পরিবার একটি নিরাপদ জায়গা, যা জটিল সমাজে স্থিরতা আনে : মাহাথির
পরিবার একটি নিরাপদ জায়গা, যা জটিল সমাজে স্থিরতা আনে : মাহাথির

পরিবার একটি নিরাপদ জায়গা, যা জটিল সমাজে স্থিরতা আনে : মাহাথির

নয়া দিগন্ত অনলাইন

আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্র মালয়েশিয়ার রাজনীতির মাঠ এখন উত্তাল। সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় এখন আন্দোলন চলছে। এমতাবস্থায় আবার দৃশ্যপটে এসেছেন অত্যাধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মালয়েশিয়ার রূপকার-জনক-স্থপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ।

মাহাথিরের চিন্তাধারাই আসলে অসাধারণ। যেমন- পরিবার সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘ প্রত্যেকের নিজ পরিবার একটি নিরাপদ জায়গা - যা আমাদের এই জটিল সমাজে স্থিরতা আনে।’

ইসলাম সম্পর্কে ‘এ নিউ ডিল ফর এশিয়া’ গ্রন্থে মাহাথির বলেন, ‘ইসলাম ধর্ম আমাদের জীবনের অংশ। একে পরিত্যাগ করার কোনো কারণ নেই। সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হলে ধর্ম কখনই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বাধা হতে পারে না। ইসলামের শিক্ষা সমসাময়িক সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে নিতে হবে। ইসলাম শুধুমাত্র সপ্তম শতাব্দীর ধর্ম নয়। ইসলাম অবশ্যই সর্বকালের ধর্ম।’

‘ইগো’ ভুলে আনোয়ারের দুয়ারে যাবার সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন-‘আনোয়ার যেখানে কিছু মনে করছে না, সেখানে অন্যদের অতীত নিয়ে পড়ে থাকার কোনো মানে নেই। পাস্ট ইজ পাস্ট। মালয়েশিয়ার মহামান্য রাজা যদি আনোয়ারকে ক্ষমা করেন, তবে তিনি তাকেই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দেবেন।’ 

২০১৩ সালে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন আব্দুর রাজাকের অসংখ্য দুর্নীতি এবং বিরোধী দলের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন বাড়ানোর অভিযোগে দেশটিতে বিতর্কিত। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে কিংবদন্তী পুরুষ মাহাথির এই ইউএমএনও’র প্রধান হিসেবেই টানা ২২ বছর দেশ শাসন করেছেন। অন্যদিকে- দ্বিতীয় দফায় সমকামিতা ও দুর্নীতির অভিযোগে আরো ৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন মালয়েশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় বিরোধী দলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম।

এমতাবস্থায় ২০১৮ সালের আগস্টে দেশটিতে অনুষ্ঠিতব্য ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে ইউএমএনও দলের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোট বারিসান ন্যাশনালের বিরুদ্ধে জয় পেতে মাহাথিরের ভক্তদের সমর্থন খুব বেশি দরকার পাকাতান হারাপানের। আপাতদৃষ্টিতে পাকাতান হারাপানের জন্য জয় এই মুহূর্তে কাম্য মূলত দু’টি কারণে- ১. দুর্নীতির দায়ে সমালোচিত নাজিব রাজাককে ক্ষমতা থেকে সরানো; ২. আনোয়ারের মুক্তি।

মাহাথির মোহাম্মদ গণমানুষের ডাকে শেষ কারিশমা দেখাতে ৯২ বছর বয়সেও নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হচ্ছেন। প্রধান বিরোধী দলীয় জোট পাকাতান হারাপানের প্রধান নেতা হচ্ছেন আনোয়ার ইব্রাহিম, তাতে যোগ দিয়েছে মাহাথিরের দলও। ইতোমধ্যে মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী ও আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রী ওয়ান আজিজাহকে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদের জন্য মনোনয়ন দিয়েছে জোট। এই লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে শেষ খেলাটা দেখাতে চলেছেন দেশনায়ক মাহাথির।

প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মনোনয়নের মূল ক্ষমতা আনোয়ার ইব্রাহিমের হাতে। তাকে বিনা অপরাধে জেল খাটানো মাহাথিরকে তিনি তার জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের অতীত কষ্টের কথা ভুলে মাহাথিরকেই প্রার্থী হিসেবে মেনে নিয়ে ব্যক্তির চেয়েও দল বড় আর দলের চেয়েও দেশ বড়- এটিই কাজে প্রমাণ করেছেন আনোয়ার।

সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী মাহাথির ও আনোয়ার ইব্রাহীম দুইজনকেই মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে ‘হেভিওয়েট’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ধরা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুইজনের ঐক্যের প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য চিন্তার কারণ বা অশনি সংকেত। এক সময় শত্রুতা করলেও সম্প্রতি জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত হয়ে যান উন্নয়নের জন্য মালয়েশিয়ার কিংবদন্তীতুল্য নেতা মাহাথির।

টলমল চোখে মাহাথির বলেন, ‘গত ২০ বছরে তার পরিবার অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছে। আমি তাদের অনুভূতিটাও বুঝতে পারছি। আনোয়ার আমাদের দেশের জন্য করা সংগ্রামকেই প্রাধান্য দিয়েছে। আমি তার কাছে ঋণী’। জোটের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, নির্বাচনে জিততে পারলে তাদের সরকারের প্রথম কাজ হবে আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করা এবং এর মাধ্যমে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ খুলে দেয়া।

 মাহাথির মোহাম্মদ ১৬ জুলাই ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছরের নিরলস পরিশ্রমে মালয়েশিয়ার আপাদমস্তক বদলে দিয়েছিলেন। আমজনতার চোখে তিনি এখনো উন্নয়নের প্রাণপুরুষ, নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি দেশগড়ার কারিগর। ২০০৩ সালের ৩০ অক্টোবর অবসর নেয়ার পর ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে মালয়েশিয়ায় এসেছেন আরো দু’জন প্রধানমন্ত্রী। দুু’জনের শাসনামলে দেশ আগের থেকে পিছিয়েছে।

৫ম প্রধানমন্ত্রী আব্দুল্লাহ বাদাউইর বেশ বদনাম প্রচলিত রয়েছে জরুরি সকল বৈঠকে ঘন্টা ধরে ঝিমুনোর। ৬ষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ওয়ানমালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে ২০০৯ সাল থেকে ভুগছেন, আন্দোলনকারীদের অবিরত সমালোচনার কারণে নাগিব রাজাক তাই বিদ্রোহী-দমনেই বেশি ব্যস্ত।

এ দুইজনের অযোগ্যতার কথা তুলে ধরে মাহাথির বলেন, ‘পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী আসলে হওয়া উচিত ছিলো আনোয়ারেরই।’ মাহাথির তার অতীত সকল ‘রাজনৈতিক ভুলের’ জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। এখন দেখা যাক নির্বাচনে জিতে বিশ্বের প্রবীণতম সরকারপ্রধানের তকমা নিতে পারেন কিনা মাহাথির কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় কিনা আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্যও।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.