ঋণ

মো: মাঈন উদ্দিন

আজ সকাল বেলা মনটা খুব খারাপ হয়ে উঠল। আমার তিন বছর বয়সী ছেলে রাকিব অনবরত কাঁদছে আর বলছে, ‘আম্মু কোথায়? আমি আম্মুর কাছে যাব।’ অপায় না দেখে রাকিবকে তার মায়ের কবরের পাশে নিয়ে এলাম। বললাম, ‘এখানে তোমার আম্মু ঘুমিয়ে আছে’। ছেলের কাঁন্না জড়িত উত্তর ‘না, এখানে আম্মু নেই। আম্মু কোথায়? আম্মু এনে দাও।’ ছেলের এমন কাঁন্না দেখে আমার চোখ ছলছল করছে। পনের দিন হলো মিথিলা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এই পনের দিনে হয়তো সে এমন পথ পাড়ি দিয়েছে যেখান থেকে আর কোনো দিন ফিরে আসা সম্ভব নয়। মিথিলা আমার বড় মামার একমাত্র মেয়ে। খুব আদরের ছিল। খুব ছোট বেলা থেকে মিথিলা আর আমার যথেষ্ট মিল ছিল কথা, কাজে ও বিশ্বাসে। সময়ের আবর্তনে কখন যে আমাদের মধ্যে ভালোবাসার অঙ্কুরোদগম হলো বুঝতে পারিনি। এসএসসি পাসের পর ঢাকায় একটা কোম্পানিতে চাকরি নিলাম। মিথিলা মাস্টার্স পাস করলেও আমার পাঠ চুকাতে হয়েছে এসএসসি পাসের পরপরই। এই একটি মাত্র ব্যবধানের কারণে মামা-মামী কেহই আমাদের সম্পর্ককে মেনে নিতে রাজি হয়নি। কিন্তু মিথিলা অনড়। বিয়ে করতে হলে সে আমাকেই করবে। এমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দেখে সেদিন চোখে পানি এসেছিল। একরকম নিরূপায় হয়েই একদিন আমরা বাড়ি হতে পালিয়ে যাই। সবার অলক্ষ্যে অজানা উদ্দেশ্যে। আমরা বিয়ে করে ফেলি। মিথিলাকে সেদিন আমি বলেছিলাম, ‘মিথি, তুমি উচ্চ-শিক্ষিত মেয়ে, সবাইকে ছেড়ে আমার হাত ধরে চলে এলে। আমি তোমাকে দুঃখ ছাড়া কি-ই বা দিতে পারব?’ মিথি আমার কোলে মাথা রেখে বলেছিল, ‘এই যে তোমার কোলে মাথা রাখলাম। এভাবে তোমার কোলে মাথা রেখে যদি মরতে পারি তাহলে এটাই হবে আমার বড় পাওয়া। মিথিলার এ আশা আমি পূরণ করতে পারিনি। আমি মিথিলার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম। যেদিন মিথিলা আমাদের ছেড়ে চলে যায় সেদিন সকাল বেলা হঠাৎ মিথিলা আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘রতন আমার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।’ তখন আমার মনপাখিটা ডানা ঝাপটাতে লাগল অবিরাম। আমার ইচ্ছে করছিল আমি যদি সুপারম্যান হতাম তাহলে এক মিনিটে ঢাকা হতে বাড়ি ফিরে আসতাম। কিন্তু প্রকৃতির কাছে আমি অসহায়। ঢাকা শহরের পাষাণ জ্যাম আমাকে অনেকক্ষণ আটকে রেখেছিল। অবশেষে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন কোনো এক অজানা অভিমানে মিথিলা আমার সাথে কথা বলেনি। একটি কথাও না। তার নিথর দেহটা শুধু কাঁধে নেয়ার সুযোগ পেলাম মাত্র।
প্রিয়জন-১৬৩৮ ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.