ভেতরে-বাইরে সমস্যায় ইরান

নাগেহান আলসি

মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলনের ঢেউ কিছুটা হলেও আঘাত হেনেছে ইরানে। দেশটির নীতিনির্ধারণে এই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ইরানে কী হচ্ছে সম্ভবত এই প্রশ্নই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। যে বিােভ শুরু হয়েছে তা কি সত্যিই দেশটির অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিদ্রোহের আওয়াজ? অথবা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের ইন্ধনেই কি এই বিােভ? ২০০৯ সালের বিােভের সাথে চলমান এই বিােভের কি কোনো পার্থক্য আছে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই বিােভ কি কোনো বিপ্লবে রূপ নিতে যাচ্ছে?
এসব প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর পাওয়া সত্যিই কঠিন, তবে সবশেষ যা ঘটছে তার ওপর চোখ রাখলেই একটা উপসংহার টানা যায়। মূলত অর্থনৈতিক সঙ্কটকে কেন্দ্র করে এই বিােভ শুরু হয়েছে মাশাদ ও কোমের মতো গোড়া রণশীল শহরে। ইরান এই মুহূর্তে চরম বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভুগছে। ২০০৯ সালের বিােভের সূচনা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে। সংস্কারপন্থী রাজনীতিক মীর হোসেন মুসাভি এবং মেহেদি কাররোভি অভিযোগ আনেন যে, মাহমুদ আহমেদিনেজাদ কারসাজি করে নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। তারপরই ইরানের উত্তরাঞ্চলের বিত্তবান ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা রাস্তায় নেমে বিােভ শুরু করে।
এবার খোদ তেহরান পর্দার আড়াল থেকে একেবারে সামনের সারিতে এবং বিােভে অংশ নেয়ারদের বেশির ভাগই রণশীল তরুণ। একটি বিষয় লণীয়, ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিও সংস্কারপন্থী।
দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও রণশীলদের মধ্যে মতপার্থক্য বেশ স্পষ্ট। রুহানি বোঝানোর চেষ্টা করছেন, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পরিবর্তনের জন্যই এই বিােভ এবং বিােভকারীদের আরো ভদ্রভাবে বিােভ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। অন্য দিকে খামেনি বলছেন, বিােভ সরাসরি বিদেশী শক্তির ইন্ধনে ও হস্তেেপর সঙ্কেত দিচ্ছে। এই হস্তপে রুহানির বিরুদ্ধেও হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় করা পারমাণবিক চুক্তি ট্রাম্প প্রশাসন ভেঙে দেয়ার হতাশা থেকেই এই বিােভ বলে মনে হয় আমার কাছে। দীর্ঘ দিন অবরোধের মধ্যে থাকা ইরানিরা আশা করেছিলেন, পারমাণবিক চুক্তি করার মধ্য দিয়ে তারা বোধহয় মুক্তির দেখা পেলেন। কিন্তু আশা ভঙের হতাশাই এখন ফেটে পড়েছে বিােভ হয়ে।
অন্য দিকে কয়েক বছর ধরে চলছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রতিবেশী দেশটিতে কী হচ্ছে তা ইরানিরা ভালোই টের পাচ্ছেন। তাই আরব বসন্তের ঢেউ তাদের এখানেও আঘাত করে কি না সে ব্যাপারে তারা বেশ উদ্বিগ্ন।
অবশ্য আমি বলছি না, এই ঘটনায় কোনো বিদেশী হস্তপে নেই। দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চর সক্রিয় আছে এবং তারা এই বিােভ দীর্ঘায়িত ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের অন্যতম চাওয়া ইরানি সরকারের পতন। তারওপর যুক্তরাষ্ট্র এ বছর সৌদি আরবের কাছে ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র বিক্রি করেছে। সে চায় ইরান প্রথমে ভেতর থেকে দুর্বল হোক এবং পরে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ুক। যা হোক, আমরা এটাও বলছি না যে, বিােভ পুরোপুরি পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের ফল। ইরানে অবশ্যই বিােভ প্রতিবাদের মতো বিষয় ঘটছে এবং এই অপমানবোধ থেকেই ইরানিরা বিােভ করছে।
একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ রাশিয়া প্রভাব বিস্তার করায় গত কয়েক বছরে ইরান বেশ শক্তিশালী অবস্থানে গেছে। সিরিয়ায় রাশিয়া-ইরান ব্লকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি ব্লক কাজ করছে এবং এটি পরিষ্কার যে, শিয়া-সুন্নি মতবিরোধের সূত্র ধরে তারা মধ্যপ্রাচ্যের একটি নতুন বিন্যাস চায়।

ডেইলি সাবাহ থেকে ভাষান্তর করেছেন
মো: সাজেদুল ইসলাম
লেখক : নাগেহান আলসি, তুর্কি সাংবাদিক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.