন্য দোয়া চাইতে।
রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দের দুইটি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার দুই লাখ ৫৯ হাজার ৫৪৫ জন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাজী কেরামত আলী এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ২০০৯ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী কেরামত আলী বিজয়ী হন। তার নিকটতম বিএনপি প্রার্থী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। তখন ৯৭ হাজার ৬২৮ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন কাজী কেরামত আলী।
রাজবাড়ী-১ আসন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে গোয়ালন্দের ভোটারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অবস্থান আরো বেশি সুদৃঢ়। বিগত নির্বাচনে গোয়ালন্দের ভোটের সমীকরণেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী জয় নিশ্চিত হওয়ার নজির রয়েছে।
এ আসনে তিনবার সরাসরি ভোটে ও একবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বর্তমান সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী। ইতোমধ্যে প্রার্থিতা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে গৃহদাহ শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপিতে একে অপরের সরাসরি বিরোধিতা করলেও আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আকার-ইঙ্গিতে পরস্পরের বিরোধিতা করে আসছেন। সময় গড়ানোর সাথে সাথে দিন দিন তা অনেকটা প্রকাশ্যে চলে আসছে।
নির্বাচনের এখনো এক বছরের বেশি সময় বাকি থাকলেও চুলচেরা বিশ্লেষণে ভোটাররা মনে করেন, দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে বড় দলের ভেতর একাধিক মনোয়নপ্রত্যাশী থাকবে এমনটাই স্বাভাবিক। তবে অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন করে দলীয় হাইকমান্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে আসলে কে হচ্ছেন রাজবাড়ী-১ আসনে নৌকার মাঝি আর ধানের শীর্ষের মালিক।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও রাজবাড়ী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম এ খালেক এবং আরেক সহসভাপতি সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসলাম মিয়া তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজবাড়ী-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন, বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী কেরামত আলী, তার ছোট ভাই জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলী, সংরতি মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুন্নাহার চৌধুরী লাভলী, রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র মহাম্মদ আলী চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাবেক জেলা পরিষদের প্রশাসক আকবর আলী মর্জি ও গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র শেখ মো: নিজামের নাম শোনা যাচ্ছে।
রাজবাড়ী-১ আসনের ভোটাররা মনে করেন বিএনপি নমিনেশন নিয়ে ঝামেলা ও দ্বন্দ্ব মিটিয়ে একক ও যোগ্য প্রার্থীকে দলীয় হাইকমান্ড মনোনয়ন দিলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনটি নিশ্চিতভাবে ধানের শীষ প্রার্থী বিপুল বিজয়ী হবে। বিএনপির তৃর্ণমূল কর্মীসহ জাতীয়তাবাদী ভোটারদের প্রত্যাশা বিএনপির হাইকমান্ড রাজবাড়ীর দুইটি আসনেই একক প্রার্থী দিলে ২০০১ সালের মতো এবারো এ দুইটি আসনই বিএনপি পাবে। তবে উপদলীয় কোন্দলে বিএনপি গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে জর্জড়িত।
এ আসনে এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম এ খালেক, সেক্রেটারি হারুনুর রশিদ ও সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আসলাম মিয়া। আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, অ্যাডভোকেট আসলাম মিয়া ও অ্যাডভোকেট এম এ খালেক দলীয় মনোয়ন পেতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে পৃথকভাবে শোডাউন ও মিছিল-মিটিং করছেন তারা।
