গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ইউনিট বন্ধ

শীতে ব্যবহার কমলেও চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ আসে আর যায়

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৪টি। আর এসবের উৎপাদন ক্ষমতা ১৬৪১ মেগাওয়াট হলেও বর্তমান ক্ষমতা ১৫৬১ মেগাওয়াট। কিন্তু গত সোমবার দিনের বেলায় ৩৯২ মেগাওয়াট এবং ইভিনিং পিকআওয়ারে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। আর গত মঙ্গলবার দিনের বেলায় ৪১৩ মেগাওয়াট এবং ইভিনিং পিকে ৬৩০ মেগাওয়াট সম্ভাব্য উৎপাদনের হিসাব কষে রেখেছিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। গ্যাস সঙ্কটের কারণে ৫৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি ইউনিট বন্ধ। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনও অস্বাভাবিক হ্রাস পেয়েছে। ফলে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা অসহনীয়পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
বিভিন্ন শিল্পকারখানার তথ্য অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়। আবার সাধারণের হিসাবে তা আরো বেশি। শীতের মওসুমে এমনিতেই বিদ্যুতের ব্যবহার কম হয়। তা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সঙ্কটে চট্টগ্রামের শিল্পকারখানার উৎপাদনে যেমনই বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে, তেমনি জনমনে তীব্র অস্বস্তি শুরু হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী শিল্পকারখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্যাস সঙ্কটের কারণে চট্টগ্রামের বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র ৩৬০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা সম্পন্ন রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ ও ২নং ইউনিট এবং শিকলবাহা ৪০ মেগাওয়াট ও সিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস সঙ্কটের কারণে বন্ধ থাকায় পরিস্থিতির তীব্র অবনতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিপিডির সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস সঙ্কট ছাড়াও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দু’টি ইউনিটে ৪০ মেগাওয়াট করে ৮০ মেগাওয়াট এবং অপর ৩টি ইউনিটের ৫০ মেগাওয়াট করে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু গত সোমবার অর্থাৎ ১ জানুয়ারি পাঁচটি ইউনিট মিলে ৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে।
পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দিনের বেলায় সাড়ে ৬ শ’ মেগাওয়াট এবং রাতের বেলায় সাড়ে ৭ শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে চট্টগ্রাম পিডিবির পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড থেকেও সরাসরি লোডশেডিং করা হয় বলে সূত্র জানায়। ফলে দৈনিক লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কত তাও হিসাব মিলানো দায় হয়ে পড়েছে। সূত্রমতে, চাহিদা এবং উৎপাদনের মাঝে বড় ধরনের ব্যবধান থাকলেও ঘাটতি পোষাতে ন্যাশনাল গ্রিড হতে কোনো বিদ্যুৎ সচরাচর চট্টগ্রামে দেয়া হচ্ছে না, বরং উল্টো এখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুতের অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে বিজিএমএইএ’র সদস্যভুক্ত গার্মেন্ট কারখানা, চট্টগ্রাম ইপিজেডস্থ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং গার্মেন্ট শিল্পের প্রচ্ছন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেক্টরের রফতানিমুখী প্রায় দেড় সহস্রাধিক শিল্পকারখানার শুধু জ্বালানি তেল কিনতেই দৈনিক কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
সূত্রমতে ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য সেমি অটো রি-রোলিং মিলগুলো সাধারণত রাত ১০টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত রড উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু এই ১২ ঘণ্টা সময়ের মধ্যেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক উৎপাদন দারুনভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে ব্যবসায়িরা অভিযোগ করেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হলে জেনারেটর দিয়ে রি-রোলিং মিল চালানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় দাবি করে সুত্র জানায়, এতে রডের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
একাধিক ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করে জানা গেছে, চট্টগ্রামে শিল্প কারখানার জন্য প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ প্রয়োজনের সঠিক পরিসংখ্যান পিডিবির কাছে নেই। ফলে যথাযথ লোড ম্যানেজমেন্ট সম্ভব হচ্ছে না বলেও ব্যবসায়ীরা মন্তব্য করেন। ভুক্তভোগী নাগরিকরা জানান, ১০-১৫ দিন ধরে বন্দর নগরীতে বিদ্যুতের আসা যাওয়ার ভেল্কিবাজি চলছে। অসহনীয় লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.