সাংবাদিককে হত্যার হুমকি ডিআইজি মিজানের
সাংবাদিককে হত্যার হুমকি ডিআইজি মিজানের

এবার সাংবাদিককে হত্যার হুমকি সেই ডিআইজি মিজানের

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দিলেন ডিআইজি মিজান। বুধবার রাতে তিনি একজনকে ফোন করে এই হুমকি দেন। একই সাথে তিনি সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল দেন। বিষয়টি সম্পর্কে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। এ দিকে, মিজানের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি জব্দ করার দাবি উঠেছে। না হলে যেকোনো ধরনের অঘটন ঘটাতে পারেন বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এক নারীকে জোর করে অস্ত্রের মুখে বিয়ে এবং পরে তার ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক যুগান্তরের সাংবাদিক নেসারুল হক খোকনকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন ডিআইজি মিজানুর রহমান। গত মঙ্গলবার রাতে এক নারীর সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে মিজান খোকনের নাম উল্লেখ করে এই হুমকি দেন। আবদুল্লাহ তুহিন নামের আরো এক সাংবাদিককে ডিআইজি হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি সম্পর্কে রাতেই জানতে পারেন ওই সাংবাদিকদ্বয়।

এ দিকে, এই দুই সাংবাদিককে হুমকির বিষয়টি গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে অবহিত করা হয়। ডিআইজি মিজান যে হুমকি দিয়েছেন তার অডিও শোনানো হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। নেসারুল হক খোকন জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তাকে বিষয়টি অবগত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওই পুলিশ কর্মকর্তার হুমকির অডিও রেকর্ডটি শুনেছেন। বলেছেন, ‘খোকন টেনশন করবেন না, আমি বিষয়টি দেখছি।’

এ দিকে, ক্র্যাবের দুই সদস্যকে হুমকি প্রদানের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। ক্র্যাবের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারীকে জোর করে বিয়ে ও তার ওপর নির্মম নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারের জেরে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সদস্য, ক্র্যাব বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার নেসারুল হক খোকন এবং যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি আবদুল্লাহ তুহিনকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ক্র্যাব। পাশাপাশি হুমকিদাতা ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার পদ থেকে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ডিআইজি মিজানুর রহমানের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়েছে।

ক্র্যাব সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার আলম ঘটনাকে ন্যক্কারজনক উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘সংবাদ প্রচার-প্রকাশ করায় পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান ৯ জানুয়ারি রাতে দু’জন পেশাদার সাংবাদিককে ফোন করে গুলি করে হত্যার যে হুমকি দিয়েছেন, তা শুধু অপেশাদার আচরণই নয়- রীতিমতো ক্ষমতার অপব্যবহার, ধৃষ্টতা এবং সীমা লঙ্ঘনের শামিল। বিষয়টি প্রচলিত আইনে ফৌজদারি অপরাধ। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকেরা যে পুলিশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন- এ ঘটনা তার আরেকটি জ্বলন্ত প্রমাণ।’

এ ছাড়া যে দুই সাংবাদিককে হুমকি দেয়া হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ডিআইজি মিজানুর রহমানের লাইসেন্সকৃত ব্যক্তিগত পিস্তলটি পুলিশের হেফাজতে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নেতারা।

