উচ্চশিক্ষিত হয়েও বিনা বেতনে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় শিক্ষকতা করতে হচ্ছে শাহ আলম ও আবু তাহেরের মতো অনেককে
উচ্চশিক্ষিত হয়েও বিনা বেতনে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় শিক্ষকতা করতে হচ্ছে শাহ আলম ও আবু তাহেরের মতো অনেককে

আমার ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা

ইবতেদায়ি শিক্ষকদের কথা
মেহেদী হাসান

মাওলানা মো: আবু তাহের টাঙ্গাইলের মধুপুরে বানিয়াবাড়ী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক। জাতীয়করণের দাবিতে জাতীয় প্রেস কাবের সামনে আমরণ অনশন করছেন তিনি। আবু তাহের জানান, তার মাদরাসা থেকে পাস করা একজন ছাত্রী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হয়েছেন। তার নাম খালেদা আক্তার। এ ছাড়া তার মাদরাসা থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাস করা ১০ জন শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। তিনি আমরণ অনশনে এখানে আছেন শুনে তারা তাকে দেখতে এসেছিল গত বুধবার।

২৪ বছর ধরে বানিয়াবাড়ী ইবতেদায়ি মাদরাসায় বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন আবু তাহের। গত বছর তাদের মাদরাসা থেকে ৩১ জন শিক্ষার্থী সমাপনী পরীক্ষা দেয় এবং তাদের মধ্যে ১৬ জন বৃত্তি পায়। আবু তাহের দাবি করেন সারা দেশে যত ইবতেদায়ি মাদরাসা রয়েছে তাদের মধ্যে সেরা ফলাফল করেছে এ মাদরাসাটি। ২০১৫ সালেও ১০ জন বৃত্তি লাভ করে।

আবু তাহের আফসোস করে বলেন, আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে অনেক বড় পদে কিন্তু আমরা কোনো বেতন পাই না।

আবু তাহের জানান, সরকার যদি আমাদের বেতন দিত তাহলে সারা দেশের মধ্যে বানিয়াবাড়ী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসাকে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারতাম। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা বেতনহীন কষ্টকর জীবনযাপনের কারণে তা বাস্তবায়ন করতে পারি না।

কামেল পাস আবু তাহের বলেন, একদিন জাতীয়করণ করা হবে এই আশায় থাকতে থাকতে ২৪টি বছর পার হয়ে গেল। সব সরকারের আমলেই আমাদের আশা দিয়েছে কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। বেতনভাতাহীন প্রধান শিক্ষক আবু তাহের ইমামতি করে সামান্য যে টাকা পান তাই দিয়ে কোনো মতে সংসার চালান।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ইবতেদায়ির শিক্ষক : মাওলানা মো: শাহ আলম কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কুরআনের তাফসির বিষয়ে মাস্টার্স পাস করেছেন। ২০ বছর ধরে তিনি বিনা বেতনভাতায় শিক্ষকতা করে আসছেন যশোর সদরে অবস্থিত জয়ান্তা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায়। ২০১৫ সালে তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকে পরিদর্শন অফিসার পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। শুরুতে বেতন ছিল ১৯ হাজার টাকা। মানিকগঞ্জ শাখায় তার যোগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি যোগ দেননি। শিগগিরই মাদরাসা জাতীয়করণ করা হবে এই আশায় তিনি মাদরাসার চাকরি ছাড়েননি।
অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিলেন শাহ আলাম। মাদরাসায় শিক্ষকতা ছাড়া আর অন্য কোথাও তিনি চাকরির চেষ্টা করেননি বলে জানান।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেও (প্রাইভেট) কেন বিনা বেতনে বছরের পর বছর পড়ে আছেন জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, শিক্ষকতাই তার পছন্দ। মানুষকে দ্বীনি এলেম শিক্ষা দিতে তার ভালো লাগে।

