জসীমউদ্দীনের কবর কবিতা নতুন বাতায়ন

আবুল হোসেন আজাদ

তিনি আধুনিক শিক্ষিত সমাজের সাথে সাথে পল্লী পাঠকেরও নয়নমণি। বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে পল্লীর বৃদ্ধের করুণ চিত্র ‘কবর’ কবিতা এক নতুন দিগন্ত তথা বাতায়ন পথ তৈরি করে দেয়, যে পথ দিয়ে খোলা বাতাস হু-হু করে ঢুকে খেলা করে ঘরের চৌহদ্দিতে। যা আজও নদীর ঢেউয়ের মতো প্রবহমান


শৈশবে স্কুলের দিনগুলোয় (১৯৬১-১৯৬৯) স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে আমাদের স্কুলে ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস বেশ সাড়ম্বরে উদযাপন করা হতো। সারা দিনব্যাপী থাকত স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সন্ধ্যার পর থাকত বিচিত্রানুষ্ঠান। বিচিত্রানুষ্ঠানে থাকত কবিতা আবৃত্তি, গান, নৃত্য, কৌতুকসহ সবশেষে নাটক। এই নাটকে আমিও অনেক অভিনয় করেছি। এখনও দু-একটি নাটকের নাম মনে আছে যেমন- কারদোষ, কৃপণের ধন, রক্তধারা, বারোঘণ্টা প্রভৃতি।
বিচিত্রানুষ্ঠানের কবিতা আবৃত্তিতে আমরা দেখতাম একটি কবিতা প্রতি বছরেই বেশ ঘটা করে আবৃত্তি হতো। এক এক বছরে এক একজন ছাত্র। আমাদের স্কুলের পেছনে ছিল একটি বড় কদবেল গাছ। কদবেল গাছের একটি ডাল ভেঙে মঞ্চে স্থাপন করে ডালিম গাছ তৈরি করা হতো। একবার আমাদের স্কুলের আমানুল্লাহ স্যার ওই কবিতাটি আবৃত্তি করে সবাইকে কাঁদিয়েছিলেন। গাঢ় সবুজ পাতার উপরে রাতের হ্যাজাক লাইটের আলো পড়ে চিকচিক করে উঠতো। হ্যাজাক লাইটের শাঁ-শাঁ শব্দে যেন গমগম করত। আর সেই কবিতাটি হলো কবি জসীমউদ্দীনের কবর।

কবিতাটি জসীমউদ্দীনের শিল্পকাব্য সার্থকতায় উৎকৃষ্ট অন্যতম কবিতা। কলকাতার কল্লোল পত্রিকার একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় ছোট করে নিত্যন্ত দায়সারাভাবে কবিতাটি মুদ্রিত হলেও রাতারাতি কবির কদর ও খ্যাতি বেড়ে যায়। শিক্ষিত পাঠক সমাজে রীতিমত আড়োলন সৃষ্টি হয় কবর কবিতা ও কবিকে নিয়ে। তাইতো বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত মহাশয় কবর কবিতার তাৎপর্যপূর্ণ আবির্ভাবের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, একটি কবিতা গেঁয়ো মাঠের সজল শীতল বাতাসে উড়ে আসে কল্লোলে। তিনি কবর কবিতাকে বাংলা কবিতার নতুন বাতায়ন পথ বা দিগদর্শন বলে অভিহিত করে এর অনন্য সৃষ্টি মহিমার অকুণ্ঠ প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ করেছেন। লোকসাহিত্য প্রেমিক ও গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন কবির অনুরোধে কবিতাটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি কবিকে প্রশংসা করে শুধু পত্রই দেননি, তিনি ইংরেজি পত্রিকা ফরোয়ার্ডে ‘এ্যান ইয়ং মোহামেডান পোয়েট’ শিরোনামে একটি ভাবগম্ভীর প্রশংসাধন্য প্রবন্ধ লেখেন। তাতে তিনি কবি জসীমউদ্দীনকে মুসলমান কবিদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের পরেই স্থান নির্দেশ করেন। কবিতাটির তিনি অংশবিশেষ ইংরেজি অনুবাদও করেন।