পরপর তিনবারের নির্বাচিত রাজবাড়ী পৌরসভার চেয়ারম্যান আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে এ আসনে জয়লাভ করেন। পরে ২০০৮ সালে প্রতিকূল পরিবেশের নির্বাচনে খৈয়াম এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। তিনি এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের আশাবাদী হয়ে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা আসনটি আবার ফিরে পেতে বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ করে চলছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, দেশ নেত্রীর আশীবার্দে ও তারুণ্যের প্রতীক তারেক জিয়ার ভালোবাসায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে আমি রাজবাড়ী-১ আসন থেকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো। কারণ রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দের মানুষের সাথে আমার নাড়ির টান রয়েছে। এখানকার মানুষ আমার আত্মার আত্মীয়। তাদের জীবনমান উন্নয়নই আমার প্রধান রাজনীতি। তিনবার রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র ও একবার এমপি থাকা সময়ে আমি এ দুইটি উপজেলায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। লোকে এখনো আমাকে আধুনিক রাজবাড়ী শহরের রূপকার বলে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি দেশের সর্ববৃহৎ বড় দল। ভোটের অধিকার রক্ষায় দেশনেত্রীর নির্দেশনায় আমরা সংগ্রাম করছি। নির্বাচন এলে সবাই একক প্রার্থী নিয়ে বিজয়ী করার কাজে নামবে।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম এ খালেক এবার রাজবাড়ী-১ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য কেন্দ্রে জোর লবিং ও তৃর্ণমূল পর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আসন্ন নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসনে প্রার্থী বদল দরকার। এখানকার তৃর্ণমূল থেকে জেলাপর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাই চায় এ আসনে প্রার্থী বদল হয়ে প্রকৃত ও আসল জাতীয়তাবাদীর ধারক বাহক ও জনপ্রিয় একজন প্রার্থী হলেই আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থীকে হারানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে অ্যাডভোকেট এম এ খালেক এ দলের জন্মলগ্ন থেকে জেলাপর্যায়ের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি ১৯৯২ ও ’৯৬ সালে দলীয় নমিনেশন পেয়েও কিছু নেতার চক্রান্ত ও কন্সপিরেসির কারণে সামান্য ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। পরে ২০১৪ সালে অ্যাডভোকেট এম এ খালেক দলীয় নমিনেশন নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর থেকে এমএ খালেক এ আসন থেকে ধানের শীর্ষের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার জন্য দলীয় হাইকমান্ডের আশ্বাস পেয়ে রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় কেন্দ্রঘোষিত সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর তৃর্ণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে সংগঠিত করেছেন।
সম্প্রতি এম এ খালেক সাংবাদিকদের বলেন, আমি জাতীয়তাবাদী দলের জন্মলগ্ন থেকে এ দল করি।
আমার রাজনীতির শুরুই বিএনপি থেকে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সুখ-দুখের সাথী হিসেবে আমি তাদের পাশে থাকি। আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের নামে দায়ের হওয়া মামলায় আমি বিনা পয়সায় লড়ি।
আমি জেলা বিএনপির দুইবার সেক্রেটারি ছিলাম। গত তিন টার্ম ধরে জেলা বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। দীর্ঘ এ সময়ে জেলার সব নেতাকর্মীর সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক হয়ে গেছে। তাই দেশনেত্রীর আশীর্বাদে আমি এবার এ আসন থেকে ধানের শীষে নির্বাচন করে বিপুল ভোটের বিজয়ী হয়ে রাজবাড়ী-১ আসন পুনরুদ্বার করে দেশনেত্রীকে উপহার দিতে চাই।
জেলা বিএনপির আরেক সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মো: আসলাম মিয়া বলেন, সে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে জেলা বিএনপির সহসভাপতি রয়েছি। আমার রাজনীতি শুরুই বিএনপির মধ্য দিয়ে। তিনিও মনে করেন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বদল প্রয়োজন। তিনি জানান, হাইকোর্টে জাতীয়তাবাদী আনইজীবী সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছি। হাইকোর্টে ও সুপ্রিম কোর্টে দেশনেত্রীসহ সব নেতার মামলায় সমন্বয় করছি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে। দলীয় হাইকমান্ড আমাকে রাজবাড়ী-১ আসন থেকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার আশ্বাসে আমি দশ বছর ধরে কেন্দ্রঘোষিত সব কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে কর্মীদের সংগঠিত করেছি। আশা করি, বিএনপির হাইকমান্ড আমাকে এখানে নমিনেশন দিলে রাজবাড়ী-১ আসনটি আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে পুনরুদ্ধার হবে।