ডিআইজি মিজানের যত কাণ্ড

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) পদ থেকে মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে মরিয়ম আক্তার ইকোকে বিয়ে এবং তার ওপর নির্মম নির্যাতন করার অভিযোগে মিজানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক এই ব্যবস্থা নেয়া হয়। বর্তমানে তাকে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে।  মঙ্গলবার রাজারবাগে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তার বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আমরা তাকে ডিএমপি থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করেছি।’ পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মিজানের বিষয়ে তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে বলে জানান তিনি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মিজানের বিষয়ে পুলিশের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে কি না এমন প্রশ্ন করা হলে আসাদুজ্জামান কামাল বলেন, ‘কেন হবে না’। এ দিকে এর আগের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনের ব্যত্যয় যেকউ ঘটাক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অভিযোগকারী মরিয়ম আক্তার ইকো বলেছেন, ব্যাংকে চাকরির জন্য বান্ধবীর পরিচিত জনৈক মহিলার মাধ্যমে মোবাইল ফোনে মিজানের সাথে প্রথম পরিচয় হয় ইকোর। এরপর থেকে খোঁজখবর নেয়ার জন্য প্রায়ই ফোন দিতেন মিজান। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই অশোভন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা এবং রহস্যময় আচরণ শুরু হলে পুলিশ কর্মকর্তা মিজানকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন ইকো। এতে ক্ষীপ্ত হয়ে প্রতারণা ও জবরদস্তির আশ্রয় নেন ডিআইজি মিজান।

ভুুক্তভোগীর অভিযোগ, গত ১৪ জুলাই মিজান তাকে ফোন দিয়ে বলেন নিজের আচরণের জন্য তিনি খুবই দুঃখিত, ক্ষমাপ্রার্থী। ইকো এতে ক্ষমা করে দিলে মিজান বলেন, তিনি একটিবার সাক্ষাৎ করে সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করতে চান। এতে রাজি না হওয়ায় হুমকি দেয়া শুরু করেন পুলিশ কর্মকর্তা। জানান, সাক্ষাৎ করতে না এলে তিনি ইকোর বাসায় আসবেন। ফোন ট্রাকিংয়ের মাধ্যমে ইকোর ব্যক্তিগত বিভিন্ন কথাবার্তা ও যাবতীয় তথ্য তার কাছে আছে বলেও ইঙ্গিত দেন মিজান।

বাধ্য হয়ে ইকো পান্থপথের বাসা থেকে বের হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে দেখা করতে গেলে কৌশলে তাকে প্রাইভেট কারে উঠিয়ে পূর্বাচলে নিয়ে যান ডিআইজি মিজান। সেখানে ৩০০ ফুট সড়কের পাশে নামিয়ে মরিয়মকে মারধর করা হয়। পরে আহতাবস্থায় চোখ বেঁধে গাড়িচালক গিয়াস ও দেহরক্ষী জাহাঙ্গীরের সহায়তায় বেইলি রোডের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চার মাস ধরে চলতে থাকে নির্যাতন।

ইকো বলেছেন, ওই দিন মার খেয়ে আমি শক্তিহীন হয়ে যাই। তিনি নিজেও কন্ট্রোলের বাইরে চলে যান। ভয়ে আমিও আর কোনো কথা বলতে সাহস করিনি। এ অবস্থায় তিনি দুইজন লোককে ফোন করেন। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন আমার বিয়ের উকিল বাপ ডিআইজি মিজানের গাড়িচালক গিয়াস উদ্দিন এবং অন্যজন হচ্ছেন তার বাসার গৃহকর্মী কনস্টেবল জাহাঙ্গীর। তাদের দুইজনকে বারিধারার একটি স্থানে আসতে বলেন। এ সময় গিয়াস চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। গিয়াস বলছিলেন স্যার আমার জ্বর। এরপর মিজান বলেন, তোমার জ্বর থাক আর যাই থাক তোমাকে আসতেই হবে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তোমাকে আসতেই হবে। জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আস। ওই অবস্থায়ই একজন একটি মোটরসাইকেলে গিয়াসকে নামিয়ে দিয়ে যায়। ডিআইজি মিজান বারিধারায় গিয়ে গিয়াসকে গাড়ি চালাতে দিয়ে পেছনের সিটে আসেন। একই সময় জাহাঙ্গীরও সেখানে উপস্থিত হয়। ওদের দুইজনকে দেখে আমার একটু সাহস হলো। ইকো সাংবাদিকদের বলেন, তাদের সামনেই বললাম, আমাকে ছেড়ে দেন। এরপর উত্তেজিত হয়ে ওড়না দিয়ে আমার মুখ বেঁধে ফেলেন ডিআইজি মিজান। তাদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে আমার মনে হয়েছে পুরোটাই একটি নেটওয়ার্ক ছিল। সেখান থেকে সরাসরি বেইলি রোডের বেইলি রিজের অ্যাপার্টমেন্টের (লিফটের ৪-এ এম-৪) বাসায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা।

