মাদরাসা শিক্ষা উপেক্ষিত হচ্ছে!

অধ্যক্ষ মো: ইয়াছিন মজুমদার

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেনÑ হে নবী আপনি বলে দিন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা সমান নয় (সূরা জুমার-৯)। আল্লাহ পাক আরো বলেছেনÑ পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন (সূরা আলাক-১)। নবী সা: বলেছেনÑ আলেমের মর্যাদা একজন আবেদ বান্দার ওপর তেমনি, যেমনি আমারও সাধারণ মানুষের মর্যাদার পার্থক্য (তিরমিজি)। নবী সা: আরো বলেনÑ যখন আল্লাহ কোনো বান্দার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন (মুসনাদে আহমাদ)। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য বিদ্যার্জন, কর্মতৎপরতা যেমনি প্রয়োজন, পরকালীন স্থায়ী জীবনের জন্য যথাযথ আমল তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমলের নিয়ম-পদ্ধতি, মাসয়ালা-মাসায়েল, বিশুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন তিলাওয়াত জানা না থাকলে, দোয়া, তাসবিহ পড়তে না জানলে পরকালীন জীবনের জন্য আমল করা সম্ভব হয় না। পিতা-মাতার এমন সন্তান রেখে যাওয়া উচিত নয়, যারা তাদের জানাজায় দাঁড়িয়ে সঠিকভাবে দোয়াগুলো পড়তে জানে না। বর্তমানে স্কুল-কলেজ, মাদরাসায় সাধারণ বইগুলো একই বই পাঠ্য। দশম শ্রেণী পর্যন্ত বই সরকারিভাবেই সরবরাহ করা হয়। সাধারণ শিক্ষায় একটি বিদেশী ভাষা ইংরেজি। শিক্ষার্থীরা সাধারণত এ বিষয়ে ফলাফল খারাপ করে থাকে। অপর দিকে মাদরাসাশিক্ষার্থী ইংরেজির পাশাপাশি আরো একটি বিদেশী ভাষা আরবি শিখতে হয়। দু’টি বিদেশী ভাষার মুখোমুখি হওয়ার পরও মাদরাসার ছাত্ররা বরাবরই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে সাধারণ শিক্ষার ফলাফল থেকে ভালো করছে।
সাধারণ শিক্ষায় বারবার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও মাদরাসার ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। মাদরাসার পাঠ্য বিষয় সাধারণ শিক্ষার তুলনায় বেশি। এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রকে এক হাজার ৩০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়, একই সমমানের মাদরাসাছাত্রকে এক হাজার ৭০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। মাদরাসায় মানসম্মত শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তার বড় উদাহরণ হলো বিশ^বিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার ফল।
বিগত কয়েক বছরের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বেশির ভাগ মাদরাসাছাত্র প্রথমস্থানসহ অনেকগুলো শীর্ষস্থান দখল করেছে। ২০০৮-৯ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মাদরাসাছাত্র আবদুল খালেক। সে বছর মেধা তালিকার প্রথম ১০ জনের চারজনই মাদরাসার ছাত্র। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে প্রথম হন মাদরাসাছাত্র আবদুল আলীম, দ্বিতীয় হন মাদরাসার ছাত্র সেলিমুল কাদের, তৃতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, দশম, ১৭তম ও ১৮তম হন মাদরাসার ছাত্র। একই বছর ‘ঘ’ ইউনিটে প্রথম মাদরাসার ছাত্রী এলিছ জাহান, দ্বিতীয় মাদরাসার ছাত্র মিজানুল হক, চতুর্থ ও ১১তম হন মাদরাসার ছাত্র। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে প্রথম হন মাদরাসার ছাত্র মাসরুর বিন আনসারী, দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ১৬তম, ১৭তম ও ১৮তম হন মাদরাসার ছাত্ররা। একই বছর ‘ঘ’ ইউনিটে প্রথম মাদরাসার ছাত্র আসাদুজ্জামান, দ্বিতীয় স্থানও দখল করে মাদরাসার ছাত্র। এরপর মাদরাসার ছাত্ররা যেন প্রতিযোগিতা করতে না পারে তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০০ নম্বর করে বাংলা-ইংরেজি সিলেবাসে থাকার শর্ত করে দেয়।
এত দিন মাদরাসায় আরবি প্রাধান্য থাকায় ১০০ নম্বর করে বাংলা-ইংরেজি ছিল। ১০০ নম্বর পড়ে মাদরাসার ছাত্ররা ২০০ নম্বরপড়–ুয়া স্কুল-কলেজ ছাত্রদের থেকে মেধায় এগিয়ে থাকার প্রমাণ দিলেও শর্তারোপের কারণে বাধ্য হয়ে মাদরাসার মূল আরবি শিক্ষা কিছুটা সঙ্কুুচিত করে স্কুল-কলেজের মতো ২০০ নম্বর করে বাংলা-ইংরেজি মাদরাসার সিলেবাসভুক্ত করা হয়। এরপরও থেমে নেই মাদরাসাশিক্ষার্থীদের অগ্রযাত্রা। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরিক্ষার ফলাফলে (পাসের হার ছিল ৯.৯৮) ‘ঘ’ ইউনিটে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম হন মাদরাসার ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন, মানবিক শাখা থেকে প্রথম হন মাদরাসার ছাত্র রিফাত হোসেন। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে প্রথম স্থান অধিকার করে মাদরাসা ছাত্র আবদুল্লাহ মজুমদার। তা ছাড়া মেধা তালিকায় স্থান নেয়া সাধারণ শিক্ষার অনেকে এসএসসি পর্যন্ত মাদরাসায় পড়ে কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পাস করা।