চেয়ার

আল ফাতাহ মামুন

প্রায় দুই বছর বেকার থাকার পর একটি প্রাইভেট কলেজে বাংলা শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। গত দুটো বছর যে কত কষ্টে কেটেছে তা আমি জানি আর আমার আল্লাহ জানেন। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে শেষ পর্যন্ত রুর থেকেও ধারকর্জ করেছি। কত দিন যে সিগারেটের টাকাটা পর্যন্ত রু দিয়েছে তা বিধাতার খাতায় লেখা আছে, আমার কাছে নেই। মাঝে মধ্যে মনে হতো, আজই বুঝি রু আমায় ‘না’ বলে দেবে। বলবে, ‘এ রিলেশনটা আর এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয় রাতুল!’
সম্ভব না হওয়ারই কথা। একটা বেকার ছেলের সঙ্গে হয়তো প্রেম করা যায়, কিন্তু তার মেস খরচ থেকে শুরু করে সিগারেটের খরচ চালানো কী একটা মধ্যবিত্ত মেয়ের পক্ষে সম্ভব? থাক এসব কথা। দুঃখের মেঘ কেটে গেছে। কলেজ থেকে যা পাবো তা দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পরও ঢের টাকা থেকে যাবে। রুর কাছে হাত পাতার দিন শেষ।
প্রথম দিন কাস শেষে টিচার্স রুমে বসে কাগজ পড়ছি। একটা কণ্ঠ শুনে পড়ায় ছেদ পড়ল।
‘স্যার আসতে পারি?’
চোখ না তুলেই বললাম, ‘জি, আসতে পারেন।’
একমনে কাগজ পড়ার ভান করছি। কে এসেছে না দেখলেও আমি বুঝতে পেরেছি, ও ফার্স্ট ইয়ারের সাদিয়া। আজই পরিচয় হলো। কাসের সব মেয়ের চেয়ে ওকে আলাদা করতে আমার তো নয়ই বোধ করি কোনো মহাপুরুষের পক্ষেও কঠিন হবে না। মায়াবী চোখ, গোল চেহারা, সরু নাক, তার ওপর কথা বলার জাদুকরি ধরনÑ প্রথম দেখাতেই যে কারো মাথা খারাপ করে দেবে। আমার মাথা খারাপ হয়ে হয়েও হয়নি।
‘কী চান?’
‘স্যার! আপনি আমাকে ‘আপনি’ করে বলছেন কেন?’
‘আর বলব না। বলো, কী চাও?’
‘স্যার! আপনাকে আমার অনেক ভালো লেগেছে।’
‘মানে?’
‘ইয়ে মানে... আপনার লেকচার, লেকচার ভালো লেগেছে।’
‘তাই বলো।’
আড়চোখে আপাদমস্তক দেখে নিলাম সাদিয়ার। ফার্স্ট ইয়ারে পড়া মেয়ে মানেই উপচে পড়া যৌবন। উন্নত বক্ষ যুগল দেখে মাথা ঝিম ধরে আসে। অনেক কিছুই ইচ্ছে করে। তবে সব ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দেয়ার কোনো মানে হয় না। সাদিয়া চলে গেছে অনেকক্ষণ হলো। খবরের কাগজে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।
২.
শিক্ষকতার জীবন ভালোই কাটছে। তবে যে বিষয়টি আমার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হলো ‘সাদিয়া’। গেল দুই মাসে সাদিয়ার প্রতি আমি ভয়াবহ রকম মুগ্ধ হয়ে পড়ি। সাদিয়ার চোখের ভাষা আমায় আরো পাগল করে দেয়। তার চোখ দু’টি বারবার বলছে, ‘স্যার! আপনি বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক হয়েও একটি মেয়ের চোখের ভাষা বুঝতে পারছেন নাÑ আপনার তো ফাঁসি হওয়া উচিত।’
আমি সবই বুঝি সাদিয়া। তবে আমার পবিত্র চেয়ার আমাকে অবুঝ করে রাখে। তা ছাড়া আমি যে আরেকজনের কাছে দায়বদ্ধ! রুকে আমি কী জবাব দেবো?
যতই দিন যায় আমার দুর্বলতা বাড়তে থাকে। সাদিয়ার চোখের ভাষা আজকাল শব্দে ও অঙ্গভঙ্গিতে রূপ নিয়েছে। রুর সাথেও ঠিকমতো কথা হয় না এখন। ওকে বলি পড়াশোনা-শিক্ষকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তাই তোমাকে সময় দিতে পারি না। অবুঝ বালিকার মতো সরল মনে বিশ^াস করে রু। বলে, ‘তোমার যখন সময় হবে আমাকে ফোন করো। আমি তোমাকে বিরক্ত করব না সোনা!’
