নিজের খামারে মো: গোলাম সারওয়ার
নিজের খামারে মো: গোলাম সারওয়ার

মরিয়ম নার্সারির কথা

মোস্তফা কামাল গাজী

মো: গোলাম সারওয়ার। পেশায় শিক। বাড়ি বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার ভুবনগাঁতি গ্রামে। ১৯৯৮ সালে বিএসএস পাস করে সিরাজগঞ্জের ‘উলুমিল ইসলামিয়া রওহা’ মাদরাসায় শিকতা শুরু করেন। ২০১২ সালে নিতান্তই শখের বশে বাড়ির পাশে এক বিঘা জমির ওপর ৩০০টি তেজপাতা গাছ রোপণ করেন। গাছগুলোকে গরু-ছাগল থেকে রার জন্য বাগানের চার পাশে বেড়া হিসেবে কয়েক জাতের ২০০ লেবুচারা রোপণ করেন। তেজপাতাগাছের সাথে যখন লেবুগাছগুলো বড় হলো, তখন তিনি তাতে অভাবনীয় সাফল্য দেখতে পান। সবুজেঘেরা বাগানটি সুগন্ধি তেজপাতা আর রসালো লেবুতে ভরে উঠেছে। সিডলেস, থাই সিডলেস, কলম্বো, এলাচি, কাগজি, শরবতি, জারা লেবুসহ বেশ কয়েক জাতের লেবুগাছের ডালে ঝুলতে থাকে থোকায় থোকায়। সুন্দর এ দৃশ্য দেখলে মনটা জুড়িয়ে যাবে যে কারো।
গোলাম সারওয়ারকে বাগান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, ‘শাকসবজি আর ফলফলাদির বাগান করা ছিল আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। জীবনের শেষ সময়ে এসে আল্লাহ তায়ালা আমার সে স্বপ্ন পূরণ করলেন। প্রথমে আমি বাড়ির পাশের অল্প জমিতে এ বাগান শুরু করি। উদ্দেশ্য ছিল, নিজে ও পাড়াপড়শিরা এর থেকে খাবে। বিক্রির ইচ্ছে মোটেও ছিল না। কিন্তু বাগানটা এত সমৃদ্ধ হবে, এর থেকে এত ভালো ফলন পাবো কখনো ভাবিনি। বাগানে এলে হৃদয়কাড়া দৃশ্য দেখে মনটা প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। এ যেন আমার প্রাণ, আমার জীবন। প্রতীতি স্বপ্নের বাস্তব রূপ।’
লেবুগাছ থেকে বেশি উপকৃত হচ্ছেন : গোলাম সারওয়ারের ঝোঁক ছিল তেজপাতাগাছের প্রতি। লেবুগাছগুলোকে প্রথম প্রথম তেমন গুরুত্বের চোখে দেখতেন না। ভালোভাবে এগুলোর যতœও নেননি। তিনি ভেবেছিলেন, অবহেলিতভাবে বেড়ে ওঠা লেবুগাছ থেকে ভালো কোনো ফলন পাওয়া যাবে না। কিন্তু এখন তিনি লেবুগাছ থেকেই বেশি উপকৃত হচ্ছেন।
ফেসবুকের সাহায্যে বিক্রি শুরু : বাগানের প্রতিটি গাছের বাম্পার ফলন দেখে পাশের নার্সারি থেকে কয়েকজন কর্মচারীকে ডেকে আনলেন গোলাম সারওয়ার। তারা তাকে লেবুগাছে কলম দেয়া ও গাছের সেবাযতেœর পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন এবং নার্সারির নকশা এঁকে গাছ লাগানোর সিস্টেম দেখিয়ে দিলেন। একজন বললেন, ফেসবুকে একটি আইডি খুলে তেজপাতা ও লেবু বিক্রি প্রসঙ্গে পোস্ট দিতে। তাদের কথায় ছবিসহ পোস্ট দিলেন তিনি। পোস্ট দেয়ার এক ঘণ্টার মাথায় কাতারসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলা থেকে ফোন এলো। তারা লেবু কিনতে আগ্রহী। গোলাম সারওয়ার খুব অবাক ও আনন্দিত হলেন। এমন সুন্দর রসালো লেবু সচরাচর পাওয়া যায় না বলেই হয়তো মানুষের এত আগ্রহ। তিনি লেবু সেল দেয়া শুরু করলেন। তিনি জানান, ‘দেশের ভেতর বর্তমানে ভোলা জেলা ছাড়া বাকি সব জেলায় লেবু সেল করা হয়ে গেছে। দেশের বাইরে ভারত, নিউ ইয়র্ক ও কাতারে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তান, সৌদি থেকেও ফোন এসেছে বার কয়েক। কিন্তু ভিসা সমস্যার কারণে এখনো সেল করা হয়ে ওঠেনি।’
লেবুর চারা বিক্রি : কেবল লেবু নয়, প্রতিদিন ভালো দামে লেবুর কলম দেয়া চারাও বিক্রি করছেন গোলাম সারওয়ার। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন তার বাগান পরিদর্শনে। তারাও খালি হাতে ফেরেন না। লেবু বা চারা কিনে নিয়ে যান সাথে করে। যারা চারা কিনে নেন গোলাম সারওয়ার তাদের অল্প জমিতে বেশি ফলনের পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেন। এতে নার্সারি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ মানুষও নার্সারির প্রতি দিন দিন বেশ আগ্রহী হচ্ছে এবং ব্যাপকভাবে চারা রোপণ করছে নিজের পতিত জমিতে।
বাগান থেকে আয় : তেজপাতার এ বাগান থেকে গোলাম সারওয়ারের প্রতি মাসে আয় হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। আর প্রতি বছর কেবল লেবু থেকেই আয় হয় আড়াই লাখ টাকা।’
অন্যান্য চারা রোপণ : মানুষের আগ্রহ মেটাতে বাগানের চার পাশে তিনি আরো লেবুর চারা রোপণ করেন। এ ছাড়া বেরিগেট হাইব্রিড মাল্টা, থাই জাম্বুরা, থাই পেয়ারা, চায়না কমলা, চায়না লিচু, আম ও বেশ কিছু দেশী-বিদেশী নারিকেল গাছও লাগিছেন ছোট্ট এ বাগানে। ছোটখাটো একটি নার্সারির রূপ নেয়ায় তিনি মেয়ের নামে এর নাম দিয়েছেন ‘মরিয়ম নার্সারি’। নার্সারির উত্তরোত্তর উন্নতি-অগ্রগতি এবং এর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছেই। তাই তিনি ভাবছেন, নার্সারির পরিধি আরো বড় করার। মাদরাসায় পড়ানোর পাশাপাশি রাত-দিন নার্সারির কাজে নিমগ্ন থাকেন তিনি। গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘আমি আগে ভাবতাম, বাগান করতে হলে অনেক জমির প্রয়োজন হয়। অল্প জমিতে ছোট বাগান করেও যে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব, এর উদাহরণ আমি নিজেই। তাই সবাইকে বলব, বাড়ির আশপাশে যে খালি জমি আছে, সেগুলো পতিত না রেখে কোনো একটা গাছের চারা লাগিয়ে দিন। দেখবেন ভালো ফলন পাবেন। ভেজালমুক্ত শস্য খেতে পারবেন নিজ বাগান থেকেই। সবাই উদ্যোগী হলে, অল্প দিনেই সবুজে ভরে উঠবে আমাদের সোনার বাংলাদেশ।’

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.