ইকো বলেন, আমি নিজেই ওড়নার বাঁধন খুলে জিজ্ঞেস করলাম আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? ডিআইজি মিজান বললেন, কোনো সমস্যা নেই এটি আমার বাসা। খালাম্মা (ইকোর মা) এলে তুমি চলে যাবে। ইকো বলেছেন, ভয়ে আমি আর মাথা গরম করিনি। বাসায় গিয়ে বুঝলাম এটি পূর্বপরিকল্পিত।

তখন আমার মধ্যে এক ধরনের ভয় এলো। আর বারবার মনে হচ্ছিল ডিআইজি মিজান নিজে সেফ হওয়ার জন্য উল্টাপাল্টা কিছু একটা করে ফেলতে পারে। তখন চিৎকার শুরু করলাম। কিন্তু আমাকে কেউ সাহায্য করতে আসেনি। আমি প্রচণ্ড সিনক্রিয়েট করলাম। যাতে বিরক্ত হয়ে আমাকে বের করে দেয়। তখন গিয়াস আমার ডান হাত ধরে আছে, জাহাঙ্গীর আমার বাম হাত ধরে রাখে। এ অবস্থায় উনি (ডিআইজি মিজান) উড়ে এসে আমাকে মারতেছেন। আমি বাস্টার্ড বলে গালি দেয়ায় তিনি আমাকে এভাবে মারেন। শারীরিক নির্যাতনে আমি অনেকটা অজ্ঞানের মতো হয়ে যাই। তাদের আমি বললাম, একটি মেয়েকে আপনারা তিনজনে মিলে মারতেছেন, লজ্জা করে না আপনাদের? মাইর খেয়ে মনে হয়েছে অনেক ক্ষোভ ছিল আমার ওপর। বিয়ের পরও অনেক মার খেয়েছি। এখনো জানতে ইচ্ছে করে, কেন এত ক্ষোভ ছিল আমার ওপর।

ইকো সাংবাদিকদের বলেছেন, রাত ১২টার দিকে ডিআইজি মিজানের বন্ধু বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ডা: গাজী শামিম হাসান ওই বাসায় হাজির হন। তিনি আমাকে বোঝাতে শুরু করেন। বলেন, আমার দোস্ত অনেক রাগী। আপনার সাথে মিসবিহেভ করেছে। সে আসলে আপনাকে অনেক লাভ করে। আমি বললাম, ঠিক আছে মানুষ মানুষকে লাভ করতেই পারে। তার মানে এই নয় যে জোর করে ভালোবাসা আদায় করতে হবে। ভালোবাসার দরজা থাকবে আলাদা। এটা কী করা হচ্ছে। আপনার ক্ষমতা আছে বলেই আপনি তুলে নিয়ে আসবেন? বাই দিস টাইম তিনি (অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মিজান) স্ট্রোক করার মতো একটা নাটক করলেন। তিনি পড়ে গেলেন। এরপর গাজী শামিম হাসানকে বললাম, ঠিক আছে উনি আমাকে লাভ করেন। উনাকে আম্মার সাথে কথা বলতে বলেন। আমাকে বাসায় দিয়ে আসেন।

