স্বশিক্ষিত চিত্রশিল্পী আল আমিন

রায়হান রাশেদ

ছবির ভেতর দিয়ে দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রেমের কথা বলেন স্বশিক্ষিত চিত্রশিল্পী আল আমিন। আঁকেন বিমূর্ত ছবি। দেয়াল লিখনের কাজ করেন। কাজের ফাঁকে পড়ান পথশিশুদের। শিশু-কিশোরদের অন্যের কাছে ভিক্ষার হাত বাড়ানো বন্ধে কাজ করছেন। কাজের মাইনে দিয়ে সামাজিক কাজ করছেন দুই হাতে। 

মো. আল আমিনের জন্ম ১৯৭৬ সালের ৮ ডিসেম্বর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর পূর্বপার সীমান্তবর্তী আদমপুরে। বাবা আলী আহমদ ছিলেন পেশায় রেলচালক। প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামের সরকারি বিদ্যালয়ে। ক্লাস টুতে পড়ার সময় আর্টের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তখন ছিল নির্বাচনের সময়। আল আমিনের দাদাও চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ছিলেন। সেই সুবাধে বাড়িভর্তি ছিল দাদার প্রচারণার পোস্টার। ছবিগুলো তাকে টানে। ছবিগুলো তার ভালো লাগে। ছবির ওপর সাদা পাতলা কাগজ রেখে কলম দিয়ে আঁকতে থাকে। ছবি আঁকা তাকে নেশার মতো পেয়ে বসে। গ্রামের মানুষের মাটির ঘরের দেয়ালে দেয়ালে বাঁশের কঞ্চি, চক খড়ি মাটি ও কাঠি দিয়ে ছবি এঁকে ভরে রাখে। সেই সময় রিকশার পেছনে পেছনে বিপাশা-শাহেদের ছবি ছিল। প্রচুর পরিমাণে এঁকেছে তার ছবি।

এই ছবিগুলো নিয়ে কিশোর বন্ধুরা নানারকম মজা করত। কিশোর মনে ভালো লাগা ছবিগুলো আঁকার মধ্য দিয়ে আল আমিন সম্পূর্ণভাবে ঢুকে পড়ে চিত্রাঙ্কনের জগতে। ছবি অঙ্কনে কোনো শিক্ষক নেই তার। হাতেখড়ি নিয়েছে প্রকৃতির থেকে।

প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হন চম্পকনগর উচ্চবিদ্যালয়ে। হাতের লেখা সুন্দর ও পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় শিক্ষকরা স্নেহ করত। তাকে আর্টের প্রতি উৎসাহ দিত। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্থানীয় বাজারে আর্টের দোকান দেয়। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ব্যানার লিখতে থাকে। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় দেয়ালে দেয়ালে লেখেন নানারকম স্লোগান। মানুষের হা করা মুখের ছবি, এলোকেশে মাথার ছবি এঁকে টানিয়ে দিতেন গাছের ওপরে। যেন গাছের ফলমূল বাদুড় এবং অন্য পাখিরা খেতে না পারে। কাজ হয়েছিল। গাছের ফলেরা বেঁচে গিয়েছিল।

দেয়াল লিখন এবং ব্যানার লেখার মধ্য দিয়ে সময় যেতে থাকে আল আমিনের। মনের ভালো লাগা ও আত্মার প্রশান্তির পথ্য হিসেবে জীবনে বেছে নেন আর্টশিল্পকে। এইচএসসি কমপ্লিট করে আর্ট শিখতে চলে যান ঢাকার পুরানা পল্টনে। নানা সম্পর্কের এক আত্মীয়ের ‘জাজ ম্যান্ট অ্যাড’ দোকানে ব্যানার লিখতে থাকেন। সেখানেই প্রথম তুলি ধরার কৌশল রপ্ত করেন। সিনিয়র আর্টশিল্পীর কাজের প্রতি চাতক পাখির মতো তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের হাত ঘুরানো, লেখার স্টাইল আয়ত্ত করতে থাকেন। দিনের বেলায় তাদের থেকে কৌশল শিখে রাত জেগে আর্ট করেন। এমন অনেক দিন গেছে, প্রথম রাতের জাগ্রত চোখ ভোরের আলো দেখেছে।

প্রথম বছরে কাজ শিখার পাশাপাশি সারারাত জেগে ঢাকার দেয়ালে রাজনৈতিক দলের স্লোগান লিখতেন। আল আমিন জানান, ‘আমি আর এক বড় ভাই সারারাত ঢাকার পথে ঘুরে ঘুরে রাজনৈতিক কর্মীদের আদেশে দেয়াল লিখতাম। তারা ওয়ালে রঙ মেরে যেত আর আমরা দ্রুত লিখে যেতাম। এভাবে রাতে এক বছর কাজ করেছি। আমার ইচ্ছা ও চেতনা আমাকে সঙ্গ দিয়েছে।’

