অনাগত

আল ফাতাহ মামুন

বিখ্যাত গাইনিবিশেষজ্ঞ ডা: রোকেয়া খানমের চেম্বারে বসে আছে নাদিয়া। এইমাত্র রোকেয়া খানম হাসি হাসি চেহারায় যে সংবাদটি দিলেন, তা শুনে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে নাদিয়ার। গলা ফাটিয়ে না হলেও মুখবুজে কাঁদতে পারলে ভালো লাগত।
রোকেয়া খানম একটু ভড়কে যায়।
নাদিয়ার মুখ দেখে বোঝা যায় না সে খুশি হয়েছে নাকি কষ্ট পেয়েছে।
নাদিয়া বলল, ‘আপু! আমি একটু ওয়াশরুমে যাব।’
‘শিউর। ওই দিকে’Ñ বলেই ডান হাতের তর্জনি আঙুল দিয়ে ওয়াশরুম দেখিয়ে দিলেন রোকেয়া খানম।
রোকেয়া খানমের চেহারা দেখে বয়স বলা মুশকিল। বোধহয় ডাক্তার হওয়ার কারণেই রূপ ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে অতি সচেতন তিনি। প্রথম দেখাতে মনে হবে আঠাশ-ঊনত্রিশ বছরের আবেদনময়ী রমণী। আরো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে অভিজ্ঞরা বত্রিশ বলেই বাজি ধরবেন। আসলে ওনার বয়স পঁয়তাল্লিশ ছুঁই ছুঁই।
পনের বছর হলো ডাক্তারি করছেন। এই দীর্ঘ পেশাজীবনে যে বিষয়টি তাকে পরমাশ্চর্য করেছে তা ভাবলে আমিও আশ্চর্য না হয়ে পারি না।
‘আপনি মা হতে চলেছেন’ চার শব্দের এই ছোট্টবাক্যটি নিয়েই রোকেয়া খানমের রহস্যময় জগৎ। কেউ কেউ আছে, এই বাক্যটি শোনামাত্রই আনন্দে আটখানা হয়ে যায়। রোকেয়া খানমকে জড়িয়ে ধরে। হাতে চুমু খায়। পায়ে ধরে সালাম করে। আবার কেউ আছে, এটি শোনামাত্রই আতঙ্কিত চেহারা আরো ভয়ানক হয়ে যায়। নাদিয়ার মতো গলা ফাটিয়ে কাঁদতে চায়। কাঁদাতে না পেরে ওয়াশরুম খোঁজে। আবার এমন দম্পতিও আছে, যারা শুধু চার শব্দের এই বাক্যটি শোনার জন্যই বছরের পর বছর রোকেয়া খানমের চেম্বারে আসা-যাওয়া করে। লাখ লাখ টাকা ঢেলে দেয় রোকেয়া খানমের কথায়।
নিষ্ঠুর প্রকৃতি তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না।
২.
চেম্বার থেকে সোজা বাসায় চলে আসে নাদিয়া। বারবার মেদহীন পেটে হাত চলে যাচ্ছে তার। ভয় এবং আনন্দ যে মানুষ একসাথে উপভোগ করতে পারে আজই প্রথম বুঝতে পারল নাদিয়া। সে মা হতে যাচ্ছে। নারী জীবনে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই। আবার এ সন্তানই সমাজের চোখে চরম ঘৃণিত; এর চেয়ে বড় লজ্জারও কিছু নেই দুর্ভাগা নারীর জীবনে।
সৃষ্টিকর্তা কেন নারীদের এত অসহায় করে সৃষ্টি করেছেন? এক মুহূর্তের ভুলের জন্য জীবনভর তাদের কাঁদতে হয়। অথচ, যে পুরুষ এ ভুলের রসদ জোগায়, প্রত্যক্ষ সঙ্গী হয়ে নিখুঁতভাবে ভুল করতে সাহায্য করে, তার জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করেননি তিনি। সৃষ্টির এই খাপছাড়া নিয়ম দেখে নিজের মনেই হেসে ওঠে নাদিয়া। এ হাসি কষ্টেরও না, আনন্দেরও না। অব্যক্ত যন্ত্রণার।
নাদিয়ার গল্প শুনে অনেকেই আমার কাছে জানতে চায়, ‘এরকম হলো কিভাবে’?
