উজিরপুরে হাজী ব্রিকসে পোড়ানোর জন্য স্তূপকৃত কাঠ  : নয়া দিগন্ত
উজিরপুরে হাজী ব্রিকসে পোড়ানোর জন্য স্তূপকৃত কাঠ : নয়া দিগন্ত

উজিরপুর পৌর এলাকায় অবৈধভাবে চলছে ৩ ইটভাটা

জহির খান উজিরপুর (বরিশাল)

বরিশালের উজিরপুর পৌর এলাকায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা তিন ইটভাটার কার্যক্রম চলছে। পৌর নগরীর প্রাণকেন্দ্রে দুই বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে এসব ইটভাটা আছে। ঘনবসতিপূর্ণ পৌর এলাকার ফসলি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ইটভাটাগুলোতে দেদারসে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এসব ইটভাটা স্থাপনে দেখা দিয়েছে পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগ। ২০১৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি গেজেট আকারে আনুষ্ঠানিকভাবে উজিরপুর পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হলে ইটভাটাগুলো পৌর এলাকার মধ্যে পড়ে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ভাটাগুলো আগের মতো চলে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ আইন অনুযায়ী, জনবসতি এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা করার নিয়ম নেই। পৌর এলাকার মধ্যে কোনো ইটভাটা করা যাবে না। এ ছাড়া সংরক্ষিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বনভূমি, অভয়ারণ্য, জলাভূমি ও কৃষিপ্রধান এলাকাসহ পরিবেশ সঙ্কাটাপন্ন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ নিয়ম অমান্য করলে পাঁচ বছরের জেল ও জরিমানার বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন বিল পাস হয়েছে। তারপরও এ আইন অমান্য করে উজিরপুর পৌরসভার ফসলি জমি ও ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে ইটভাটা তৈরি করে চালাচ্ছে কার্যক্রম।
সরেজমিন দেখা গেছে, পৌরসভা নগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পরমানন্দসাহা গ্রামে শনিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঘনবসতিপূর্ণ ওই এলাকার মাত্র ১০০ গজের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা মেসার্স হাজী ব্রিকস নামে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে স্তূপাকারে রাখা হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ মণ করে কাঠ। জ্বালানি হিসেবে এসব কাঠ দিয়েই পোড়ানো হচ্ছে ইট। পৌর এলাকার সবচেয়ে বড় ফসলি জমিতে গড়ে ওঠেছে ওই ভাটা। ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে এলাকার গাছপালা ও লতাপাতা কালো-বিবর্ণ হয়ে গেছে। অনেক গাছের পাতা মরা বা পুড়ে গেছে।
গ্রামের দিনমজুর আবুল হোসেন বলেন, ‘ইটভাটার কারণে গত কয়েক বছর ধরে গ্রামের ফলজ গাছগুলোতে ফল ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। একইভাবে জনদুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পৌর নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কালিরবাজার গ্রামের কয়েক শতাধিক বাসিন্দাকে। সেখানে জনবসতি এলাকার মাত্র ৫০ গজের মধ্যে (যেখানে কমপক্ষে ৭০টি পরিবার বাস করছে) এবিএস ব্রিকস নামে একটি ইটভাটা রয়েছে। যদিও ওই ভাটায় কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। তবুও পরিবেশ দূষণ থেকে শুরু করে জনদুর্ভোগের কমতি নেই। ওই গ্রামের সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এই ভাটার কারণে গাছপালা ও মানুষের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। ভাটাসংলগ্ন একই এলাকার আবুল সরদার জানিয়েছেন, ইটভাটার কারণে প্রতি বছর তার ঘরে নতুন ঢেউটিন লাগাতে হয়। এ ছাড়া পৌরসভার উত্তর রাখালতলা গ্রামে অবৈধভাবে গড়ে ওঠেছে এসবিআই ব্রিকস। সেখানেও একই অবস্থা। উজিরপুর পৌরসভার মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই তিন ইটভাটার চারপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোতে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাটবাজার ও সড়ক-মহাসড়ক। এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়ার বিরূপ প্রভাবে মরে যাচ্ছে গ্রামগুলোর ফলজ ও ওষুধি গাছ-গাছালি। ইতোমধ্যে ওই সব গ্রামের বেশির ভাগ ফলদ গাছের ফল ধরাও বন্ধ হয়ে গেছে। এ দিকে ওই সব ভাটায় ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি প্রতিনিয়ত তুলে নেয়া হচ্ছে অথবা নদীর তীরবর্তী কোনো চর কেটে মাটি চুরি করছে। এই মাটি, কাঠ ও ইট আনা নেয়ার কাজে স্থানীয় সব রাস্তাঘাটে ব্যবহার করে বেপরোয়াভাবে চলছে ট্রলি, ভটভটি, নছিমন, করিমন নামে বিকট শব্দের অবৈধ যানবাহন। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে পৌর নগরীর রাস্তাঘাট ও ফসলি জমির উর্বরতা শক্তি। অপর দিকে গাছগাছালি উজাড় হয়ে ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য। এ ছাড়া রাস্তাঘাটে চলাচলকারী বেপরোয়া যানবাহনের বিকট শব্দে অনেকেরই কানের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য।
পৌর এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সব ভাটামালিকেরা বলছেন, তারা ইটভাটার অনুমোদন চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করেছেন। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মো: আহসান হাবিব বলেন, বরিশালে নীতিমালার বাইরে গড়ে ওঠা ইটভাটার সংখ্যাই বেশি। পরিবেশ আইন অনুযায়ী জনবসতির এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। সে অর্থে পৌর সদরের মধ্যে গড়ে ওঠা সব ইটভাটাই অবৈধ। ওই সব ইটভাটার পরিবেশ বিভাগের কোনো ছাড়পত্র নেই। পরিচালক আহসান হাবিব আরো জানান, খুব শিগগিরই ওই এলাকায় গিয়ে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.