কক্সিডাইনিয়া বা মেরুদণ্ডের শেষ হাড়ের ব্যথা

ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

কক্সিসে ব্যথা হলে চিকিৎসা পরিভাষায় তাকে বলে কক্সিডাইনিয়া। কক্সিস হচ্ছে মেরুদণ্ডের শেষ হাড়, এ জন্য এটিকে টেইলবোন বলা হয়। এ হাড়ের অবস্থান দুই নিতম্বের মাঝখানের গভীরে ও মলদ্বারের ওপরে। কক্সিসে কিংবা তার আশপাশের মাংসপেশি ও লিগামেন্টে ইনজুরি হলে বা চাপ লাগলে আপনার কক্সিডাইনিয়া হতে পারে। বসলে ব্যথা আরো বাড়ে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যথা ভালো হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগে। তবে কখনো কখনো এ ব্যথা সুদীর্ঘকাল অবস্থান করে। আপনার দৈনন্দিন কার্যক্রমের ওপরও ব্যথার তীব্রতা বেড়ে যাওয়া নির্ভর করে।
কেন কক্সিডাইনিয়া হয়
সচরাচর ইনজুরির কারণে কক্সিডাইনিয়া হয় তবে আপনা-আপনিও এটা হতে পারে। কক্সিসে ব্যথা হওয়ার আরো অনেক কারণ রয়েছে, যেমন কক্সিস ভেঙে গেলে কিংবা স্যাক্রো-কক্সিজিয়াল জয়েন্ট ছুটে গেলে। প্রথম স্যাক্রোল নার্ভের গোড়ায় চাপ পড়লে। আঘাতের কারণে স্যাক্রো ইলিয়াক জয়েন্টে অস্টিও আর্থ্রাইটিস হলে। সন্তান প্রসবের পর। দুই নিতম্বের মধ্যে সংক্রমণ যেমন দাদ হলে। পাইলোনিডাল সিস্ট হলে। অনেক দিন ধরে শক্ত জায়গায় বসে কাজ করলে। হাড় ক্ষয় হলে। সাইকেল চালালে। বসার স্থানে ঠিকমতো না বসলে।
কক্সিডাইনিয়ার উপসর্গ কী?
কক্সিসে ব্যথাই হলো কক্সিডাইনিয়ার প্রধান উপসর্গ। স্থানটিকে চাপ দিলে ব্যথা বেশি অনুভব হয়। এ জন্য রোগীর বসে থাকতে কষ্ট হয় কিংবা সামনের দিকে ঝুঁকে কাজ করতে কষ্ট হয়। রোগী সাইকেল চালাতে গেলে কিংবা কোথাও বসলে কক্সিস হাড়ে চাপ পড়ার কারণে রোগীর ব্যথা বেড়ে যায়। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে রোগীর ব্যথা বাড়ে। মল ত্যাগের পর ব্যথা কমে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌন ক্রিয়ার সময় ব্যথা বাড়ে।
রোগ নির্ণয়
মেরুদণ্ডের শেষ মাথায় চাপ দিলে রোগী ব্যথা অনুভব করে। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর ওঠার সময় দুই নিতম্বের মাঝখানে রোগী ব্যথা অনুভব করে। ব্যথা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের বেশি হয়। হাড়ে বা টিস্যুতে কোনো অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না সেটা দেখার জন্য এক্স-রে ক্যাট স্ক্যানে অথবা এমআরআই পরীক্ষা করা হয়।
কী চিকিৎসা দেবেন?
কক্সিডাইনিয়ার রোগীকে পুরু প্যাডের নরম আসনে বসার পরামর্শ দেয়া হয়। রোগী যখন বসবে তখন যেন পুরু প্যাডের সিটে বসে। যতটা সম্ভব দীর্ঘসময় বসে থাকার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। ব্যথা তীব্র হলে কিংবা মাঝে মধ্যেই সমস্যা দেখা দিলে ব্যথার সঠিক কারণ খুঁজে বের করার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অনেক সময় রোগীর নিতম্বদেশে র্যাশ বা কালশিরা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীকে অবশ্যই বিশ্রামে থাকতে হবে। আক্রান্ত স্থানে পুনরায় যাতে আঘাত না পায় সে জন্য বিশ্রামে থাকা একান্ত প্রয়োজন। ব্যথা কমানোর জন্য প্রদাহ বিরোধী ও ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া যেতে পারে।
রোগী বালিশ কুশন কিংবা বাটোক সাপের্টের ওপর বসবে, এতে উপকার পাওয়া যেতে পারে। কক্সিডাইনিয়ার কিছু রোগীর স্থানিক কর্টিসন ইনজেকশনের প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে একজন অর্থোপেডিক চিকিৎসক রোগীর ব্যথার স্থানে বিশেষ সতর্কতায় কর্টিসন ইনজেকশন প্রয়োগ করবে। চিকিৎসক ইনজেকশন তার অফিস বা চেম্বারের দিতে পারবে। ইনজেশন দেয়ার পরপরই সাধারণত রোগীর ব্যথা চলে যায়। ফিজিক্যাল থেরাপি ও ব্যায়াম অনেক সময় বেশ কাজ দেয়।
আর যদি রোগীর ব্যথা সব সময় থাকে এবং ওষুধ ও ব্যায়ামে কাজ না হয় তাহলে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে কক্সিসের বাড়তি হাড় কেটে ফেলা হয়।
কক্সিডাইনিয়া কি প্রতিরোধ করা সম্ভব?
যেহেতু কক্সিডাইনিয়ার সাথে আঘাতের একটি সম্পর্ক রয়েছে তাই কক্সিডাইনিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কক্সিস হাড়ে যেকোনো ধরনের আঘাত এড়িয়ে চলা। তবে দুর্ঘটনাতো যেকোনো সময়ই ঘটতে পারে, তাই কক্সিসের ব্যথা সম্পূর্ণ প্রতিরোধের উপায় আসলেই নেই।
মোটা মানুষের অবশ্য কক্সিসে ব্যথা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, এ ক্ষেত্রে ওজন কমাতে হবে। কিছু খেলাধুলা যেমন বাস্কেটবল, ফুটবল বা হকি বাদ দিলে কক্সিকে ব্যথার ঝুঁকি কমবে।
লেখক : স্বাস্থ্য নিবন্ধকার, গল্পকার ও সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন : ০১৭১৬২৮৮৮৫৫।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.