মা বলতেন, ‘সমস্যা জিইয়ে রাখতে নেই। সমস্যা হলো ক্যান্সারের মতো। যত জিইয়ে রাখবি তত বাড়তে থাকবে।’ যা করার কালই করতে হবে। কী করব আমি? সাদিয়াকে ‘হ্যাঁ’ বলে দেব? তাহলে রুর কী হবে? যা হয় হবে। তিন বছর আগে যাকে ভালো লেগেছে, ভালোবেসেছি, আজো কী তাকেই ভালোবাসতে হবে? কোথায় লেখা আছে এমন নিয়ম? লেখা থাকলেও তা আমি মানি না।
৩.
শিক্ষক রুমে বসে সাদিয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। কাস শেষে বলেছিলাম, ‘সাদিয়া! নিচে আমার সঙ্গে দেখা করো। তোমাদের কিছু পেপারস আছে নিয়ে যাবে।’
দশ মিনিট পর সাদিয়া এলো। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাথা খারাপ করা তরুণী সাদিয়া। মনে মনে গুছিয়ে নিলাম কী বলব? নিজেকে শান্ত রাখার জন্য চেয়ারের হাতল চেপে ধরলাম।
‘বসো সাদিয়া’।
‘না, ঠিক আছে স্যার। কী বলবেন বলেন।’
‘যা বলব তা শোনার জন্য তোমাকে বসতে হবে’।
সাদিয়ার চেহরায় এক অন্য রকম আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল। উত্তেজনায় ওর উন্নত বক্ষ দ্রুত ওঠানামা করছে। একমনে তাকিয়ে থাকলে হৃদয়ের তৃষ্ণা কিছুটা হলেও মেটাতে পারতাম। কিন্তু তা করা যাচ্ছে না। সাদিয়ার চোখে ধরা পড়ে যাবো। চোখ বন্ধ করে নিঃশ^াস নিলাম।
সাদিয়া বুঝতে পেরেছে আমি কী বলতে চাই। শান্ত ভঙ্গিতে আমার সোজাসুজি বসল ও। হাত দুটো টেবিলের ওপর রেখে আমার চোখের দিকে এক মনে তাকিয়ে আছে। ওর চোখ দুটো যেন বলছে, স্যার! যাই বলেন না কেন, আমার এই কোমল হাত দু’টি ধরেই বলেন।
কিছু বলতে যাবো এমন সময় আশ্চর্যজনকভাবে চেয়ারসহ নড়ে উঠলাম আমি। এ কী! চেয়ারের হাতলে আটকে গেছে আমার হাত। চার দিক কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে। মাথা ঘুরছে। এখন আর সাদিয়াকে দেখতে পাচ্ছি না। পুরো ঘরে আমি ছাড়া কেউ নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর থেকে আমার চেয়ার কথা বলে উঠল! হ্যাঁ! হ্যাঁ! আমার চেয়ারই। দাঁতে দাঁত খিচে কথা বললে যেমন শোনা যায়, চেয়ারের কণ্ঠ ঠিক তেমন লাগছে।
রাগে গজগজ করে চেয়ার বলল, ‘রাতুল সাহেব! ভুলে গেছেন আপনি কোন চেয়ারে বসে আছেন? আপনি তো এখন আর কাম-ক্রোধের রাতুল নন। আপনি হলেন শিক্ষক রাতুল। রাতুল স্যার। মানুষ গড়ার কারিগর। আজ সেই আপনিই নিজের ছাত্রীর সঙ্গে, ছি: রাতুল সাহেব ছি:।’ সাদিয়ার ডাকে আমার ঘোর ভাঙল। নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই অবাক হলাম।
সারা শরীর দরদর করে ঘামছে। মুহূর্তেই চেয়ারের কথাগুলো স্পষ্ট মনে পড়ল। ঠিকই তো! কত বড় ঘৃণ্য কাজ করতে যাচ্ছিলাম আমি। আমি তো শিক্ষক। মহান শিক্ষক। যিনি মানুষ গড়ার কারিগর। না, না, আমি আমার চেয়ারের অমর্যাদা করতে পারব না। শিক্ষকতার মহান পেশাকে আমি কলঙ্কিত করব না।
নিজেকে শক্ত করে বললাম, ‘সাদিয়া! ওঠো।’
আমার বলার ভঙিটা খুব কর্কশ ছিল না। তবুও সাদিয়া ভয় পেয়েছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তার হাসিমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আগের চেয়ে আরো দৃঢ়ভাবে বললাম, ‘এখন কাসে যাও। কাল আমিই পেপারগুলো নিয়ে যাবো।’
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.