শান্তির আশ্বাস নেই মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায়

ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল
আহমেদ বায়েজীদ

প্রথমবারের মতো জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মাথায় ঘোষিত তার এই নিরাপত্তা কৌশলে রয়েছেÑ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যুতে দেশটির সম্ভাব্য পন্থা কী হবে তার বর্ণনা। ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে যে আশা করা হয়েছিল তার কোনো কিছুরই প্রতিফলন নেই এতে। বিশেষ করে সঙ্ঘাতকবলিত মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে এমন কোনো আশাবাদ নেই নতুন এই কৌশলে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে মার্কিন মিত্রদের সহযোগিতা আর প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার কথাই শুধু বলা হয়েছে। সঙ্কট মোকাবেলার জন্য কোনো কার্যকরী উদ্যোগের পরিকল্পনার কথা নেই ৬৮ পৃষ্ঠার এই দলিলে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি চীন ও রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সামরিক শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধির পরিকল্পনাও নিয়েছেন ট্রাম্প। আর এই দলিলে ২৭ বার জিহাদি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
চারটি মূল বিষয় রয়েছে ট্রাম্পের নতুন নিরাপত্তা কৌশলেÑ দেশের সুরক্ষা, দেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নেয়া, শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে শান্তি স্থাপন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধি। যেহেতু নীতিটি জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক তাই এর মূল বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হবে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতির আলোকে বিবেচনা করলেই বোঝা যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ইস্যুই আর শুধু তাদের নিজস্ব নয়। সারা বিশ্বেই যেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ; তেমনি এই পরাশক্তির যেকোনো অভ্যন্তরীণ ইস্যুর সাথেও জড়িয়ে আছে বিশ্বব্যবস্থার অনেক স্বার্থ। তাই বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল, ট্রাম্প এমন একটি নীতি প্রণয়ন করবেন, যা দিয়ে আশাবাদী হওয়া যাবে। তৃতীয় পয়েন্টে ট্রাম্প শান্তি স্থাপনের কথা বলেছেন। কিন্তু বিশাল এই নিরাপত্তা কৌশলের পাতায় পাতায় এ বিষয়টি নিয়ে যা লেখা হয়েছে তা পড়লে বোঝা যায়, এটি আসলে কতটা বাস্তবসম্মত। এখনো বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বেশি। আরব, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অনেক দিন ধরেই অঞ্চলটি সঙ্ঘাতময়। ট্রাম্প তার নতুন নিরাপত্তা কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার কথা বলেছেন কিন্তু এর পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছেন আক্রমণাত্মক কৌশল। ইরানকে সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক আখ্যা দিয়ে তাদের মোকাবেলায় মিত্রদের সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এমনিতেই এক বছর ধরে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী বক্তব্যে অঞ্চলটিতে নতুন করে উত্তেজনা বিরাজ করতে শুরু করেছে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যে ইরানকে মোকাবেলায় বেপরোয়া আচরণ করছেন, তার পেছনেও ট্রাম্পের সমর্থন বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন অনেকে। অথচ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তির পর অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা আসবে বলেই ধরে নেয়া হয়েছিল।
ইরান এ অঞ্চলে আধিপত্য জোরদার করছে এটি মিথ্যা নয়। দেশটির পৃষ্ঠপোষকতায় ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, লেবাননের মিলিশিয়া গ্রুপ হিজবুল্লাহ কিংবা সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের প্রভাব বেড়েছে। ইরান আর উগ্রপন্থীদের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে ইসরাইলকে বাঁচানোর প্রবণতা রয়েছে ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশলে। সেখানে স্পষ্টই বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে আঞ্চলিক সঙ্কটের জন্য ইসরাইল দায়ী নয়। অথচ দশকের পর দশক ধরেই ফিলিস্তিনিদের রক্ত মাড়িয়ে সীমানা বেড়েছে ইসরাইল রাষ্ট্রের। ট্রাম্প যে দিন নতুন নিরাপত্তা নীতি ঘোষণা করেন তার আগের সপ্তাহেও ইসরাইলের গুলিতে নিহত হয়েছে ৯ ফিলিস্তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আরব রাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করছেÑ এ বিষয়টিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে যে, আরব ইসরাইল দহরম-মহরম বৃদ্ধিতে ভবিষ্যতেও পৃষ্ঠপোষকতা করবে ট্রাম্প প্রশাসন। সিরিয়া ইস্যুতে উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেয়ার শর্তে রাজনৈতিক সমাধানের আশাবাদী তারা। বাশার সরকারের পতন ঘটানোর যে অঙ্গীকার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেই ব্যর্থতা তারা একরকম স্বীকার করে নিলো এর মাধ্যমে।