আওয়ামী লীগ বিএনপির একাধিক প্রার্থী তৎপর

বরিশাল-৪ আসন
আযাদ আলাউদ্দীন বরিশাল

হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৪ আসন। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর ভোটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ আসনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ভোটার অনেক বেশি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে আওয়ামী লীগের জয়জয়কারের মধ্যেও এ আসনটিতে জয়লাভ করেছেন বিএনপির প্রার্থী।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী তৎপর রয়েছে। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন অন্তত হাফ ডজন নেতা। আর স্থানীয় আওয়ামী লীগেও লেগে আছে অন্তর্দ্বন্দ্ব।
বরিশাল-৪ নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার ৩ লাখ ১০ হাজার ২৪৫ জন। ১৯৯১ সালে যখন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে তখন এখানে ভোটে জেতেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ। আবার ’৯৬-তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়, এ নির্বাচনে এ আসনে জয়লাভ করেন বিএনপির প্রার্থী শাহ মো: আবুল হোসাইন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদ হোসাইন আল মামুন এখান থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হতে না পারলেও তৃতীয় অবস্থানে থেকে বিপুল ভোট পান তিনি।
২০০১ সালে চার দলীয় জোটের মনোননয়ন নিয়ে এ আসনে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী শাহ মো: আবুল হোসাইন। ওয়ান-ইলেভেন সময়ে সংস্কারে গিয়ে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন আবুল হোসাইন। ফলে বিএনপির মূলধারা থেকে ছিটকে পড়েন। এ সুযোগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে দলীয় মনোনয়ন পান বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ। সে সময় সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে আওয়ামী লীগের জায়ান্ট প্রার্থী মইদুল ইসলামের সামনে কোনো অবস্থাতেই টিকবেন না ফরহাদ। কিন্তু বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে যে দু’টি আসনে বিএনপি জয়লাভ করে তার একটিতে নিজের নাম লেখান মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে এখানে জয়লাভ করেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন হাফ ডজনেরও বেশি নেতা। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ ছাড়াও এ তালিকায় রয়েছেন তারেক রহমানের মামলার প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম হেলালউদ্দিন, ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান, সাবেক এমপি বিএনপির সংস্কারপন্থী নেতা শাহ মো: আবুল হোসাইন, দলের ত্যাগী নেতা নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর, এ বি এস স্বপন, আবদুল খালেক হাওলাদার প্রমুখ। তালিকায় অনেকের নাম থাকলেও এখানে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশি আলোচিত হচ্ছেন দু’জন। এরা হলেন- মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ ও তারেক রহমানের মামলার প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম হেলালউদ্দিন। মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ বলেন, ‘আমার কর্মকাণ্ডই আমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে। আমি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি অবিচল। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা-ই মাথা পেতে নেব।’
সাবেক ছাত্রদল নেতা ও তারেক রহমানের মামলার প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম হেলাল উদ্দিন বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে নির্যাতিত ও কারাবন্দী বিএনপি নেতাদের পরিবারের খোঁজখবর নেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবসময় মাঠে ছিলাম। হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জে কুয়েত সরকারের সহায়তায় একাধিক মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজসেবা করে যাচ্ছি। দল যোগ্য বিবেচনা করলে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
বরিশাল পূর্ব জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মো: আবদুল জব্বার নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ২০ দলীয় জোটের বাইরে আলাদাভাবে একক সংসদ নির্বাচন করলে এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হয়ে আছেন বাহেরচর ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নে পাঁচবারের নির্বাচিত (একাধারে ৩০ বছর) সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসেম। বর্তমানে তিনি হিজলা উপজেলা জামায়াতের আমির ও বরিশাল পূর্ব জেলা জামায়াতের শূরা সদস্য।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনে বিএনপি-জামায়াত যখন অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে ঠিক সেই মুহূর্তে মনোনয়ন আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে বহুভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগ। বর্তমান এমপি পঙ্কজ দেবনাথ আর বরিশালের জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো: মইদুল ইসলাম গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ আওয়ামী লীগ। মইদুল ইসলাম হচ্ছেন মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ২০০৮-এর নির্বাচনে তিনি এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। বরিশালের জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এই আওয়ামী লীগ নেতা আগামী নির্বাচনে মনোনয়নও চান।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কারÑ সুস্পষ্ট দু’টি ভাগে বিভক্ত বরিশাল-৪ আসনের আওয়ামী লীগ। এর একটির নিয়ন্ত্রণে এমপি পঙ্কজ দেবনাথ ও অপরটিতে সাবেক এমপি মইদুলসহ দলের অন্য নেতারা রয়েছেন। অবশ্য এ বিভক্তির মূলেও মনোনয়ন দ্বন্দ্ব। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হঠাৎ করে পঙ্কজকে মনোনয়ন দেয়ার পরই এর সূচনা। বর্তমানে বিরোধী পক্ষের একটাই অভিযোগ- দলকে বিভক্ত করছেন পঙ্কজ। এ ক্ষেত্রে নজির হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মেহেন্দিগঞ্জের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।
এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে সিনিয়র সহসভাপতি) অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম বলেন, ‘উনি (পঙ্কজ) নৌকা পছন্দ করেন না। উনি পছন্দ করেন আনারসসহ অন্যান্য প্রতীক। যে কারণে এবার ইউপি নির্বাচনে মেহেন্দিগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী দিয়ে নৌকা ডুবিয়েছেন। পাঁচ ইউনিয়নে নৌকা হেরেছে। উনার হঠকারিতায় একটি ইউনিয়নে জিতেছে বিএনপি।’ অ্যাডভোকেট আফজালের মতো একই অভিযোগ করেছেন সাবেক এমপি ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মইদুল ইসলাম। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে এমপি পঙ্কজ দেবনাথ বলেন, ‘যারা এসব বলেন তাদের অতীত কী? মইদুল সাহেব দু’বার এমপি ছিলেন জাতীয় পার্টির। তখন তিনি আওয়ামী লীগ পিটিয়েছেন। মরহুম মহিউদ্দিন আহমেদের পর যারাই এখানে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের ক’জন নৌকার বিজয় আনতে পেরেছে? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে বাণিজ্য আর ত্যাগী পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে হাইব্রিড লোকজনকে মনোনয়ন দেয়ায় তারা হেরেছে। যারা জিতেছে তারাও তো আওয়ামী লীগেরই লোক। সঠিক মনোনয়ন হলে তো তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জিততে হতো না।’
এ আসনে আরো মনোনয়ন চাইছেন সাবেক এমপি মরহুম মহিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ, তার বড় ভাই সাহাব আহমেদ, মেহেন্দিগঞ্জের পৌর মেয়র কামালউদ্দিন খান, জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান আরজু ও আওয়ামী লীগ নেতা মেজর (অব:) মহসিন সিকদার। বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগের বাইরে প্রার্থী হিসেবে আরো যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা এছাহাক মোহাম্মদ আবুল খায়ের ও জাতীয় পার্টির নাছির উদ্দিন সাথী। এদের মধ্যে দশম জাতীয় নির্বাচনে এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথী। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরিশাল জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অধ্যক্ষ মহসিন উল ইসলাম হাবুল।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.