আমার সাথে যা করা হয়েছে তার কিছুই বলব না। এর মধ্যে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন আমাকে সুস্থ করার কথা বলে ওষুধ খাওয়ানো হয়। এরপর আর আমার সেন্স ছিল না। পরদিন ১২টা বা ১টার দিকে সেন্স আসার পর দেখতে পাই আমি তার (ডিআইজি মিজান) বেডরুমে। আমার যে সালোয়ার-কামিজ পরা ছিল সেটি নেই। তার স্লিপিং ড্রেস পরা। এটা দেখার পর আবারো আমার মাথা গরম হয়ে যায়। তখন বাসায় গিয়াস ও জাহাঙ্গীরকে ডেকে বললাম, এই তোমাদের স্যার কোথায়? আমার ড্রেস কে চেঞ্জ করেছে? ওরা ফোন দিয়ে তাকে জানায়। তিনি হয়তো ডিএমপিতেই ছিলেন। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই চলে এসে আমাকে বলতেছেন, বি কুল। আমিই ড্রেস চেঞ্জ করেছি। বিকজ তোমার অবস্থা ভালো ছিল না। রেস্ট নেয়ার জন্য আমি চেঞ্জ করেছি।’

ইকো বলেন, ‘এরপর তো একটা মানুষ আর স্বাভাবিক থাকবে না। আই ওয়েন্ট টু গো ফর সুইসাইড। আমি আর বাঁচতে চাই না। বাসায় যাওয়ারও দরকার নেই। মারা গেলেই বেটার। আমি সুইসাইড করার জন্য গ্যাসের চুলায় নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এ সময় ওড়না জ্বলে যায়। প্রচণ্ড চিল্লাচিল্লি করলাম। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে যে, সামথিং হ্যাপেনড দ্যাট নাইট। বাসায় আসার সাথে সাথে তিনি আমার কাছে মাফও চান। বলেন, আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি তোমার আম্মার সাথে কথা বলব। তো আমি বললাম আমার কতটুকু ক্ষমতা আছে আমি আপনাকে মাফ করব। ক্ষমতাটাও তো আমার লিমিটের মধ্যে থাকতে হবে। আম্মুকে ট্যাক্টফুলি তিনি ডাকেন। ক্ষমা চান।

আবার আম্মুকে হুমকি দিয়ে বলেন যে, আপনি যদি এটি বাইরে বলাবলি করেন তাহলে অনেক খারাপ হবে। আপনার নেতৃত্বও চুকিয়ে দেবো। ঢাকা শহরে একটা এসপি চাইলেই অনেক কিছু করতে পারে। আর আমি তো ডিআইজি মিজান, আমি অনেক কিছু করতে পারি। হুমকির ভয়ে আম্মা কোনো কিছু বলতেও পারছিলেন না। ১৫ ও ১৬ জুলাইও আমি সেখানে। ১৬ জুলাই আমি কৌশলে আম্মুর সাথে কথা বলার কথা বলে খালুকে (কৃষক লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা) ফোন করি। তখন একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ওর কাছে ফোন আসে। খালামণিও (একজন সংসদ সদস্য) ফোন করেন। এরপর তিনি একটু ভয় পান। এরপর তাৎক্ষণিক তিনি আম্মুকে ফোন করে বলেন ঠিক আছে, খালাম্মা আমি ওকে নিয়ে আসছি। আধা ঘণ্টা পর আবার মত পরিবর্তন করে বলেন- আসলে খালাম্মা ওখানে (ইকোর বাসা) বসে কথাবার্তা বলাটা ঠিক হবে না। আমার অনেক দোষ আছে আপনি আমার ফ্ল্যাটে আসেন, আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। তখন আম্মু বলেন, না আমার গাড়ি আছে তোমার গাড়ি পাঠাতে হবে না। পান্থপথের বাসা থেকে তার গাড়ি ফেরত আসে। তার আরেক ড্রাইভার জিহাদ ওই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল।