সাবেক গণপরিষদ সদস্য ও গোয়ালন্দ মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী হেদায়েত হোসেনের জৈষ্ঠপুত্র বর্তমান সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী রাজবাড়ী-১ আসন থেকে ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ চারবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বিগত চার মেয়াদে তিনি রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দ উপজেলায় দৃশ্যমান ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন। রাজবাড়ীর মানুষের কাছে তিনি নিরীহ ও সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত। দল সংগঠিত করতে ও তৃর্ণমূল কর্মীদের সব কথাই তিনি মন দিয়ে শোনেন। কাজী কেরামত আলী একজন কণ্ঠশিল্পী। দলীয় সভাসহ যেকোনো সভায়ই অনুরোধ পেলেই তিনি গান গেয়ে শোনান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আশা করি জননেত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাকে দলীয় নমিনেশন দিয়ে রাজবাড়ী-১ আসনটি ধরে রাখতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।
রাজনৈতিক এ পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান শিল্পপতি কাজী ইরাদত আলীও একাদশ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের জন্য দলীয় নমিনেশন প্রতাশী। তিনি রাজবাড়ী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের বিপদে ও আপদে কাজী ইরাদত আলী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ১৯৭৫ সাল থেকে রাজবাড়ী কলেজে ছাত্রলীগের সাথে জড়িত হয়ে ছাত্রলীগ সংগঠিত করেন। তখন থেকে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
এরপর ১৯৭৯ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। গত ২০১৫ সালে রাজবাড়ী পৌর নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা চালালেও শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে যান। কিন্তু তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় নমিনেশন পেতে কেন্দ্রে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। গত জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে কাজী ইরাদত আলী যুগ্ম সাধারণ নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি রাজবাড়ী-১ আসনের মনোনয়ন পেতে বলিষ্ঠভাবে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন।
রাজবাড়ী-১ আসনের ১৯৯১ সালের নির্বাচিত এমপি ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরীর ভাতিজি এবং সংরতি মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ও সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সদস্য জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী কামরুন্নাহার চৌধুরী লাভলী একটি সমৃদ্ধ রাজনৈতিক পরিবারে সদস্য। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে এ পরিবারের ত্যাগ ও ঐতিহ্য রয়েছে। গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ী সদর উপজেলায় স্বচ্ছ ও তৃর্ণমূল নেতাকর্মীদের সাথে সদ্ভাব ও তাদের সুখ-দুঃখে এ সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি সর্বক্ষণ যোগাযোগ রক্ষা করেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ছোটবেলা থেকে তার চাচার পাশে থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে কাজ করেছেন। তার দক্ষতা ও কিন ইমেজ রাজনীতির কারণে জননেত্রী তাকে ডেকে সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩৮ এর এমপি মনোনীত করেছেন। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসনে তিনি সরাসরি ভোটে অংশ নেয়ার জন্য দলী নমিনেশন চাইবেন। দলীয় হাইকমান্ড ও জননেত্রী চাইলে এবার তিনিই নৌকা প্রতীক পাইবেন। এ দিকে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও কামরুন নাহারের স্বামী মহাম্মদ আলী চৌধুরী রাজবাড়ী পৌরসভার দুইবারের নির্বাচিত মেয়র। তারা দুইজনই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন। যে দলীয় মনোনয়ন পাবেন তিনিই নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ েেত্র তারা পারিবারিকভাবেই নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে মেয়র মহম্মদ আলী চৌধুরী জানান, পারিবারিকভাবেই ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের মাধ্যমে আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত হই। তার চাচা বীর মুক্তিযোদ্বা রাজবাড়ী-১ আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরীর সাহচর্যে রাজনীতির দীক্ষা নিয়ে মানুষের বিপদে আপদে সাহায্য ও সমাজের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করছি। তিনি জানান, কোনো উপদলীয় কোন্দলের রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী নন। ঐক্যবদ্বভাবে হীন দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে তিনি বিশ্বাসী। দুই মেয়াদে মেয়র থাকায় রাজবাড়ীর ব্যাপক উন্নয়ন তিনি করেছেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসনে তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশী। জননেত্রী তাকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করলে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে শোনা যাচ্ছে, ১৮ বছর গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র শেখ মো: নিজামের নাম। তিনি তার শিল্পপতি বাবার গ্রহণযোগ্যতা ও শিক্ষিত সদালোপী ইমেজ কাজে লাগিয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সে গোয়ালন্দ পৌরসভার প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগ ঘরানার মানুষ হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়ে বিপুল কর্মী ও সমর্থক নিয়ে ২০১৫ সালের জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
