ভারতে সুপ্রিম কোর্টে বিদ্রোহ, পরবর্তী প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে নতুন জটিলতা
ভারতে সুপ্রিম কোর্টে বিদ্রোহ, পরবর্তী প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে নতুন জটিলতা

ভারতে সুপ্রিম কোর্টে বিদ্রোহ, পরবর্তী প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে নতুন জটিলতা

নয়া দিগন্ত অনলাইন

ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালতে চার বিচারপতি দৃশ্যত বিদ্রোহ করেছেন। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে অনাস্থা ব্যক্ত করেছেন তারা। এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। সারা ভারতে তা নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। এর মধ্যে আবার নতুন জটিলতা শুরু হয়েছে। আগামী অক্টোবরে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের অবসর গ্রহণ করার কথা। পরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির পদে বসার কথা বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর। কিন্তু শুক্রবারে 'বিদ্রোহী' বিচারপতিদের দলে থাকায়, সেই পদে আদৌ তাকে দেখা যাবে কিনা তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।

শুক্রবার সুপ্রিমকোর্টের তিন বিচারপতিকে সঙ্গে নিয়ে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে তোপ দাগেন অন্যতম সিনিয়র বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। বর্তমান প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বেঞ্চ তৈরি নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের নির্দিষ্ট কোনো বাধা-ধরা নিয়ম নেই। সংবিধানের ১২৪ নম্বর ধারায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে বলা রয়েছে।

যদিও, ভারতে দশকের পর দশক ধরে, সিনিয়র মোস্ট বিচারপতিকেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে বসানো হয়। সেই অনুযায়ী বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর প্রধান বিচারপতির আসনে বসার কথা এবছরের অক্টোবরে।

সাধারণভাবে অবসর নিতে চলা প্রধান বিচারপতি, তার পরবর্তী হিসেবে নাম সুপারিশ করেন রাষ্ট্রপতির কাছে। সেক্ষেত্রে সিনিয়র মোস্ট বিচারপতির নামই তিনি সুপারিশ করেন।

কিন্তু বর্তমানে চলা বিতর্কের ক্ষেত্রে যদি প্রধান বিচারপতি মনে করেন, বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর আচরণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর প্রভাব ফেলবে, সেক্ষেত্রে তিনি অন্য কারো নাম সুপারিশ করতেই পারেন।

তবে, চলে আসা প্রথাকে ভাঙতে গেলে প্রতিষ্ঠানের নিজের নয়, সরকারের কাছ থেকেও সুপারিশ আসা জরুরি।

প্রথা ভেঙে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রথম ঘটনা ঘটে ১৯৭৩ সালে। সেই সময় তিন সিনিয়র বিচারপতিকে টপকে এএন রায়কে প্রধান বিচারপতির আসনে বসানো হয়।

১৯৭৭ সালে বিচারপতি এইচআর খান্নাই ছিলেন একমাত্র বিচারপতি যিনি, ১৯৭৫-৭৭-এ জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে সরকারের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। জরুরি অবস্থার সময় ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা নিয়েই মত দিয়েছিলেন এইচআর খান্না।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় আসার পর পুরস্কারও পেয়েচিলেন। বিচারপতি এমএইচ বেগকে টপকে প্রধান বিচারপতির আসনে বসানো হয়েছিল এইচআর খান্নাকে। যদিও পরে তিনি ইস্তফা দিয়েছিলেন।