আমি জবাব না দিয়ে ভ্রƒ কুঁচকে প্রশ্নকর্তার দিকে তাকাই। ‘হলো কিভাবে মানে? শিশু হয় কিভাবে তুমি বুঝ না? সেইভাবে হয়েছে।’ এই কথাগুলো বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বলি না। মানে বলতে পারি না।
প্রশ্নকর্তা আবার জিজ্ঞেস করে, ‘ওই ছেলে এখন কোথায়? নাদিয়া তার কাছে গেলেই তো হয়।’
এখানে এসে আমি কিছু বলতে পারি না। কারণ, নাদিয়া আমার গল্পের নায়িকা ঠিক। কিন্তু সে কিভাবে আজকের পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িছে তা আমি জানি না। আমি তো তাকে আবিষ্কার করেছি রোকেয়া খানমের চেম্বারে। যখন সে অলরেডি কনসেপ্টেড।
অবশ্য এটা বুঝতে কষ্ট হয়নি, এই গর্ভধারণ স্বাভাবিক নয়। আমার মতো কোনো পুরুষই নারী জীবনের পরম আনন্দটিকে চরম বিষাদে পরিণত করেছে। তাই নাদিয়ার কাছে আমিও খানিকটা লজ্জিত।
৩.
জামা পাল্টানোর সময়, গোসলের সময় এবং শোয়ার সময়ও আনমনে পেটে হাত বুলাতে থাকে নাদিয়া। কখনো কখনো এমন পাগলামি করে যা সত্যিই বলার মতো নয়। জামাকাপড় সব খুলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পেটের দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকে। পেটে হাত বুলায় আর বিড়বিড় করে কী যেন সব বলে যায়। বোধহয় তার অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলে। অথবা অভিশাপের বুলি আওয়ার সেই নিরপরাধ পুরুষ জাতির ওপর!

দিন যাচ্ছে। নাদিয়াও সন্তানের অস্তিত্ব টের পেতে শুরু করেছে। এখনো কাউকে কিছু বলেনি। বলবেই বা কিভাবে। এসব কী কাউকে বলা যায়?
প্রচণ্ড মানসিক টেনশনের মধ্যেও দৃঢ় থাকার অসম্ভব ক্ষমতা আছে নাদিয়ার। কিন্তু এবার আর কেন জানি নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না। সময় যত ঘনিয়ে আসছে মনের দিক থেকেও তত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
প্রতিরাতে ভাবে সকালেই এবরশন করিয়ে ফেলবে। কিন্তু সকালে কাপড় পরার সময় নজর চলে যায় পেটের দিকে। হাত দিয়ে আলত করে ছুঁয়ে দেয় নিজের পেট। ব্যাস! ওই দিন আর এবরশনের কথা ভাবতে পারে না। জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে থাকে। নয়তো টিভি ছেড়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। অঘোরে ঘুমিয়ে ওঠার পরও প্রচণ্ড তন্দ্রায় বুঝে আসে নাদিয়ার চোখ।
এ সময় সব মেয়ের মধ্যে কিছু কমন ব্যাপার ঘটে। প্রায়ই তারা স্বপ্ন দেখে ফুটফুটে সন্তান জন্ম দিয়েছে। চার দিকে আনন্দের জোয়ার বইছে। মেয়েটি প্রথমেই যাকে খুঁজে সে হলো সন্তানের বাবা। সবাইকে দেখছে কিন্তু সন্তানের বাবাকে দেখা যাচ্ছে না। আনন্দের মধ্যেও নিরানন্দ মন নিয়ে ঘুম ভাঙে সন্তানসম্ভবা নারীর। আবার অনেক সময় স্বপ্ন দেখে, সন্তান হয়েছে; কিন্তু মৃত। তখন ঘুমের মধ্যেই গুনগুনিয়ে কাঁদতে থাকে ভবিতব্য মা।
এ ধরনের কোনো স্বপ্ন এখনো নাদিয়া দেখেনি।
৪.