ঢাকার আর্ট সেন্টারে চার বছর কাজ করে এক আত্মীয়ের ভায়াতে নারায়ণগঞ্জে এসে ‘মিতা আর্ট’ নামে দোকান দেন। সেখানে তিন বছর কাজ করে অনাকাঙ্ক্ষিত রোষানলের শিকার হয়ে বাড়ি ফেরেন। বছর খানেক অবসর থেকে এক আর্ট সেন্টারে চাকরির সুবাদে নরসিংদী আসেন। ছয় মাস সেখানে কাজ করে ‘তিতাস আর্ট’ নামে নিজে একটা দোকান খোলেন। অল্প দিনেই মানুষের নজর কাড়ে তিতাস আর্ট। কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। নরসিংদীর দেয়ালজুড়ে শুধু তিতাস আর্টের অঙ্কন। কাজের সুবাদে বন্ধুত্ব হয় নরসিংদীর উদীয়মান তরুণ কবি রবিউল আলম নবি, মো: ফয়েজুল কবির এবং সম্পাদক ও সংগঠক আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেলের সাথে। বন্ধুরা তাকে ছবি আঁকতে প্রেরণা দিতে থাকে। তারাই কিনে আনে ১০ টাকা মূল্যের আর্ট পেপার। শুরু হয় নতুন আঙ্গিকের আর্ট। বিমূর্ত ছবি আঁকতে থাকেন। করতে থাকেন প্রচ্ছদ ডিজাইন।

বলেন- 'যাই আঁকতাম, তারা বিপুল প্রশংসা করত। উৎসাহ দিত। আমাকে নিয়ে হোটেলে যেত। পছন্দনীয় খাবার অর্ডার করত। আর ছবির আলোচনা করত। তাদের উৎসাহ আমাকে ছবি আঁকতে অনুপ্রাণিত করেছে।' 
তারপর প্রচ্ছদ আঁকতে শুরু করেন কলেজ দেয়ালিকায়। নরসিংদী সরকারি কলেজের ৫২’র ভাষা আন্দোলনের দেয়ালিকার প্রচ্ছদ এঁকে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পর্যায়ক্রমে ফি বছর প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের সেরা প্রচ্ছদ হতো আল আমিনের। একনাগারে ৯ বছর প্রথম স্থান অধিকারী প্রচ্ছদ ছিল তার।

স্বশিক্ষিত একজন আল আমিনের সৃষ্টিশীল প্রচ্ছদ দেখে সবাই হতবাক। তার কাজের হাত ভালো ও ভিন্ন ধাঁচ দেখে বন্ধুরা তাকে বড় স্বপ্ন দেখাতে থাকে।
দুই হাতে আঁকছেন বিমূর্ত ছবি। ছবির মাধ্যমে চিত্রাঙ্কন করছেন সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি, শ্রেণী বৈষম্য, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, অধিকার বঞ্চিত, অন্যায়ভাবে আহত হওয়া মানুষের কথা। আঁকছেন প্রেম প্রণয় ও দেশের ছবি। প্রকৃতির ছবি। প্রতিটি ছবিতে দিচ্ছেন ভিন্ন মাত্রা। তৈরি করছেন অদ্ভুত সমীকরণ। একজন মানুষ তার আর্টের ভেতর গভীর দৃষ্টি দিলে খোঁজে পাবে ভিন্নতার স্বাদ। ভালো লাগার অমিয় সুধা। আল আমিনের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন লেখক চিত্রশিল্পী দ্রাবিড় সৈকত, প্ল্যাটফর্ম প্রকাশনীর হেলাল উদ্দিন হৃদয়। তার বিমূর্ত ছবির প্রেমে পড়ে নিজের বাসায় একাধিকবার দাওয়াত দিয়ে গল্প আড্ডায় মেতেছেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার।

অঙ্কনের পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন আল আমিন। মানবতার মহান ব্রত বুকে লালন করে ছুটে যাচ্ছেন অসহায় মানুষের পাশে। সপ্তাহের দুই দিন বন্ধুরা মিলে নরসিংদী স্টেশনে পথশিশুদের পড়াচ্ছেন। বিনা পয়সায় তাদের মধ্যে বই বিতরণ করছেন। কোনো পথশিশু যেন মানুষের কাছে হাত না বাড়ায় সেজন্য হাতে নিয়েছেন অভিনব কর্মসূচি। শিশু-কিশোরদের হাত পাততে নিষেধ করে তাদের প্রয়োজন মিটাচ্ছেন। কাজ করছেন পরিবেশের জন্য। দেশে সবুজায়নে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন জায়গায় আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেলের নেতৃত্বে রোপণ করেছেন দুই হাজার বৃক্ষ। শহীদ মিনারে নগ্নপদে প্রবেশের জন্য বের করেছেন র‌্যালি। দেয়ালে এবং শহীদ মিনারের আশপাশে লিখে রেখেছেন ব্যানার। মানুষের নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে বিমূর্ত ছবি এঁকে এঁকে দেয়ালে দেয়ালে লাগিয়ে দিচ্ছেন। জানান, ‘বিমূর্ত ছবি আঁকার মাধ্যমে মানব বিবেক জাগ্রত করতে চাই। সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরতে চাই।'

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.