পরে আমাদের গাড়ি নিয়েই আম্মু আসেন। এর আগে তিনি গেটে বলে রাখেন, সরকারি কর্মকর্তার বাসায় কেউ যেতে হলে মোবাইল নিয়ে যাওয়া যায় না। সেভাবেই গেটের সিকিউরিটি আম্মুকে বলে ফোন রেখে যাওয়ার জন্য। তিনিও ফোন রেখে বাসায় ঢোকেন। ওইখানে তিনি শাড়ি, নাকফুল, চুড়ি, গয়না রেডি করে রাখেন। এ বিষয়টি আমিও জানি না। আম্মু আসার পর তাৎক্ষণিক তার ব্যবহার পরিবর্তন করে বলেন- নো আপনার মেয়ে এখান থেকে যেতে পারবে না। বিয়ে হবে। আপনার মেয়েকে হয় সেটেল্ড করে যেতে হবে, না হয় আপনার মেয়ের লাশ বের হবে। এ কথা শুনে আম্মু হতবাক। আম্মু বললেন, এটা কী? এখানে বিয়েশাদির প্রশ্ন আসতেছে কেন? আমার জানা মতে তোমার যে বয়স স্ত্রী-সন্তান থাকার কথা। তারা কোথায়? তখন ডিআইজি মিজান বলেন, না তারা কেউ নেই।

তখন আম্মু আবার বলেন, তোমার স্ত্রী-সন্তান নেই ভালো কথা; কিন্তু এভাবে কি তুমি একটা মেয়েকে তুলে আনতে পার? এ কথার জবাবে ডিআইজি মিজান বলেন, হ্যাঁ আমি পারি। আপনারা বিষয়টাকে না প্যাঁচিয়ে সমস্যাটা সমাধান করেন। এ কথা বলে তার আর্মসটা দম করে টেবিলের ওপর রাখেন। তখন আমার মধ্যে ভয় লাগে। ভাবছিলাম, এখন মা-মেয়ে দু’জনই তো তার কৌশলে ফ্ল্যাটে বন্দী হয়ে গেছি। এখন কোনো উপায় নেই, বেরও হতে পারব না। তখন আমি বললাম, ওকে হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? তিনি বললেন, চল বিয়ে করে ফেলি। এবার যাতে তিনি বিয়েতে রাজি না হন সে জন্য আমিই বললাম, বিয়ে করতে চান তো? কাবিন দেবেন এক কোটি টাকা। আমার ধারণা ছিল সরকারি কর্মকর্তা এক কোটি টাকা দিয়ে বিয়ে করতে চাইবেন না। তিনি বললেন, না এক কোটি টাকা নয় ৫০ লাখ টাকা কাবিন। এর বাইরে একটা কথা বললে দুইজনের লাশ ফেলে দেবো। এ কথা বলে আবার দাঁড়িয়ে যান। এবার আমি ভয় পাই এ কারণে যে, হয়তো এখন আম্মুসহ আমাকে হেনস্তা করবে।

ওই দিন আমাদের লাইফটাই দরকষাকষির মধ্যে চলে যায়। দরজা বন্ধ, নিচে সব জায়গায় মেকানিজম করা। সব ফোন কন্টাক্ট বন্ধ। এ অবস্থায় ডিআইজি মিজানের খাঁচায় বন্দী হয়ে আম্মুকে আমি সেভ করতে চেয়েছি, আম্মু আমাকে সেভ করতে চেয়েছেন। মগবাজার কাজী অফিসের কাজী ডেকে বিয়ে পড়ানো হয়। দুইজন কাজীর মধ্যে একজনের নাম ছিল নূর হোসেন। কাবিনের কোনো কপি দেয়া হয়নি ইকোকে। একটি রসিদ দেয়া হয়েছে মাত্র।

ওই নারীর অভিযোগ, প্রায় চার মাস সংসার করার পর ফেসবুকে স্বামী পরিচয় দিয়ে মিজানের একটি ছবি তোলার পর মিজান তাকে নানাভাবে নির্যাতন শুরু করেন। দু’টি ‘মিথ্যা মামলা’ দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে জামিনে তিনি বেরিয়ে আসেন। তার বিরুদ্ধে মিজানের সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়। আর এই মামলায় এক মাসের মধ্যেই চার্জশিট দেয় পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে তাকে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই সহায়তা করে আসছেন। যে কারণে থানা পুলিশ মাত্র এক মাসের মাথায় ওই নারীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় চার্জশিট দেয়। তবে মিজান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ওই নারী একজন প্রতারক।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.