র্যাবের অভিযানে ৩ উগ্রবাদী নিহত

ঘটনাস্থল রাজধানীর নাখালপাড়া
নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাত্র কয়েক শ’ গজ দূরে পুরনো এমপি হোস্টেলসংলগ্ন রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ার একটি বাড়িতে উগ্রবাদীদের আস্তানায় র্যাবের অভিযানে তিনজন নিহত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পশ্চিম নাখালপাড়ার ১৩/১ রুবি ভিলা নামে ছয়তলা ভবনের আস্তানাটি ঘিরে ফেলে র্যাব। এরপর ভোরে ওই ভবনের পঞ্চমতলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযানে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর আগে ভবনে থাকা প্রায় ৬০ জন বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেয় র্যাব। নিহত তিনজনই জেএমবি সদস্য বলে জানিয়েছে র্যাব। তবে এখনো তাদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহতদের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অভিযান শেষে ওই আস্তানা থেকে তিনজনের লাশসহ দু’টি পিস্তল, ৪৪টি গুলির খোসা, সাদা-কালো রঙের তিনটি স্কার্ফ। এ ছাড়া ওই ফ্ল্যাট থেকে তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), তিনটি সুইসাইডাল ভেস্ট, ১৪টা ডেটোনেটর, চারটি পাওয়ার জেল, তিনটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি), বিপুল বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে, যা দেখে র্যাব ধারণা করছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনায় বড় ধরনের কোনো নাশকতার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এ ঘটনায় ভবনের কেয়ারটেকার রুবেল এবং বাড়িওয়ালার ছেলেকে আটক করা হয়েছে। তবে বাড়ির মালিককে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় র্যাবের দুই সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
র্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, গোপন সংবাদে র্যাব জানতে পারে নাখালপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরপরই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রুবি ভিলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। রাত প্রায় ২টায় র্যাব সদস্যরা ওই বাড়িটি ঘিরে উগ্রবাদীদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। এরই মধ্যে আস্তানা থেকে র্যাবকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় র্যাব সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের প্রতিহত করতে গুলি চালায়। উগ্রবাদীরাও গুলি ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে। একসময় আস্তানা নীরব হয়ে গেলে ধারণা করা হয় উগ্রবাদীরা নিহত হয়েছে। পরে ওই আস্তানায় তল্লাশি চালিয়ে তিনজনের লাশ পাওয়া যায়। অভিযান চালানোর আগে কৌশলে ভবনের অন্য বাসিন্দাদের বের করে বাড়িওয়ালার দ্বিতীয় তলার বাসায় রাখে র্যাব।
মুফতি মাহমুদ খান বলেন, পাঁচতলার ওই ফ্ল্যাটে কক্ষ মোট তিনটি, সেখানে থাকত মোট সাতজন। ফ্ল্যাটে ঢোকার পর সোজা গেলে যে কক্ষটি, সেখানেই তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে। আর বাকি দুই কক্ষ থেকে চারজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এ দিকে অভিযানের পর র্যাবের ক্রাইম সিন ও ফরেনসিক টিম প্রবেশ করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এর আগে অভিযানের শুরুতেই বাড়ির গ্যাসলাইন বন্ধ করে দেয়া হয়।
জানা গেছে, ছয়তলা ভবনের মালিক শাহ মোহাম্মদ সাব্বির হোসেন বিমানের একজন স্টুয়ার্ড। ১৫ বছর আগে ওই ভবন নির্মাণ করেন তিনি। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। পরিবার নিয়ে তিনি ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন। নিচতলায় গ্যারেজ। তিন ও চারতলা পর্যন্ত ফ্যামিলি বাসা ভাড়া দেয়া। ষষ্ঠতলার দু’টি ইউনিটেই মেস। পঞ্চমতলার একটি ইউনিটে ফ্যামিলি ও একটি ইউনিটে মেস হিসেবে ভাড়া দেন। দক্ষিণ পাশের ওই মেসের তিনটি রুমের মধ্যে একটিতে উগ্রবাদীরা আস্তানা গাড়ে। ওই ভবনে ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৭ সালেও অভিযান চালানো হয়েছিল। ওইসব অভিযানে ভবনে থাকা মেস থেকে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে র্যাব ও পুলিশের পৃথক টিম।
শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছেন র্যাবের ডিজি বেনজির আহমেদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গত ৪ জানুয়ারি জাহিদ নামে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে বাসাটি ভাড়া নেয়া হয়। অভিযানের পর বাসার ভেতরে একই ছবি দিয়ে সজীব নামে আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। একই ছবি দিয়ে দুই নামে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো ভুয়া। তিনি বলেন, ‘বাসাটি কবে, কে ভাড়া নেন, বাড়ির মালিক তা জানেন না। তিনি রুবেল নামে একজনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার কাছে জঙ্গিরা জাহিদ নামে একটি ন্যাশনাল আইডি কার্ড জমা দিয়ে বাসাটি ভাড়া নেয়। পরিচয়পত্র দু’টিই ভুয়া কি না তদন্ত শেষে জানা যাবে বলে জানান বেনজির আহমেদ। তিনি আরো বলেন, তাদের একজনের গায়ে সুইসাইড ভেস্ট ছিল। একজনের ডেডবডির নিচে একটি আইইডি ছিল। রান্নাঘরে গ্যাসের চুলার ওপর আইইডি রেখে আগুন জ্বালিয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেছিল বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হয়নি। রুবি ভিলার পেছনের বাড়ির একজন বাসিন্দা জানান, ভোরে প্রচণ্ড শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। শীতের কারণে জানালা-দরজা বন্ধ থাকলেও শব্দ ভেদ করে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। পরে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখা যায় বাইরে প্রচুর র্যাবের লোক। ওই বাসা থেকে দৌড়াদৌড়ির শব্দ পাওয়া যায়।
বেলা সাড়ে ৩টায় র্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অভিযান শেষ বলে ঘোষণা করে। র্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান জানান, শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টায় তাদের অভিযান শেষ হয়। আস্তানা থেকে তিনটি লাশ বের করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তেজগাঁও থানা পুলিশ লাশ তিনটির সুরতহাল করেছে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ তিনটি সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উগ্রবাদীদের কক্ষটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.