এরপর থেকে তিনি তার আর্থিক সামর্থ্য ও আচরণের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রা করে চলেছেন। সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছেন না। গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ী সদরের সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের তৃর্ণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য অনুরোধ করছে। দলীয় হাইকমান্ড তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচন করতে তার প্রস্তুতি আছে বলে তিনি জানান। তবে দলের যেকোনো সিদ্ধান্ত সফল করতে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাবেন।
মেয়র নিজাম জানান, গত ১৯৯১ সাল থেকে দশম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সব নির্বাচনে গোয়ালন্দের ভোটের ব্যালান্সেই রাজবাড়ী-১ আসনের জয়-পরাজয় নিশ্চিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছে। কিন্তু গোয়ালন্দ থেকে এ পর্যন্ত প্রার্থী এমপি হয়নি।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী মর্জি। তিনি দলীয় অনুকম্পা পেয়ে পাঁচ বছর রাজবাড়ী জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এরপর থেকে তিনি সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এস এম নওয়াব আলী বলেন, ১৯৭৫ সালে এবং ১৯৮৮ সালে রাজনীতির কারণেই তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। তিনি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগে তিনবার সভাপতি ও তিনবার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অথচ তিনিসহ বেশির ভাগ প্রকৃত নেতাকর্মী অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন। তিনি সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, কিন ইমেজ নিয়ে রাজনীতি করছি। এ পুঁজিতে আশা করি রাজবাড়ী-১ আসন ধরে রাখতে জননেত্রী আমাকে মনোনয়ন দেবেন।
আওয়ামী লীগের সাথে জোটগতভাবে একাদশ সংসদ নির্বাচন না হলে রাজবাড়ী-১ আসনে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাবীবুর রহমান বাচ্চু দলীয় নমিনেশন পাচ্ছেন বলে সাংবাদিকদের জানান। এর আগে গত ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জাপার নমিনেশন পেয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রের নির্দেশে পরে তা প্রত্যাহার করে আওয়ামী জোটের স্বার্থে।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এরশাদ আলাদাভাবে ৩০০ আসনে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাতে রাজবাড়ী-১ আসন থেকে জাপার জেলা সভাপতি হাবীবুর রহমানকে মাঠে নির্বাচনী কাজ করার গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছেন। আর সে মতে হাবীবুর রহমান বাচ্চু রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় জাতীয় পার্টিকে চাঙ্গা করার কাজ পুরোদমে শুরু করেছেন বলে জানান। হাবীবুর রহমান বাচ্চু জানান, জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে তিনি এ পার্টিতে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি গত দুই মেয়াদে জেলা জাপার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে জেলা জাপার দুইবার জেলা সেক্রেটারি ও জেলা যুবসংহতির দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সভাপতি ছিলেন। এ জেলায় জাতীয় পার্টির সর্বময় কর্মকাণ্ড হাবীবুর রহমানের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত হয়ে থাকে।
অপর দিকে জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি আক্তারুজ্জামান হাসান একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে জাপার মনোনয়প্রত্যাশী। তিনি জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে এ দলের সাথে জড়িত রয়েছেন। তিনি জেলা স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতি ছিলেন দীর্ঘ দিন। বর্তমানে আক্তারুজ্জামান জেলা জাপার সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি রাজবাড়ী জেলা ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও দীর্ঘ কয়েক বছর জেলা পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি ছিলেন।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.