বাংলাদেশে নেফ্রোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা: মোহাম্মাদ মতিউর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত

নিরাময় ডেস্ক

বাংলাদেশে নেফ্রোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা: মোহাম্মদ মতিউর রহমান ১৯৩৫ সালে রাজশাহীর (বর্তমান নাটোর) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলজীবন শেষ করার পরে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে গ্র্যাজুয়েশন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি খুবই মেধাবী এবং পরিশ্রমী ছিলেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ শেষ করার পরে ডা: মতিউর রহমান সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দেন এবং সেখানে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং সেখানকার বিভিন্ন হাসপাতালে জেনারেল মেডিসিনে কাজ করেন এবং ১৯৭০ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রের উচ্চতর ডিগ্রি এমআরসিপি (ইউকে) অর্জন করেন।
১৯৭১ সালে তিনি গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেফ্রোলজি বিভাগে যোগ দেন এবং নেফ্রোলজির ওপর বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে পিজির পরিচালক অধ্যাপক নুরুল ইসলামের সাথে এক সাক্ষাতে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবাকে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তিনি দেশে ফিরে নেফ্রোলজি বিভাগ শুরুর আগ্রহ ব্যক্ত করেন। এর সূত্র ধরে ১৯৭৩ সালে অধ্যাপক মতিউর রহমান দেশে ফিরে আসেন এবং ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন অ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চ-আইপিজিএমআর এ নেফ্রোলজি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট অন্য বিভাগের নিবিড় সহযোগিতায় পেরিটনিয়াল ডায়ালিসিস এবং রেনাল বায়োপসির মতো জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়াগুলো আইপিজিএমআর এ শুরু করেন।
১৯৭৭ সালে অধ্যাপক রহমান নিজে সভাপতি এবং আইপিজিএমআরের বায়োকেমিস্ট্রির সাবেক প্রধান ও পিএসসি সদস্য ড. সোহরাব আলিকে সাধারণ সম্পাদক করে রেনাল অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন। বাংলাদেশের মানুষদের কিডনি বিষয়ে সচেতন করার লক্ষ্য নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন ১৯৮২ সাল থেকে কিডনি রোগ সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত প্রকাশনা বের করতে থাকে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে সীমিতভাবে হ্যামোডায়ালিসিস শুরু করেন। এর ভিত্তিতেই প্রফেসর মতিউর রহমান সার্জন, অ্যানেস্থেসিস্ট ও অন্য সদস্যদের দিয়ে গঠিত টিমের মাধ্যমে রেনাল ট্রান্সপ্ল্যানটেশন করা হয়। এ টিমে অধ্যাপক রহমানের সাথে আরো ছিলেন অধ্যাপক গোলাম রসুল, মেজর জেনারেল কে এম সিরাজ জিন্নাত, অধ্যাপক এম এ ওয়াহাব, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবাল এবং ডাক্তার এইচ ইউ রাশিদ। পুরো অপারেশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন অধ্যাপক মতিউর রহমান।
অধ্যাপক মতিউর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেফ্রোলজির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি এমডি (ডক্টর অফ মেডিসিন) কোর্স চালু হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ এবং নেপালের ২০ জনের বেশি ছাত্র নেফ্রোলজির ওপর ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রি অর্জন করে গবেষণার ক্ষেত্রে চমকপ্রদ সাফল্য প্রদর্শন করে।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে কিডনি সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরো এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ কিডনি ট্রাস্ট গঠন করা হয়। অধ্যাপক রহমান এর সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। পরে মেজর জেনারেল কে এম সিরাজ ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। অধ্যাপক মতিউর রহমানের বিশেষ উদ্যোগের ফলে ১৯৮৮ সাল থেকেই আইজিএমআর এ বিভিন্ন দক্ষ নেফ্রোলজিস্ট, ইউরোলজিস্ট ও অ্যানেস্থেসিস্টের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে রেনাল ট্র্যান্সপ্লান্টেশন করা হচ্ছে।
১৯৯৩ সালে বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটি মানুষের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ওপর একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের কাছে জমা দেয়। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক ডা: মতিউর রহমান। এটাকে রেনাল ট্র্যান্সপ্লান্টেশনের জন্য মৃতদেহ দান করার ক্ষেত্রে প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশে রেনাল ট্র্যান্সপ্লান্টেশন-আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি ক্ষেত্র’ শীর্ষক এক যৌথ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে রেনাল ট্র্যান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে সক্রিয় সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়া হয়। এতে রেনাল ট্র্যান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে সক্রিয় সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তোলারপ্রস্তাব দেয়া হয়। এর সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক মতিউর রহমান।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের চতুর্থ সমাবেশে অধ্যাপক রহমান ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজের অ্যান্ড ইউরোলজি’ (এনকেআইডিইউ) প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৮৯ সালে এর প্রকল্প নকশা সরকারের কাছে দেয়া হয় এবং ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইনস্টিটিউটের জন্য জমি পাওয়া যায়। অধ্যাপক রহমান এর প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে অধ্যাপক মতিউর রহমান ‘দীর্ঘস্থায়ী ও দূরারোগ্য কিডনি সমস্যা প্রতিরোধে জনসাধারণের ভূমিকা’ নামের এ প্রকল্প কাজ করছেন। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে ক্রনিক কিডনি রোগের হুমকি বা প্রকোপ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
অধ্যাপক মতিউর রহমান অনেকগুলো বই ও গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি বেশ কিছু বই ও সাময়িকী সম্পাদনা ও প্রকাশনার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.