ডেথ সার্টিফিকেট

সাহিদা সাম্য লীনা

ডাক্তার আস্তে করে করিমনের নাক থেকে অক্সিজেনের নলটা সরিয়ে নিলেন। রশিদ তা দেখে কিছু বুঝে উঠতে পারল না। বুকটা ধড়াস করে ওঠে! সিস্টার এগিয়ে গায়ে চাদর দিয়ে মাথাসহ সবটা ঢেকে দেয়। রশিদের এবার বুঝতে বাকি থাকে না করিমন আর নেই! হতাশ হয়ে বসে পড়ে বেডের এক কোনায়। কী করবে ভেবে পায় না। ছেলেমেয়ে তিনটা মায়ের অসাড় ঢাকা দেহের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। ওরাও বুঝে না কী হলো বা কী হতে যাচ্ছে! ওদের দিকে চেয়ে আছে হাসপাতালের রুমের অন্য রোগী ও আত্মীয়স্বজন।এক বয়স্ক নারী এগিয়ে এসে রশিদকে বললেন, ও বাপ, আপনে আমার পুতের লাহান। এখ্খান কতা কইবার চাই। রশিদ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। বয়স্ক নারী বললেন, তোমার বউ আর বাইছা নাই, কাঁদো, ছেলেমেয়েগুলারেও কাঁদাও। এইভাবে থাকলি পরে পাথ্থর হই যাইবেনে। বুড়ির কথায় রশিদের যেন হুঁশ ফেরে। কথাটা শুনে সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে রশিদের। চোখের এক থালা পানি বের হতে চায়। রশিদ হু হু করে কাঁদলো। ছেলেমেয়েরাও বাপের দেখাদেখি কাঁদা শুরু করল। সেই সাথে হাসপাতালের রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনেরা চোখ মুছতে থাকলো। 

