ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে ট্রাম্পের অশালীন মন্তব্য

বিশ্বব্যাপী ক্ষোভ, জাতিসঙ্ঘের নিন্দা
বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনপ্রত্যাশী কয়েকটি দেশের নাগরিকদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসে কংগ্রেসের একদল সদস্যের সাথে অভিবাসন নীতিমালা নিয়ে আলোচনায় বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘কেন আমরা নোংরা দেশগুলো থেকে এসব লোককে এখানে নিয়ে আসছি?’ হাইতি, এল সালভাদর ও আফ্রিকার দেশগুলো নিয়ে ট্রাম্প এই অশ্লীল মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের সর্বশেষ এই বর্ণবাদী মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ, আফ্রিকান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, রাজনৈতিক এবং আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের নাগরিকরা।
ট্রাম্প আরো বলেন, হাইতি ও আফ্রিকান দেশগুলোর পরিবর্তে নরওয়ে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আরো অভিবাসী গ্রহণ করা উচিত। বুধবার নরওয়ের প্রধামন্ত্রী ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য নিয়ে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই শিবিরেই তীব্র সমালোচনার মধ্যে হোয়াইট হাউজ এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র রাজ শাহ বলেন, ‘ওয়াশিংটনের কিছু রাজনীতিক বিদেশী দেশগুলোর হয়ে লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছে; অন্য দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইচ্ছা সবসময়ই আমেরিকার জনগণের পক্ষে লড়াই করার।’
মার্কিন বর্তমান প্রশাসন অন্য অনেক দেশের মতো মেধাভিত্তিক অভিবাসনে আগ্রহী বলেও মন্তব্য করেন মুখপাত্র। তিনি বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের দেশকে শক্তিশালী করতে স্থায়ী সমাধানের পথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, যেন তাদেরই স্বাগত জানানো যায়, যারা আমাদের সমাজে অবদান রাখতে পারবেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে ও আমাদের মহান জাতির সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে পারবেন।’
অস্থায়ী, দুর্বল ও বিপজ্জনক পন্থায় নেয়া অভিবাসী যারা পরিশ্রমী মার্কিনিদের ও বৈধভাবে অভিবাসী হওয়া নাগরিকদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে, ট্রাম্প তাদের প্রত্যাখ্যান করতে চান বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট পার্টি একদল কংগ্রেস সদস্য দ্বিপক্ষীয় একটি অভিবাসন নীতিমালা নিয়ে কথা বলতে গেলে ট্রাম্প অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে এ মন্তব্য করেন। বৈঠকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ডারবিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ ও মহামারী আক্রান্ত দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী বসবাসের অনুমতিসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব প্রেসিডেন্টকে দেন বলে খবর মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর। প্রত্যুত্তরে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ওই সব দেশ থেকে অভিবাসী না নিয়ে নরওয়ের মতো দেশগুলো থেকে নেয়া। সাউথ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, যদিও প্রেসিডেন্টের মন্তব্য নিয়ে পরে তাকে কিছু বলতে শোনা যায়নি।
আফ্রিকান অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে ট্রাম্পের অশ্লীল মন্তব্য এবারই প্রথম নয়। গত বছরের জুনে অভিবাসন নিয়ে এক বৈঠকে ট্রাম্প হাইতির নাগরিকদের ‘সবারই এইডস আছে’ মন্তব্য করেছিলেন বলে তিন সপ্তাহ আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল। ওভাল অফিসে বসে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে করা ট্রাম্পের মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সদস্য এলিজাহ কামিংস টুইটে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘ক্ষমার অযোগ্য এ মন্তব্যের নিন্দা জানাচ্ছি, যা প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা ক্ষুণœ করেছে।’
একই দলের কৃষ্ণাঙ্গ সদস্য সেডরিক রিচমন্ড এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য ফের প্রমাণ করল, তার মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন স্লোগান আদতে মেক আমেরিকা হোয়াইট অ্যাগেইন অ্যাজেন্ডা। সমালোচনা করছেন রিপাবলিকানরাও। হাইতিয়ান-আমেরিকান একমাত্র সিনেটর ইউটাহর মিয়া লাভ ‘নির্দয়, বিভাজিত ও এলিটিস্ট’ মন্তব্যের জন্য ট্রাম্পকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে জানতে চাইলেও ওয়াশিংটনের সালভাদোরিয়ান দূতাবাসের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। চলতি সপ্তাহে এক ঘোষণায় ট্রাম্প প্রশাসন আগামী বছরের মধ্যে তিন দশক ধরে অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করা সালভাদরের দুই লাখ লোককে দেশে ফিরে যেতে সময় বেঁধে দিয়েছে।
১৯৯১ সালে দেশটিতে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের প্রতিক্রিয়ায় সেখানকার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের এই সুযোগ মিলেছিল।
সোমবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তিন দশক আগে সালভাদরের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বেশির ভাগ অবকাঠামোর মেরামত সম্পন্ন হয়েছে, তাই দেশটির নাগরিকদের আর যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজনীয়তা নেই। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে বসবাস করা হাইতি ও নিকারাগুয়ার নাগরিকদের টেম্পোরারি প্রটেক্টেট স্ট্যাটাসও (টিপিএস) প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী নিন্দা
ট্রাম্পের এই বর্ণবাদী মন্তব্যের আন্তর্জাতিক নিন্দায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতর। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতরের মুখপাত্র রুপার্ট কলভিন বলেন, তার এ মন্তব্যকে বর্ণবাদী ছাড়া আর কোনো শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আফ্রিকান ইউনিয়ন বা এইউ বলেছে, তারা ট্রাম্পের ভাষায় খুবই উদ্বিগ্ন। এইউ মুখপাত্র এব্বা কালন্দো বলেছেন, যেহেতু প্রচুরসংখ্যক আফ্রিকান মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে দাস হিসেবে এসেছে, সুতরাং এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ট্রাম্পের বক্তব্য সব স্বতঃসিদ্ধ আচরণ ও রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিস্ময়কর। কেননা অভিবাসন কিভাবে বৈচিত্র্য ও সুযোগের জোরালো মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জাতির জন্ম দিয়েছে, বিশ্বে তার দৃষ্টান্ত হলো যুক্তরাষ্ট্র।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.