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ক্ষেত্রেও একই চিন্তা ট্রাম্পের। পাকিস্তানকে সরাসরি আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়ী করে ভারতের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা তার। আবার ভারতকে দিয়ে মোকাবেলা করতে চান চীনের প্রভাব। পাক-ভারত দ্বন্দ্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সারা বিশ্বের। দু’টি পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে চায় সবাই। ট্রাম্পও এই দু’টি দেশের বৈরিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন; কিন্তু এখানেও তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মতো একই পন্থা অবলম্বন করেছেন। একটি রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসবাদের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং আরেকটি রাষ্ট্রকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কখনো বৈরিতা নিরসন সম্ভব নয়। ট্রাম্পের পরিকল্পনা হচ্ছে ভারতের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও তাদের নেতৃত্বে ভারত মহাসাগর ও সমগ্র অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার। ভারত অনেক দিন ধরেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘ক্রস-বর্ডার’ সন্ত্রাসবাদের যে অভিযোগ করে আসছে ট্রাম্পের নতুন নীতিতেও সেটি মোকাবেলা করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলতে ভারত অনেক বেশি শক্তি পাবে। পাকিস্তান-ভারতের পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষপাতের কারণে। পাকিস্তানের মাটিতে উগ্রপন্থীদের আশ্রয় পাওয়ার অভিযোগ অনেক দিনের। তবে এর সমাধানে ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লিকে নিয়ে একসাথে কাজ করতে পারত ওয়াশিংটন।
বোঝাই যাচ্ছে পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সামনের দিনগুলোতে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিনের আঞ্চলিক মিত্র পাকিস্তনের সাথে সম্পর্ক শীতল করেছে ধীরে ধীরে। এটি হয়তো আরো স্পষ্ট হবে সামনের বছরগুলোতে। আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে চান ট্রাম্প। অন্য দিকে, মাত্র দুই দিন আগেই খবর প্রকাশ হয়েছে, আফগানিস্তানে নিয়োজিত মার্কিন সেনারা আবার সরাসরি যুদ্ধ করবে তালেবান ও আইএসের বিরুদ্ধে। কয়েক মাস আগেও দেশটিতে নতুন করে চার হাজার সেনা পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। কাজেই সহসাই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। উত্তর কোরিয়ার বিষয়েও আগের মতো একই অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। যৌথবাহিনীর আকার কমিয়ে আনার যে সিদ্ধান্ত ইতঃপূর্বে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র তা বাতিল করবেন ট্রাম্প। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বাহিনীগুলোর শক্তিবৃদ্ধি ও কর্মকাণ্ডের পরিধি বৃদ্ধি করবে। অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকায়নও করা হবে। পারমাণবিক অস্ত্র ও এর নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। ট্রাম্প মনে করেন, ¯œায়ুযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর তাদের পারমাণবিক প্রযুক্তির অনেক কিছুই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থাও ৩০ বছরের পুরনো। এই জায়গা থেকে বের হয়ে সামরিক আধুনিকায়ন চান তিনি। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ধরে রাখতেই এটি করা হবে। পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের ব্যর্থতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য হারিয়েছে, উল্লেখ করা হয়েছে নতুন নীতিতে। অর্থনৈতিক ইস্যুতে চীন ও রাশিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বী আখ্যা দিলেও দেশ দু’টির সাথে কৌশলগত সম্পর্ক রাখবে ট্রাম্প প্রশাসন। সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ ও অভিবাসন নীতিতেও কঠোরত আসতে যাচ্ছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.