কবর কবিতাটি রচনার সময় কবি ছিলেন ফরিদপুর কলেজের বিএ ক্লাসের ছাত্র। ড. দীনেশচন্দ্র সেন কবরকে সেই সময়েই প্রবেশিকা পরীক্ষার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। যা কবিকে এনে দিয়েছিল বিরল খ্যাতি যশ ও সম্মান। এ প্রসঙ্গে কবি জসীমউদ্দীন নিজেই বলেছেন তার যাদের দেখেছি গ্রন্থে দীনেশ বাবু ইন্দ্রজালের ভেল্কির মতো তাকে একটি অবস্থা থেকে তুলে ধরেছেন।
প্রকৃতপক্ষে দুস্তর সাহিত্য সাধনার পথে কবি জসীমউদদীন কৈশোরের লালিত স্বপ্ন বুকে আগলে রেখে বড় কবি হওয়ার বাসনায় কলকাতায় উপস্থিত হন। সেখানে প্রথমাবস্থায় দূর-সম্পর্কীয় এক ভগ্নিপতির বাসায় ও পরবর্তীতে এক মেসে থেকে পয়সা রোজগারের জন্য খবরের কাগজে হকারি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। পরবর্তী সময়ে অবশ্য দীনেশচন্দ্র সেন তাকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাম্যগীতি ও গাথার একজন সংগ্রাহক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রুটি রুজির ব্যবস্থা করে দেন। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এ কাজে নিয়োজিত থেকে যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে সাহিত্য চর্চার পথকে সুগম করে তোলেন।

একজন গ্রাম্যবৃদ্ধের স্বজন হারার দুঃসহ বেদনার যে করুণ রসসিক্ত চালচিত্র কবি উসীমউদ্দীন তার ‘কবর’ কবিতায় অঙ্কন করেছেন ছন্দের পরতে পরতে তা অভিনবত্বে সম্পূর্ণ ব্যক্তিক্রমী। সবুজ শ্যামল অবহেলিত পল্লী গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিরহ-বেদনার কথাচিত্র তিনি এক পল্লীবৃদ্ধের জবানিতে তুলে এনেছেন। স্ত্রী-পুত্র স্বজনহারা বৃদ্ধের দুঃসহ বেদনার প্রতি প্রাকৃতিক মূক বেদনাকে মুখর করে তুলেছেন ‘কবর’ কবিতার ছত্রে ছত্রে মর্মস্পর্শীরূপে। এই কবিতায় আমরা দেখতে পাই বলিষ্ঠ শিল্পসম্মত অসামান্য শোকচর্যার অবলম্বন। আমাদের দৈনন্দিন জীবন সংসারে মৃত্যু একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেই মৃত্যু কোনো কোনো সময়ে অসামান্য হয়ে ওঠে। মন থেকে মেনে নেয়া যায় না কিছু মৃত্যু। একজন পরিণত বয়সে মানুষের মৃত্যুকে আমাদের হৃদয়ে যতটা না দাগ কাটে তার চেয়ে বেশি দাগ কাটে প্রিয়জনের অকালমৃত্যু। কবি জসীমউদ্দীন কবর কবিতায় বৃদ্ধের চোখের সামনে তার পরিবারের স্ত্রী-পুত্র পরিজনদের অকালমৃত্যু কিভাবে দেখেছেন তার বর্ণনা কবিতায় তুলে ধরেছেন। শুরুতে এমনভাবে- এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে। এখানে আমরা মৃত্যুকে নির্মম জীবন সত্যরূপে প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথে সাংসারিক স্নেহ ভালোবাসার মৃত্যুঞ্জয়ী মহিমাকেও অবলোকন করি। স্ত্রীকে হারিয়েছে সে তিরিশ বছর আগে কিন্তু আজও সে তার স্মৃতি মন্থন করে চোখের পানিতে। স্ত্রীর প্রতি তার সুগভীর প্রেমের এ প্রকাশ স্বভাবতই তার স্বল্পকালীন দাম্পত্য জীবন মাধুর্য সম্পর্কে আমাদের স্পর্শ করে। ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে আমরাও চোখের পানি ছেড়ে দিতে কসুর করি না। বৃদ্ধের আকুতি নাতির কাছে তার যৌবনের দিনগুলোর প্রেমগাথা বর্ণনা নদীর ঢেউয়ের মতো তরাঙ্গায়িত হয়ে আছড়ে পড়ে কূলে। এক এক করে বলে যায় তার জীবনের শোক সাগরের যন্ত্রণাকাতর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। কবি তার কবিতায় বৃদ্ধের আকুতি তার বংশের একমাত্র জীবিত সদস্য নাতিটিকে সামনে রেখে একটির পর একটি করে প্রিয়জনের কবর নির্দেশ করছে কান্নামিশ্রিত আবেগ জড়ানো ভাষায়। নিজ স্নেহ প্রেম স্মৃতির কথা বলতে বলতে অসহ্য বেদনায় পাষান হয়ে পড়েছে। যা কবিতার কাহিনীকে মানসম্পন্ন দীর্ঘায়িত করে কালোত্তীর্ণে রূপান্তরিত করছে।