ছেলেমেয়ে তিনটা মায়ের কাছে গিয়ে ডাকাডাকি শুরু করে- ও মা, ও মা, ওঠো, বাসায় যাইবা না। রশিদের বড় ছেলের সাত বছর। তার পরেরটা মেয়ে, সবচেয়ে ছোটটা চার বছরের। রশিদ ওদের বোঝানোর চেষ্টা করে। সিস্টার আসে ক’জন বয়সহ। লাশটা নেবে অন্য ঘরে। ডেথ সর্টিফিকেট হবে। এসব করতে করতে আড়াই তিন ঘণ্টা লাগবে বলে জানালো সিস্টার রশিদকে। সিস্টার বলে, আপনি ততক্ষণে ব্যবস্থা করুন লাশ নেবার। রশিদ চিন্তিত হয়ে পড়ে। দাফনের টাকা কোথায় পাবে, লাশ নিতে পারবে তার রিকশায় করে। করিমনকে বিয়ে করেছে পর্যন্ত ভালো খাবার দিতে পারেনি। ভালো ঘরে শুতে দিতে পারেনি। হাসপাতালের বেডটা একটু ভালো। বড় হাসপাতাল। বড় দালান। করিমন ভর্তি হয়ে অনেক খুশি ছিল। অথচ আজ সেই দালান থেকে করিমন লাশ হয়ে নিজের ঘরে না, শেষ ঠিকানায় যাবে একটু পর। কিন্তু দাফনের ভাবনায় বিচলিত হলো রশিদ। করিমনের এমন কী রোগ হয়েছিল আজো রশিদ জানে না। সবসময় ব্যথায় কাঁতরাতো করিমন। আর একদিন ব্যথায় করিমন অচেতন হয়ে পড়ে। রশিদ বউটারে নিয়ে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজে আনলে সেখানে তাকে ভর্তি করাতে বলে। সরকারি হাসপাতাল হলেও রশিদকে অনেক কষ্ট করতে হয়। ঠিকমতো ওষুধ কিনতে আরো প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে অনেক বেগ পেতে হয়। অনেক ওষুধ দামের কারণে কেনা হয়নি। কোনো ওষুধ একবেলার একটা কিনতে পেরেছে অন্য বেলার কেনা হয়নি এমন অবস্থা। রশিদ ছেলেমেয়ে তিনটাকে বয়স্ক এক নারীকে দেখে রাখতে বলে বের হয় হাসপাতাল থেকে। রিকশা নিয়ে দাঁড়ায় হাসপাতালের রাস্তায়। দুইজন যাত্রী পায় সেখানে। ঘণ্টা তিনেক ঘোরার পর রশিদ পকেটে হাত দেয়। দেখে যা ক’টা টাকা হয়েছে আপাতত করিমনকে দাফন করা যাবে। কিছু ধার করবে বস্তি গিয়ে। রশিদ হাসপাতালে আসে। আসতে আসতে আরো দুই ঘণ্টা লেগে যায়। রশিদের দেরি দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশটি বেওয়ারিশ করতে চেয়েছিল। রশিদ এসে সিস্টারকে বলে, আমার করিমনকে দেন। সিস্টার তাকে রুম নম্বর, কোথা থেকে নিতে হবে, বুঝিয়ে দিলো। রশিদ হাসপাতালের রেজিস্টার খাতায় আনাড়ি হাতে সই দিলো। সিস্টার একটা কার্ড দিলো রশিদের হাতে। ডেথ সার্টিফিকেট। যেখানে করিমনের মারা যাওয়ার তারিখ লেখা। আছে করিমনের নাম, তার স্বামীর নাম, ঠিকানা, বয়স কত ছিল! আহা! জীবনে এমন কোনো সার্টিফিকেট করিমনদের ভাগ্যে জোটে না। আজ না হয় হাসপাতালে মরাতে একটা মৃত্যু সার্টিফিকেট না হয় জুটলো! রশিদ পড়তে তেমন পারে না। বস্তি গিয়ে বস্তির পোলাপানরা আছে। তারা হাইস্কুলে কেউ কেউ পড়ে, তাদের দিয়ে পড়াবে ভেবে কার্ডটা পকেটে নিয়ে করিমনের লাশটা নিয়ে বের হয়। ছেলেমেয়েগুলারে নিয়ে বয়স্ক মহিলাটি দাঁড়িয়ে ছিল এক পাশে। ছোট ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। কোলে নিয়ে রশিদ কৃতজ্ঞতা জানালো খালা বলে। খালা রশিদের হাতে কিছু টাকা গুজে দিলেন। রশিদ অবাক হয়ে বললো- খালা, আপনে এত টাকা কই পাইলেন? খালা বলে, আমি হাসপাতাল থেকে তোমার সন্তানদের দেখাই দেখাই ওগো মায়ের মরার কথা বলি। সবাই দিছে। বাবাগো আমরা সবাই এই হাসপাতালে আসি। আমরা গরিব মানুষ। কে কখন কোন সময় মইরা যাই ঠিক নাই। গরিবের খবর নেবার তো কেউ নাই। আমার সোয়ামির জন্য দোয়া কইরো। এই বলে খালা তার স্বামী যে বেডে সেদিকে পা বাড়ায়। রশিদ তিন সন্তান নিয়ে লাশসহ হাসপাতাল হতে বের হয়। বয়রা গেটে রাখা রিকশা পর্যন্ত এনে দিলো লাশ। রশিদ রিকশায় করিমনকে শোয়ালো নিচের পাদানিতে বাচ্চা তিনটাকে ওপরের সিটে বসালো। রশিদ লাশটা একটা দড়ি দিয়ে বাঁধে হালকা করে রিকশার সাথে। রশিদ কাঁদতে থাকে। রিকশা নিয়ে আগায় খিলগাঁও বস্তির দিকে। পথ যেন শেষ হয় না। জোরে বৃষ্টি নামে। রশিদ রিকশার ব্রেক কষে। একটু পর মনে হলো করিমনের মৃত্যুর কার্ডটার কথা। বৃষ্টিতে ভিজে গেল কিনা দেখে রিকশা থামিয়ে। একটা পলিথিনে বেঁধে নেয় কার্ডটা। ভাগ্যিস ভিজেনি তেমন। ছেলেমেয়ে তিনটা কাঁদতে থাকে। রশিদ ওদের সামলায়। বৃষ্টির তেজ বাড়তে থাকে। একটা দোকানের সামনে এসে ছেলেমেয়েদের নিয়ে দাঁড়ায় রশিদ। করিমনের লাশ একা রিকশায়। করিমন ভিজছে। রশিদ সেদিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকে। ছোট ছেলেটা বলে, বাপজান খিদা লাগছে। রশিদ কিছু বলে না। দোকানের আশপাশে কিছু মানুষ। এর মধ্য থেকে এক ছাত্র এসে ওদের পাশে দাঁড়ায় বলে, এটা কার লাশ। রশিদ বলে আমার বউয়ের। ছাত্রটা রশিদের কথা শুনে যা বোঝার বোঝে। ছেলেমেয়েগুলাকে দুইটা পাউরুটি কিনে দেয়। বৃষ্টি থেমে গেছে। রশিদ দ্রুত পা বাড়ায়। সন্ধ্যার কাছাকাছি। বস্তির সব লোক জড়ো হয় করিমনের লাশ দেখতে।
রশিদ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে করিমনের লাশ রাতের মধ্যে দাফন করে।
অনেক ক্লান্ত রশিদ। ঘরে এসে ছেলেমেয়েদের পাশে শোয়। খুব মনে পড়ে করিমনের সাথে শুরুর দিনগুলোর কথা। এই ঘরে করিমনের সাথে সংসার শুরু করেছিল রশিদ। আজ রশিদকে একা রেখে চলে গেল করিমন। দুইজনের কোনো ছবি নাই। খুব আপসোস হলো রশিদের। শার্টের পকেট থেকে করিমনের ডেথ সার্টিফিকেটটা বের করে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন রশিদ করিমনকে দেখছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.