দবির চাচার বাণিজ্যমেলা দর্শন

তারেকুর রহমান

দবির চাচা গ্রাম থেকে শহরে এলেন। সব কিছু তার কাছে অন্যরকম লাগছে। নতুন কিছু দেখলেই তাকিয়ে থাকে। চাচাকে ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।
চাচাকে বললামÑ চাচা, কাল তোমাকে বাণিজ্যমেলায় নিয়ে যাবো।
- মেলা! হ বাবা আমি যামু। কতদিন নাগর দোলায় উঠি না। একবার তোমার চাচীরে লইয়া...
- আরে চাচা এটা সেই মেলা না।
-তা অইলে কোন মেলা?
- এটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। এখানে নাগরদোলা নাই।
আচ্ছা, এহানে কি বাতাসা, লাড্ডু পাওয়া যাইবো? তোমার চাচীর লাইগা কিছু নিমু।
- না এখানে এসব পাওয়া যায় না। কালকে গেলেই দেখবে কী পাওয়া যায়।
সকাল বেলা দবির চাচা গোসল করে নতুন একটা লুঙ্গি পরে মেলায় যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বললেনÑ ভাতিজা, কই তুমি, বাহির অইবা না? দেরি অইয়া যাইতেছে তো!
- এইতো চাচা আমি রেডি। এখুনি বের হবো।
চাচাকে নিয়ে রওনা হলাম। গাড়িতে বসে চাচার কত প্রশ্ন মেলা নিয়ে। মাঝে মধ্যে বিরক্ত হয়ে যেতাম। আবার তার কৌতূহল দেখে অবাক হলাম। চাচাকে নিয়ে মেলায় প্রবেশ করলাম।
- ভাতিজা, এইডা কিতা?
- এটা ওয়াশিং মেশিন।
- কী মেশিন?
-ওয়াশিং মেশিন।
-এইডা দিয়া কী অয়?
- এটা দিয়ে জামাকাপড় পরিষ্কার করা হয়।
- কি কও এসব! আমরা তো গেরামে পুকুরের সিঁড়িতে পিডাইয়া কত সোন্দর কইরা জামা ধুই।
-চাচা, শহরে তো পুকুর নাই। সিঁড়িও নাই। তাই এসব ব্যবহার করা হয়।
চাচার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বেশ বিরক্ত হয়ে উঠলাম।
-ভাতিজা, এই টিভিটার দাম কত অইবো?
- আহা! এটা টিভি না এটা ওভেন।
-তুমি কইলেই অইবো? আমি টিভি চিনি না?
-হা হা। এটার নাম ওভেন। এখানে খাবার গরম করা হয়।
আমার কথা শোনে চাচার সব ওলটপালট মনে হতে লাগলো। ওয়াশিং মেশিন, আবার কিসের ওভেন এগুলো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আর কিছুই বলছে না।
-চাচা, রাগ করলেন নাকি?
- না, রাগ করুম কেন? তোমারে অনেক বিরক্ত করতেছি। মনে কিছু নিও না বাবা।
- আরে না। কি যে বলেন চাচা।
-আচ্ছা ভাতিজা, ও সময় কি মিশিন বলছিলা?
-ওয়াশিং মেশিন।
-এটা কি ওই মিশিনের ছোড সাইজডা?
-হা হা,না এটা হলো ব্লেন্ডার।
চাচা আমাকে আর কিছু বলতে দেয়নি। মনে হচ্ছে আমার কোনো উত্তরই তার পছন্দ হচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখি চাচা নেই। খুব ভয় পেয়ে গেলাম। এত মানুষের মধ্যে তাকে কোথায় খুঁজে পাবো। দূরে একটা জামা কাপড়ের দোকানের সামনে চাচা দাঁড়িয়ে আছে।
- আরে...আপনে এখানে? আমি আপনেরে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেছি।
-পোলাডার জন্য একটা জামা কিনুম। হের লাইগা এইখানে একটা শার্ট দেখতে দাঁড়াইছি।
-আহা চাচা, এটা ছেলেদের শার্ট না। এটা মেয়েদের শার্ট।
-কী কইতাছো এই সব!
- হুম, এগুলো মেয়েদের শার্ট।
কিছুণ ঘোরাফেরা করার পর চাচা আমাকে বললেনÑ ভাতিজা, বাসায় চইল্যা যামু।
- এখানে ভালো লাগে না?
- না।
-কেন?
-আমাগো ওই দিকে মেলায় নাগরদোলা থাকে, মৃত্যুকূপ খেলা থাকে, বাতাসা, লাড্ডু আরো কত কিছু থাকে। ওইখানে সবার মধ্যে অন্যরকম আনন্দ দেখি। কিন্তু তোমাগো এখানে মেলায় আমার কাছে সব উল্টাপাল্টা লাগে। আমাগো গেরামের মেলার সেই আনন্দ এইখানে পাইতাছি না।
দবির চাচার কথা শোনার পর কোনো কথাই বলতে পারছিলাম না। গ্রামের মানুষ কত সহজ সরল হয়। তাদের উপলব্ধি কত সুন্দর। আর দেরি না করে চাচাকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.