কবি জসীমউদ্দীনের কবর কবিতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ড. সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় তার জসীমউদ্দীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন কবর কবিতায় বৃদ্ধের জীবন বাস্তবের রূপকে আমরা দেখতে পাচ্ছি সাংসারিক স্নেহ প্রেমের নিয়তি নিহত আরক্তিম মূর্তি। তার অপরাধ সংসারে সে স্নেহ ভালোবাসার নীড় বেঁধে সুখী হতে চেয়েছিল। স্নেহনীড় সে বেঁধেছিল, সুখের স্পর্শও সে পেয়েছিল। কিন্তু সে সৌভাগ্যের বিদ্যুচ্চমকের পেছনেই চরম দুঃখের বজ্রাঘাত নেমে এসেছিল তার জীবনে। তারই চোখের সামনে একের পরে এক মৃত্যুর হাত ধরে বিদায় নিয়েছে তার প্রেমময়ী স্ত্রী, উপযুক্ত পুত্র, লক্ষ্মী পুত্রবধূ, আদরের নাতনী, স্নেহের পুতুলী মেয়ে, শুধু তাকে স্নেহস্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যই বোধহয় বেঁচে রইল বংশের একমাত্র প্রদীপ নাতিটি। তার স্নেহের নীড় ভেঙে গেল, জীবন তার হয়ে উঠল দুঃস্বপ্নময়। চারদিকে দেখা দিলো মরুর রুক্ষতা এক দুঃসহ বেদনার অস্তিত্বকে বহন করে সে বেঁচে রইল। ভালোবেসে তাকে হারাতে হলো পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সুন্দর মানবীয় কামনাটিকে। দিনরাত মৃত্যু কামনা তার সকল ভাবনার সার হয়ে দাঁড়াল। এমন করে স্নেহের খেলায় সর্বস্বান্ত হয়ে বেঁচে থাকার কি কোনো মানে হয়। এ যে জীবনের প্রতি একটা নির্মম ব্যঙ্গ ছাড়া কিছু নয়। প্রাবন্ধিকের উল্লিখিত মমার্থ কবিতাটির অন্তর্নিহিত ভাবের বাঞ্জনার প্রতীক নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কবিতার প্রধান চরিত্র পল্লী বৃদ্ধের এমন বেদনাবিধুর স্বজন হারানোর স্মৃতি কিছুতেই বিস্মৃত হওয়ার নয়, সবাইকে সে হারিয়ে বিড়ম্বনার চূড়ান্ত সীমায় এসে পৌঁছেছে। তার স্নেহাতুর স্বপ্নবিলাসী মন তাই পৃথিবীর প্রকৃতিতেই সান্ত্বনা খোঁজে মৃত্যু বিড়ম্বিত স্মৃতিচর্চায় নাতির কাছে এক একটি শোক স্মৃতি বর্ণনা করার ফাঁকে থাকে বিশ্বস্রষ্টার নিকট দোয়া প্রার্থনা- আয় খোদা রহমান, বেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যুব্যথিত প্রাণ।
১৯২৭ সালে কবি জসীমউদ্দীনের এই বিখ্যাত কবর কবিতাটি তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ রাখালীর অন্তর্ভুক্ত হয়। এই কবিতাটির অন্তর্ভুক্তি রাখালী কাবগ্রন্থটিকে উচ্চমানে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল। কবি কবর কবিতায় স্মৃতিময় বেদনার সাথে প্রাকৃতিক বর্ণনায়ও ছিল অসামান্য। গ্রাম্যপ্রকৃতি ও মাটির মমতায় সিঞ্চিত কবিতাটির কোথাও সৌন্দর্যের ব্যত্যয় ঘটেনি, ফলে কবর কবিতাটি হয়ে উঠেছে মণিকাঞ্চনে যোগফলসমৃদ্ধ একটি শ্রেষ্ঠতম কবিতা। এই কবিতাই কবিকে দিয়েছে অমরত্ব। কবি জসীমউদ্দীন ছিলেন পল্লী দরদি। পল্লীর রূপরস চাষাভুষারাই ছিল তার কবিতার অলঙ্কার। তাইতো হতদরিদ্র পল্লীবাসীরা তাকে ভালোবেসে পল্লীকবি উপাধিতে ভূষিত করেছে। তিনি হয়েছেন আধুনিক শিক্ষিত সমাজের সাথে সাথে পল্লী পাঠকেরও নয়নমণি। বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে পল্লীর বৃদ্ধের করুণ চিত্র ‘কবর’ কবিতা এক নতুন দিগন্ত তথা বাতায়ন পথ তৈরি করে দেয়, যে পথ দিয়ে খোলা বাতাস হু-হু করে ঢুকে খেলা করে ঘরের চৌহদ্দিতে। যা আজও নদীর ঢেউয়ের মতো প্রবহমান।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.