এদিকে শুক্রবার বিচারপতিদের সংবাদ সম্মেলনের পরে ভারতের সোলি সোরাবজির মতো আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন, ‘‘চার বিচারপতি এটা না-করলেই ভালো হতো।’’ তার মতে, প্রকাশ্য সংঘাত এড়ানো যেত। কারণ সাধারণ মানুষ শীর্ষ আদালতে আস্থা রেখে বাঁচেন। আবার উল্টো যুক্তি হলো— বিচার ব্যবস্থাতেও পচন ধরেছে। সেখানে দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। এ বার তা প্রকাশ্যে চলে আসায় লাভই হবে। প্রবীণ আইনজীবী দুষ্মন্ত দাভের যুক্তি, ‘‘আলোচনা না-হলে স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি হবে কী করে?’’ আর চেলমেশ্বর বলেছেন, ‘‘বাধ্য হয়েই এই পথ নিতে হয়েছে। না হলে ভবিষ্যতে বলা হত, সকলেই তাঁদের বিবেক বিকিয়ে দিয়েছিলেন।’’

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় যখন শীর্ষ আদালতের শুনানি শুরু হয়, তখনো কেউ বোঝেননি কী ঘটতে চলেছে। তার আগেই বিচারপতিদের মধ্যে এক প্রস্ত বিবাদ হয়ে গেছে। সিবিআই কোর্টের বিচারক ব্রিজগোপাল লোয়া-র রহস্যময় মৃত্যুর তদন্তের দাবিতে করা মামলার শুনানি বিচারপতি অরুণ মিশ্রর বেঞ্চে পাঠানো নিয়ে বিতর্কের শুরু। ওই বিচারক গুজরাত পুলিশের বিরুদ্ধে সোহরাবউদ্দিনকে ভুয়া সংঘর্ষে মেরে ফেলার অভিযোগের মামলা শুনছিলেন। যাতে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের নামও রয়েছে। ২০১৪-য় বিচারক লোয়ার মৃত্যু হয়।

শুক্রবার বিচারপতিদের সংবাদ সম্মেলনের পরে গুজব ছড়ায় প্রধান বিচারপতিও মুখ খুলবেন। কিন্তু তা হয়নি। আইনজীবীরা বলছেন, গত কয়েক মাসে কিছু মামলা নির্দিষ্ট কিছু বিচারপতির এজলাসেই পাঠানো হচ্ছে। তা নিয়েই একাংশ বিচারপতি আপত্তি তোলেন। বিচারপতি চেলমেশ্বর জানিয়েছেন, দু’মাস আগে তারা সাত পাতার চিঠি লেখেন প্রধান বিচারপতিকে। সেই চিঠিও আজ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা।

তবে একে প্রধান বিচারপতির প্রতি পুরোপুরি অনাস্থা বলছেন না বিচারপতিরা। প্রধান বিচারপতির ‘ইমপিচমেন্ট’ নিয়ে তাদের জবাব, ‘‘এ বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই।’’

ভারতে সুপ্রিম কোর্টে বিদ্রোহের পর যেসব বিচারপতির দিকে নজর রয়েছে তারা হলেন :

প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র : গত বছর অগস্টে দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি হওয়ার ঠিক আগে তার বিরুদ্ধে আইনজীবী থাকাকালীন তথ্য গোপন করে সরকারি জমি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

বিচারপতি জাস্তি চেলামেশ্বর : দ্বিতীয় প্রবীণতম বিচারপতি। তবে তিনি প্রধান বিচারপতি হতে পারবেন না। অনেক দিন ধরেই কলেজিয়ামের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে সরব। সাবেক প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন, কলেজিয়ামের বৈঠকও নিয়মমাফিক হয় না। অসন্তোষের জন্য দীর্ঘদিন কলেজিয়ামের বৈঠকেও যোগ দেননি।

বিচারপতি রঞ্জন গগৈ : অক্টোবরে প্রধান বিচারপতি হবেন। আদালত অবমাননার নোটিশ জারি হওয়ায় এজলাসে চিৎকার করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু। বিচারপতি গৈগ তাকে নিরাপত্তা রক্ষী দিয়ে বাইরে বার করে দেয়ার নির্দেশ দেন।

বিচারপতি মদন বি লোকুর : মৃদুভাষী, কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে কড়া রায় দিতে ইতস্তত করেন না।

বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ : সুপ্রিম কোর্টের একমাত্র খ্রিস্টান বিচারপতি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.