রাখাইনে আটক শিশুদের করুণ অবস্থা

ত্রাণকর্মীদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে

রোহিঙ্গা শিশুরা সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধদের হামলায় এই দুঃসহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষাধিক শিশু মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেকে ছোট্ট শিশু রেখে পালাতে বাধ্য হন। অনেক মা-বাবাকেই হত্যা করা হয় শিশুদের সামনে। এ অবস্থায় আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে অনেকে। অন্য শিশুরা মিয়ানমারে অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় করুণ জীবন যাপন করছে। অবুঝ শিশুরা সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণ হিংসার শিকার হয়ে কোনো ধরনের যতœ ও পরিচর্যা পাচ্ছে না। পর্যাপ্ত খাদ্য ও শুশ্রƒষার অভাবে তারা অপুষ্টি ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মিয়ানমারের আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে অবস্থানরত বা আটকে থাকা ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর অবস্থা উদ্বেগজনক বলে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে এক পর্যবেক্ষণে জানানো হয়েছে।
শরণার্থী হয়ে আসা ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এদের প্রতি কিছুটা মনোযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, এক লাখ রোহিঙ্গা শিশু রাখাইনে আটকা পড়েছে। এর মধ্যে ৬০ হাজার শিশুর অবস্থা শোচনীয়। এদের ব্যাপারে বিশ্ববাসীর কোনো মনোযোগ নেই। রোহিঙ্গাদের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে মিয়ানমারে। ফলে আটকে পড়া শিশুদের খাবার ও প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। সাহায্যকর্মীদের কার্যক্রমও সেখানে প্রায় বন্ধ হয়ে রয়েছে। মধ্য রাখাইনের ময়লা ও আবর্জনাপূর্ণ স্থানে অবস্থিত এসব রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে শিশুরা ভয়ানক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে দিনাতিপাত করছে। এদের বেশির ভাগই আবার উত্তর রাখাইনে আটকে আছে, যেখানে ইউনিসেফের সহযোগীরা নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রবেশ করতে পারছে না।
প্রায় মাসব্যাপী মিয়ানমার সফরের ভিত্তিতে এসব কথা সাংবাদিকদের বলেন ইউনিসেফের মুখপাত্র মারিক্সি মেরকাডো। তিনি রাখাইনের পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্রের কথা উল্লেখ করে বলেন, ২৫ আগস্টের আগে ইউনিসেফ অপুষ্টিতে আক্রান্ত রাখাইনের চার হাজার ৮০০ শিশুকে সেবা দিচ্ছিল। তাদের অপুষ্টির মাত্রা উদ্বেগজনক। সহিংস পরিস্থিতির পর থেকে সেসব শিশুকে আর সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় তাদের জীবন হুমকিতে রয়েছে। মেরকাডো আরো বলেন, লুটপাট, ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার কারণে আমাদের বহির্বিভাগীয় সেবা প্রদানের ১২টি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। জাতিসঙ্ঘের সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলো উত্তর রাখাইনে প্রবেশ করতে না পারার ঘটনাকে তিনি ‘সমস্যার সৃষ্টিকর’ বলে উল্লেখ করেন। মিয়ানমার সফরে নিজের দেখা দু’টি নিকৃষ্ট আশ্রয়শিবিরের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ওই মুখপাত্র বলেন, এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘পাউকটাও টাউনশিপ’। তিনি বলেন, নৌকায় চার-পাঁচ ঘণ্টার যাত্রায় সেখানে পৌঁছতে হয়। পৌঁছানোর পর সবার আগে আপনার যা অনুভূত হবে, তা হলো নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসা দুর্গন্ধ। ক্যাম্পের কিছু অংশ বস্তুতই নর্দমা। পুরো ক্যাম্প নোংরা আবর্জনাপূর্ণ। সেখানে শিশুরা খালি পায়ে কাদামাটি ও ময়লার ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। ওই ক্যাম্পের এক পরিচালক শুধু ডিসেম্বরের প্রথম ১৮ দিনের মধ্যেই আটজন শিশুর মৃত্যুর কথা জানান।
মানবশিশুদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত; অথচ রোহিঙ্গা শিশুরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ইউনিসেফের কর্মকর্তার বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, রাখাইনে আটকে পড়া শিশুদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য প্রয়োজন। অন্যথায় আটকে পড়া লাখো শিশুর অনেকে প্রাণ হারাবে, অন্যরা চরম রোগগ্রস্ত হবে। এই শিশুদের বাঁচাতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের উদ্ধারে কাজ করতে পারে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.