মাছ ধরা মানুষের গল্প

এস আর শানু খান

জেলে নামটার সাথেই কেমন যেন জাল জড়িয়ে রয়েছে। জেলে মানেই নৌকা-পানি-মাছ। নানা রকম ফন্দিফিকির খাটিয়ে পানি থেকে মাছ ধরাই হলো জেলে সম্প্রদায়ের একমাত্র কাজ। জেলেপল্লী সাধারণত নদীর কূলবর্তী অঞ্চলেই গড়ে ওঠে। আমার জন্ম নবগঙ্গা নদীর কূলের মনোখালী নামক একটা গ্রামে। নদীর এতটাই কাছে আমাদের বাড়ি যে বাড়ির উঠানে দাঁড়ালেই নদীর জোয়ার-ভাটা ঠাওর করা যায়। আমাদের গ্রামের লাগা দক্ষিণের গ্রামের নাম সিঙ্গিয়া। আর এ সিঙ্গিয়ায় রয়েছে একটা বিরাট জেলেপল্লী। যেখানে প্রায় ৫০ ঘর জেলে পরিবারের বসবাস। আমাদের ঘাট থেকে দক্ষিণে তাকাতেই চোখে পড়ে জেলে ঘাটে বেঁধে রাখা ডিঙ্গি নৌকা, আর ডিঙ্গি নৌকা নদীর ঢেউয়ে মৃদু দোল খায়। পাশাপাশি বসবাস হওয়ার কারণেই জেলেপল্লীর প্রায় প্রতিটি মুখই আমার চেনা। সকাল-বিকেল নদীর ঘাটে গেলেই দেখা মেলে কত না জেলের। নৌকা বেয়ে বেয়ে কেউ জাল পাতছে, কেউ বা দুয়ার, বানে, দাউনে, কেউবা চারো পাতছে। বিকেলে এগুলো যার যার মতো পেতে রেখে বাড়ি ফেরে। ভোর সকালে আবার এগুলো এসে উঠিয়ে নিয়ে যায়। যে মাছ পায় সেগুলো সিঙ্গিয়ার বাজারে কেউবা আবার গঙ্গারামপুর বাজারে নিয়ে বাজার ধরাই। আবার অনেকে দুপুরে এসে নদীতে ভাসান দেয়। ভাসান হলো এমন একটা মাছ ধরার পদ্ধতি যেটা হলোÑ জাল পেতে মাছ তাড়িয়ে জালে বাঁধানো হয়। এতে যে মাছ পায় সেগুলো নিয়ে বিকেলে সিঙ্গিয়ার বাজার নয়তো মনোখালীর মোড়ে বিক্রি করে। অনেকেই আবার থালায় করে মাছ সাজিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রির জন্য নিয়ে ঘুরে। এবং এভাবেই জীবিকা চলে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ও মানুষের চাহিদা অধিক হওয়ার কারণে অনেক টাকাওয়ালা মানুষেরা নিজেদের জমিতে বড় বড় পুকুর খনন করে বিভিন্ন রকমের উচ্চ ফলনশীল মাছের চাষ শুরু করেছেন। যার কারণে বাজারে মাছের অভাব নেই। অল্প দামে অনেক মাছ পাওয়া যায়। যার জন্য জেলেরা তাদের মাছ বিক্রিয় করে ন্যায্যমূল্য পান না। কম দামে বিক্রি করতে হয়। শুধু তাই নয়, ঘাটে ঘাটে বড় বড় ব্রিজ কালভার্ট হওয়ার কারণে নদীর এখন আর ঠিক আগের মতো জীবন নেই। আগের মতো আর জোয়ার উঠে না। ভাটাও নামে না। স্রোতও নেই তেমন। তাই তো নদীতে মাছের উপস্থিতিও কম। তাই তো এখন বেশির ভাগই জেলেরাই নিরুপায় হয়ে জাত ব্যবসায় মাছ ধরার পেশাকে ছেড়ে বেঁচে থাকার তাগিদে মাঠের কাজসহ নানা রকম কাজে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের টাকা-পয়সা আছে তারা বিভিন্ন মানুষের পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করে। আবার কেউ কেউ মাঠে জমি বন্ধক রেখে চাষাবাদ শুরু করেছে। কেউবা আবার দোকানপাট করে বসেছে। কিন্তু তারা একদম হতদরিদ্র। এগুলোর কোনোটিই করার মতো পুঁজি নেই। এরকম নিরুপায় জেলেরা এখনো নদীতে পেটের দায়ে মাছের পেছন পেছন ঘুরে। বাপ-দাদার পুরনো ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নৌকা নিয়ে নদী চষে বেড়ায়। এমন একজন হলেন চিত্ত গোসাই ও হাজারিকা। পুরনো মানুষ বলতে জেলেপাড়ায় বর্তমানে এই দু’জনই আছেন। বাকি সবই নতুন প্রজন্ম। এই দুটা মানুষেরই মধ্যেই সব পুরনো ইতিহাস বিদ্যমান। চিত্ত জেলে ও তার ছেলেরা এখনো নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরেন। শীত মওসুমে পানি খুব ঠাণ্ডা থাকে। যার কারণে মাছও কম ধরা পড়ে। মাছের আনাগোনাও কমে যায়। এসব নানা কারণে শীতকাল জেলেদের ঠাণ্ডা মওসুম। এ সময় মাছ ধরা পড়ে না বলে জেলেপল্লীতে নানা অভাব-অনটনের উপস্থিতি দেখা দেয়। আর এই অভাব অনটনের হাত থেকে নিজে ও জেলেপল্লীর কিছু নিঃস্ব মানুষের কথা চিন্তা করে চিত্ত জেলে বড় নৌকা আর বিরাট বড় জাল নিয়ে বের হয়ে পড়েন জাল টানতে। যার নাম দড়া জাল। দড়া জাল টানতে কম করে হলেও আট-দশজন মানুষ লাগে। নদীতে মাছের উপস্থিতি ধারণা করে কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় এই জাল ফেলে দুই পাশ থেকে তিন-চারজন করে একসাথে জাল টেনে নদীর কূলে গুটিয়ে আনা হয়। অল্প জায়গায় এনে মাছ ধরা হয়। ছোট বড় সব ধরনের মাছ ধরা পড়ে এ জালে। কপাল ভালো হলে এক-দুইবার ফেলে টেনে উঠালেই সবার দিনের রোজগার হয়ে যায়। কম করে দুই-আড়াই শ’ টাকা ভাগে পায়। আবারো এমন আছে যে, সে দিন এমন হয় যে ভাগ করে শুধু বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মাছ হয়। বিক্রি করার মতোও হয় না। চিত্ত জেলের দুই ছেলে ও পাড়ার বেশ কয়েকজন প্রতি বছর এ জাল টানে। মাঝে মধ্যে হিন্দু, মুসলমান অনেকেই গিয়ে যোগ দেয় চিত্ত জেলের দড়া জাল টানা নৌকায়।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.