বিনা বেতনে ৩৬ বছর : মো: রফিকুল ইসলাম মতি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে দশাশিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় ৩৬ বছর ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন। বিনা বেতনে দীর্ঘ চাকরি জীবনের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রফিকুল ইসলাম মতি। তিনি বলেন, সরকারি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি নিতে পারতাম। পুলিশেও চাকরির সুযোগ হয়েছিল কিন্তু যাইনি। কারণ মাদরাসাটি আমি প্রতিষ্ঠা করেছি। সব সরকারের সময় আমাদের আশা দিয়েছে জাতীয়করণ করা হবে, এমপিও হবে। কিন্তু কেউ করল না। ১৯৮৭-৮৮ সালে বর্তমান গাউসুল আজম জামে মসজিদ যেখানে রয়েছে সেখানে একটি সমাবেশে এরশাদ সাহেব আমাদের বলেছিলেন সবাইকে মাসে সাড়ে ৭০০ টাকা করে ভাতা দেবেন। কিন্তু পরে আর তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর বিএনপি সরকারের সময়ও আমাদের আশা দেয়া হয়েছে বেতন হবে, জাতীয়করণ হবে। কিন্তু হলো না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বারবার আমাদের আশা দেয়া হয়েছে বেতনের বিষয়ে। এভাবে আশায় আশায় জীবনটা শেষ হয়ে গেল।

রফিকুল ইসলাম বলেন টাকার অভাবে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারছি না। বড় ছেলে এসএসসি পাসের পর পড়া বন্ধ করে কাজ শুরু করে। এক মেয়ে এইচএসসি পাসের পর বিয়ে দেয়ায় পড়া বন্ধ করে। আর ছোট মেয়ে এবার জেএসসি পাস করেছে। বড় আশা ছিল ছেলেকে ডাক্তারি পড়াব। কিন্তু ডাক্তারি তো দূরের কথা পড়ালেখাই করানো গেল না। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন আমরা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সব বইয়ের পাশাপাশি মাদরাসার বইও পড়াই। কিন্তু এত পরিশ্রমের পরও আমরা কোনো বেতন পাই না।

মো: আবদুল মান্নান লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার টাকুয়ারচর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় গত ২৩ বছর ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন। আবদুল মান্নান ক্ষোভে দুঃখে বলেন, দাবি পূরণ না হলে এবার আর বাড়ি যাব না। বাড়ি গিয়ে কি করব? তার চেয়ে এখানে মরে যেতে রাজি কিন্তু খালি হাতে আর বাড়ি ফিরতে চাই না।
মো: আব্দুর রহমান নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গোদারিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় ২৭ বছর ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন। মাহবুব উর রহমান বরিশাল জেলার মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার চরউদয়পুর মুসলিম আখন্দ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় ১৯৮৩ সাল থেকে শিক্ষকতা করছেন। তিনি এ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা।

মাদরাসা বোর্ড কর্তৃক রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত সব স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণের দাবিতে গত ১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। এরপর গত ৯ জানুয়ারি থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন তারা।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ১৯৮৪ সালে ১৮ হাজার ১৯৪টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার রেজিস্ট্রেশন দেয়। এরপর ১৯৯৪ সালে একটি পরিপত্র জারি করে সরকার। সেই পরিপত্রে সরকার দেশের সব রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেয়ার কথা ঘোষণা করে। একই পরিপত্রে সরকার দেশের প্রতি ইউনিয়নে একটি করে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদেরও মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা নির্ধারণ করে। কিন্তু পরে সেটিও আর বাস্তবায়িত হয়নি। মাত্র এক হাজার ৫১৯ মাদরাসার শিক্ষকদের ভাতার আওতায় আনা হয়। বাকি মাদরাসার শিক্ষকরা আজ অবধি কোনো বেতনভাতা পাচ্ছেন না।

এদিকে রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের বেতন বাড়াতে বাড়াতে ২০১৩ সালে সরকার সব রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করণ করে। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা অবহেলিতই থেকে যায় তখনো।
এভাবে সরকারের অবহেলার কারণে ১২ হাজার ১৫২টি মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায় এক পর্যায়ে। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা চালু রয়েছে বলে জানান শিক্ষকরা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.