মিরসরাইয়ে উজাড় হচ্ছে পাহাড়ের সামাজিক বনায়ন

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পাহাড়ে সৃজিত সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে ধ্বংস করা হচ্ছে পাহাড়ি বনাঞ্চল। রাতের আধাঁরে উপজেলার বেশ কয়েকটি চক্র সংঘবদ্ধ হয়ে সামাজিক বনায়নের গাছগুলো কেটে ফেলছে। এরপর সুবিধাজনক সময়ে পাহাড়ি ছড়ার পানিতে ভাসিয়ে, গভীর রাতে পিকআপ, ট্রাক ভর্তি করে কাঠগুলো পাচার করে দেয়া হয়। পুলিশ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে চোরাই কাঠ বোঝাই দুয়েকটি ট্রাক আটক করলেও অধিকাংশ কাঠের ট্রাক পাচার হয়ে যায়।
জানা গেছে, ন্যাড়া পাহাড়ে বনাঞ্চল গড়ে তোলতে সরকার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বিভিন্ন মেয়াদের চুক্তিতে মিরসরাইয়ের পাহাড়ে উপকার ভোগীদের নিয়ে সামাজিক বনায়ন গড়ে তোলে। সামাজিক বনায়নের জন্য ১০-১৫ জনের গ্রুপ করে প্রকল্পগুলো গড়ে তোলা হয়।
সামাজিক বনায়নের অংশীদার মো.শহীদ নামে একজন জানান, প্রতি হেক্টর পাহাড় পরিষ্কার, গাছ লাগোনো ও গাছ গুলো বাঁচিয়ে তোলা পর্যন্ত একজন অংশীদারের প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। এরপর প্রতিবছর গোড়া পরিষ্কার ও গাছের যত্ন নিতে আরো অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু গাছগুলো বড় হয়ে উঠলে রাতের আধাঁরে কাঠ চোর চক্র গাছগুলো কেটে নিয়ে যায়। মিরসরাইয়ের করেরহাট, ফরেষ্ট, হিংগুলি বিট, জোরারগঞ্জ বিট, মিরসরাই ফরেষ্ট, বারৈয়ারঢালা ফরেষ্ট অফিসের আওয়াতাধীন বড়তাকিয়া বিট, ছোটকমলদহ বিটের অধীনের শত শত হেক্টর পাহাড়ের সামাজিক বনায়ন ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। জয়নাল আবদীন নামে এক অংশীদার জানান, পুলিশ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে দুয়েকটি চোরাই কাঠের ট্রাক আটক করলেও বেশভাগ সময় বিনা বাধাঁয় ট্রাক গুলো চলে যায়। সম্প্রতি মিরসরাই কলেজ রোড থেকে গামারী গাছের একটি ট্রাক ও হাদি ফকির হাট এলাকা থেকে চোরাই কাঠের একটি পিকআপ আটক করে পুলিশ।
করেরহাট, নয়দুয়ার, জোরারগঞ্জ, নিজামপুর, ওয়াহেদপুর এলাকার কয়েকটি পাহাড় ঘুরে দেখা গেছে, সামাজিক বনায়নে বেড়ে উঠা মাঝারি সাইজের আকাশমনি, গামারি, সেগুন, মেঞ্জুরীসহ বিভিন্ন গাছ কেটে বনায়ন প্রায় পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। নয়দুয়ার এলাকার পাহাড়ে সামাজিক বনায়ন এখন আর নেই বললেই চলে। স্থানীয়রা জানান, এলাকার এক প্রভাবশালী পরিবারের ছত্রছায়ায় প্রতি রাতেই পাহাড় থেকে কাটা হচ্ছে গাছ। আবার কোন কোন জায়গায় ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই পাহাড়ের এ গাছ কাটা সিন্ডিকেটে সক্রিয় রয়েছে। করেরহাট ইউনিয়নের সাইবেনীখিল ও নলখো পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানান গেছে, ওই এলাকা গুলোর পাহাড়ে থাকা সামাজিক বনায়নের গাছ প্রায় কাঠ চোরদের কুড়ালের আঘাতে শেষ হয়ে আসছে। প্রকাশ্যে দিনের বেলায় মাঝারি সাইজের গাছগুলো কেটে পাহাড়ি ছড়ার পানিতে ভাসিয়ে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া হয়। কখনও কখনও ট্রাক ভর্তি করে ওই গাছ পাচার করা হয়। শুধু গাছ চোর সিন্ডিকেট নয়, বন বিভাগের লোকজনও পাহাড় থেকে গাছ কেটে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
খইয়াছড়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হক মেম্বার জানান, অনেক চেষ্টা করেও পাহাড়ের সামাজিক বনায়ন রক্ষা করা যাচেছ না। স্থানীয় লোকজনকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিধন না করতে নানা ভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট একের পর এক গাছ কেটে ফেলছে। গাছ গুলো রক্ষা করতে না পারলে সরকারি রাজস্বের লোকসান হবে তেমনি চরম লোকসানের পড়বে উপকার ভোগী লোকজন।
বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সরোওয়ার উদ্দিন জানান, বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানের আওতায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর পাহাড় রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় এক হাজার পাঁচশ হেক্টর পাহাড়ে সামাজিক বনায়ন রয়েছে। বন রক্ষার জন্য ৬৩ জন সদস্য নিয়ে সিপিজি (কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপ) করা হয়েছে। তাদের পাহারার কারণে পাহাড়ের গাছ কাটা অনেকটা কমে এসেছে। তবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় সিন্ডিকেট চক্র অনেক গাছ কেটে রেখেছে বলে আমাদের কাছে খবর আছে। কিন্তু সিপিজি সদস্যদের পাহারার কারণে গাছগুলো পাচার করতে পারছে না।
বারৈয়ারঢালা রেঞ্জের আওয়াতাধীন বড়তাকিয়া বিট অফিসের কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবদুল মজিদ সামাজিক বনায়নের গাছ চোরাই চক্র মাঝে মধ্যে কেটে নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বড়তাকিয়া বিট অফিসে বিট কর্মকর্তাসহ লোকবল সংকট রয়েছে। ফলে বন পাহারা দিয়ে রাখা কষ্ট সাধ্য। এছাড়া সমামাজিক বনায়নের উপকার ভোগীরা তাদের বাগান পাহারা দেয়ার কথা থাকলেও তারা পাহারা দেয় না এবং বিট কর্মকর্তাদের কোন সহযোগীতা করেন না।
করেরহাট রেঞ্জ অফিসের সহকারি বন সংরক্ষন কর্মকর্তা (এসিএফ) হুমায়ন কবির জানান, সামাজিক বনায়নের গাছ কাটবে কেন? সামাজিক বনায়ন প্রকল্প উপকারভোগীরাইতো পাহারা দিয়ে রাখার কথা। বন বিভাগের লোকজনও পাহারা দেয়। সামাজিক বনায়নের গাছ কাটছে কিনা, কারা কাটতেছে এ সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে জানান।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.