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাস্থানপ্রাপ্তদের গড়ে সব বোর্ডে ভাগ করে দিলে মাদরাসা বোর্ড পাবে প্রায় পাঁচজন, বাকিদের ভাগে গড়ে একজন করেও পড়বে না। এভাবে মেধার পরিচয় দেয়ার পরও উচ্চশিক্ষিত সঙ্কীর্ণমনা কিছু ব্যক্তির কারণে ভর্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাদরাসাছাত্র বিরূপতার শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন সময় সরকার মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও অবদান রাখলেও বাস্তবতায় সাধারণ শিক্ষায় সরকারের সাহায্যের তুলনায় তা একেবারে নগণ্য। আপনি যেকোনো ইউনিয়নপর্যায়ের একটি স্কুলে গিয়ে তাদের সরকার-প্রদত্ত অবকাঠামো এবং একই ইউনিয়নের একটি মাদরাসায় গিয়ে তাদের জন্য সরকারের প্রদত্ত অবকাঠামো, উপজেলা বা জেলাপর্যায়ে একটি কলেজের অবকাঠামো ও একই স্থানের সমমানের মাদরাসার অবকাঠামোর দিকে তাকালে তা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হবে না। একটি ডিগ্রি কলেজে ইন্টার প্রথম, দ্বিতীয় বর্ষ, ডিগ্রি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে মোট মৌলিক শ্রেণী পাঁচটি, অপর দিকে একটি ডিগ্রি মাদরাসা প্রথম শ্রেণী থেকে ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত ১৫টি মৌলিক শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন। ভবন বরাদ্দে সে দিকটি বিবেচনা করা হয় না। ১৯৯৪ সালে একই পরিপত্রে স্বতন্ত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা গড়ে ওঠে। বেতন ছিল মাসিক ৫০০ টাকা। ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে প্রথমে বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্ত ও পরে সরকারীকরণ করা হয়েছে। অপর দিকে, ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকের বেতন ৫০০ টাকার স্থলে বর্তমান সরকার এক হাজার টাকা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে হয়তো বলা হবেÑ আমরা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করেছি। কিন্তু সে দ্বিগুণ বেতন একজন শিক্ষকের মাসিক এক হাজার টাকা হওয়া উপহাস ছাড়া আর কিছু কি? তাদেরকে সংযুক্ত ইবতেদায়ির সম-স্কেলে নিলে ও ইজ্জত কিছুটা রক্ষা পেত। দেশে হাজার হাজার সরকারি স্কুল-কলেজ রয়েছে, অথচ সরকারি মাদরাসা রয়েছে মাত্র তিনটি। বর্তমান সরকার ছয় শতাধিক স্কুল-কলেজকে নতুন করে সরকারীকরণের ঘোষণা দিলেও একটি মাদরাসাকেও সরকারীকরণের ঘোষণা অদ্যাবধি দেয়া হয়নি।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে আমার জানামতে মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। অথচ সাধারণ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, এ দেশে চাকরির বাজার খুবই সীমিত। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় তারা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের বিশাল শ্রমবাজার। বৈদেশিক মুদ্রা যা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তার বেশির ভাগই আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা আরবি, আরবি জানা ব্যতীত সেখানে গিয়ে ভালো চাকরি ও বেতন পাওয়া কঠিন। ভাষা শিখতে শিখতে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মাদরাসার ছাত্ররা ব্যতিক্রম, তারা সহজে ভাষা আয়ত্ত করে নেয়। এ জন্য আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের পশ্চিমবঙ্গের অনেক হিন্দু ছেলে মাদরাসায় ভর্তি হয়ে আরবি শিখছে। তারা আরবি ভাষা আয়ত্ত করে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে চাকরি করবে।
একসময় জঙ্গি বলতে মাদরাসার ছাত্রদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হতো। সে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত করে মাদরাসাশিক্ষিতরা মসজিদে জুমার খুতবায়, শ্রেণিকক্ষে, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে, কুরআন ও হাদিসের আলোকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করছে। এভাবে মাদরাসা শিক্ষিতরা মেধার ক্ষেত্রে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে, জঙ্গিমুক্ত জাতি গঠনের ক্ষেত্রে অবদান রাখার পরও সাধারণ শিক্ষার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম পাওয়া দুঃখজনক। বর্তমান সরকার আরবি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি প্রদানসহ মাদরাসার উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় তা এখনো অনেক কম। আশা করি সরকারিকরণ, অবকাঠামোগত সুবিধা দান, বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
লেখক : অধ্যক্ষ, ফুলগাঁও ফাজিল মাদরাসা, লাকসাম, কুমিল্লা

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.