ঘুষ যখন ‘স্পিড মানি’

এম জি হোসেন

ইদানীং ঘুষ-দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। ঘুষ-দুর্নীতি বিষয় দুদক চেয়ারম্যানও সম্প্রতি কড়া বক্তব্য দিতে শোনা গেল। তবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কিছু বক্তব্যের ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে কঠিন সমালোচনা হয়েছে ও হচ্ছে। যাহোক, ‘দুর্নীতি নির্মূলে সরকার বদ্ধপরিকর’ এমনটি বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারের একটি ক্লিন ইমেজের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের অনেকে এ বিষয়ে আন্তরিক মনে হলেও তাদের অবস্থা এখন যেন ‘ছেড়ে দেয়া নৌকা’র মতো। নাহিদ সাহেব বোধকরি তাদেরই একজন। এ যাবৎ দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকার জন্য তার খ্যাতি রয়েছে। কিছু অপ্রিয় সত্য বলায় তিনি এখন সমালোচনা ও নিন্দার পাত্র স্বগোত্রীয়দের কাছেও। এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘স্কুল পরিদর্শনে গেলে খাম রেডিই থাকে। আপনারা ঘুষ খান; কিন্তু সহনীয় হয়ে খান। কেননা আমার এটা বলার সাহস নেই যে, ঘুষ খাবেন না। তা অর্থহীন হবে। খালি যে অফিসাররাই চোর তা নয়, মন্ত্রীরাও চোর। আমিও চোর। জগত এমনই চলে আসছে। তবে এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।’ কথা হলো, ‘আমার মন্ত্রণালয়ের কাউকে যদি চোর বলা হয়, তবে মন্ত্রী হিসেবে আমিও চোর হয়ে যাই।’ নাহিদ সাহেবের এই বক্তব্যে অস্পষ্টতা বা অসত্য কোথায়?

নিজের কথা বলি। অভাব অনটনে পড়ে ছাত্রজীবনেই চাকরি নিতে বাধ্য হয়েছিলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ১৯৭১ সালের কথা। বয়স দিন কম থাকার পরও বিশেষ বিবেচনায় চাকরিটা পেয়েছিলাম কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ছাড়াই। অবশ্য বেশি দিন চাকরি করা সম্ভব হয়নি। সামরিক সরকার মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে আমাদের সবাইকে চাকরিচ্যুত করল কোনো কারণ ছাড়াই। তখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘খাম’ রেডি করা যে থাকত না, তা নয়। ‘পুকুরের ইলিশ’, দুধ-দই বড় সাহেবদের বাসায় মাঝে মধ্যে যেত। ঘুষ ছাড়া টিএ বিল তখনো পাস হতো না। বড় সাহেবদের ‘সারপ্রাইজ’ ভিজিটের খবর এখনকার প্রশ্ন ফাঁসের মতো আগেই পৌঁছে যেত জায়গামতো। ঘুষ সেই ব্রিটিশ আমলেও ছিল। কিন্তু এখন স্বাধীন দেশে থাকবে কেন? একসময় ছিল, যখন ঘুষ খাওয়ার দুর্বলতাটা কেউ তার স্ত্রীকেও বুঝতে দিত না। ঘুষখোর ছেলের কাছে কেউ মেয়ে বিয়ে দিতে চাইত না। এমনকি স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসার কমিটি নির্বাচনেও বিষয়টি গুরুত্ব পেত। ঘুষখোর, সুদখোর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে দান করতেও কুণ্ঠিত বোধ করতেন। এখন পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, অনেক মেয়ের বাবা হন্যে হয়ে বিশেষ বিশেষ দফতরের পাত্র খোঁজেন। বিশেষ বিশেষ দফতরের কেরানি বা পিয়নেরও অনেক বেশি চাহিদা মাস্টার্স পাস শিক্ষকের চেয়ে।

শিক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনায় একজন মন্ত্রী বলেই ফেললেন, ‘নাহিদ সাহেব চোর হতে পারেন, আমরা চোর নই’। তার মন্ত্রণালয়ে একজনও যদি অসৎ না থাকেন, তবেই এ দাবি তিনি করতে পারেন। একবার এক লঞ্চডুবিতে বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় নৌমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন কিনা’ প্রশ্ন করা হলে বলেছিলেন, লঞ্চ কি আমি চালিয়েছিলাম যে, পদত্যাগ করব?’ এটাই আমাদের দায়িত্ববোধ। নাহিদ সাহেব ‘সহনীয় মাত্রায়’ ঘুষ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিপদে, অথচ আমাদের অর্থমন্ত্রীর দর্শন অনুযায়ী ঘুষে কোনো অনৈতিকতা নেই। বরং এটি কাজের প্রেরণা জোগায়। সুতরাং ঘুষ তার বিবেচনায় স্পিড মানি বিশেষ। আরেকজন মন্ত্রীর প্রকাশ্য ঘোষণা, ‘লুটপাট করে খেলেও আমরা কাজ করেছি’ এবার যাই কোথায়? আপনাদের বিবেচনায় শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেবের গ্যালিলিও’র পথ ধরাই কি শ্রেয়? স্মর্তব্য, গ্যালিলিও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘পৃথিবী স্থির, সূর্য ঘোরে!’

বিনা মূল্যের বইতে ভুলের সমারোহ, নিম্নমানের কাগজ, ছাপা ও বাঁধাই, দেশের ছাপাখানাকে বঞ্চিত রেখে বিদেশে বই ছাপানো, শিক্ষার মানগত বিপর্যয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস, জাতির বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চেতনা ও প্রত্যাশার সাথে সাংঘর্ষিক পাঠ্যক্রম, ইত্যাদি বহু বিষয় তার মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু তাই বলে নিছক সমালোচনার জন্যই সমালোচনা তা কোনোমতেই কাম্য নয়। পতিতাদের ‘যৌনকর্মী’ বলে অতিহিত করলেও সে যেমন পতিতাই থাকে, তেমনি ঘুষকে বখশিস, ‘স্পিড মানি’ বা মালপানি যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, তা অনৈতিক উপার্জন বলেই বিবেচিত হবে। আর কোনো মন্ত্রণালয়ে অনৈতিক লেনদেন, চুরি বা লুটপাটের দায় থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কোনোভাবেই নিজেকে মুক্ত ভাবতে পারেন না, এই চেতনার অভাবই বোধকরি সমাজে-রাষ্ট্রে দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসনের অন্যতম কারণ। সুতরাং বলা যায়, শিক্ষামন্ত্রী ‘শীতের রাতে গরমের ওয়াজ’ করে ফেলেছেন, এটুকুই যা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.