প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেল। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না নাদিয়া। কী করবে সে? সন্তানটিকে রাখবে না ফেলে দেবে? মাস দেড়েক হলো বাইরেও যাচ্ছে না। ভার্সিটি যায়নি দুই মাস হলো। কারো সাথে পরামর্শ করতে পারলে ভালো হতো।
মা থাকলে মাকেই সব বলা যেত। আফসোস! মা নেই। বাবা ব্যস্ত বিজনেস নিয়ে। মেয়েকে নিয়ে ভাবার সময় হয় না তার। মেয়ে যে বড় হয়েছে, মাস্টার্সে পড়ছে- এসব তিনি জানেন বলেও মনে হয় না। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো নাদিয়ার। এখন সব মানিয়ে নিয়েছে।
গত রাতে অদ্ভূতরকম স্বপ্ন দেখে নাদিয়া। ফুটফুটে একটি শিশু শুয়ে আছে তার পাশে। হাত-পা নেড়ে খেলা করছে। তার মা হাসি হাসি মুখে বলছে, ‘নাদিয়া মা! দেখ! তোর বাবুটা কত সুন্দর হয়েছে।’
নাদিয়া মুচকি হেসে শিশুর গালে চুমু খায়।
কোমল হাতে শিশুটিও নাদিয়ার গাল স্পর্শ করে দেয়।
ঘুম ভাঙার অনেকক্ষণ পরও মনে হয়েছে শিশুটি নাদিয়ার গাল ছুঁয়ে আছে। হু হু করে ওঠে নাদিয়ার মাতৃহৃদয়। আজ রোকেয়া খানমের চেম্বারে যাওয়ার কথা। এবরশন করাবে।
প্রচণ্ড ঘুমে নাদিয়ার চোখ বুঝে আসে। কিন্তু সে আর ঘুমাতে পারে না। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায়, একটি শিশু তার গাল ছুঁয়ে আছে। হাত নাড়িয়ে খেলা করছে।
৫.
রোকেয়া খানম সব শুনে বলল, ‘তুমি আরো আগে আসোনি কেন? এখন তো বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে তোমার।’
নাদিয়া কিছু বলে না। শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এবরশনের প্রস্তুতি চলছে। একটু পর অপারেশন শুরু হবে।
নাদিয়া শুয়ে আছে। রোকেয়া খানম বলেছে, ‘তুমি বিশ্রাম করো। সময় হলে নার্স এসে নিয়ে যাবে।’
নাদিয়া প্রাণপণ চেষ্টা করছে যাতে সে ঘুমিয়ে না পড়ে। ঘুমিয়ে পড়লে আজ এবরশন করাতে পারবে না। তবুও সে ঘুমিয়ে যায়। একপ্রকার অনিচ্ছায়-ই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে নাদিয়া স্বপ্ন দেখে তার গাল স্পর্শ করা শিশুটির হাত বেয়ে গল গল করে রক্ত ঝরছে। মাথা, পেট, পিঠ- পুরো শরীর রক্তে লাল হয়ে গেছে। নাদিয়া তাকে কোলে নিতে যাবে এমন সময় শিশুটি বলল, ‘আম্মু! তুমি আমাকে ধরো না।’
‘কেন বাবা?’
‘একটু পর তুমি আমাকে খুন করবে তাই। তুমি এখন খুনি আম্মু!’
নাদিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। বলল, ‘বাবা...
কথাটা শেষ করতে পারল না। রক্তাক্ত শিশুটি বলে ওঠল, ‘মা! কী দোষ করেছি আমি? কেন তুমি আমায় খুন করতে চাও? তুমি কি পারবে না পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করে আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে? কথা দিলাম, আমি সব সময় তোমার গালে আলত করে ছুঁয়ে আদর করে দেবো।’
‘অবশ্যই পারব সোনামণি! অবশ্যই পারব!’
‘তাহলে নাও, আমায় কোলে নাও। আদার করে দাও আম্মু।’
শিশুটির গায়ে এখন কোনো রক্ত নেই। ঠিক আগের মতোই ফুটফুটে চেহারা। মিষ্টি হাসি। নাদিয়া ঝা করে কোলে তুলে নিলো শিশুটিকে। বুকে জড়িয়ে ধরল। পরম তৃপ্তিতে চোখে পানি এসে যায় তার। কোলে মাথা গুঁজেই এক হাতে মায়ের অশ্রু মুছে দেয় অনাগত শিশুটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.