অতিথি পাখি শিকার

আবুল হোসেন আজাদ

হেমন্তের মাঝামাঝি থেকেই অতিথি পাখিরা আসতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনসহ বিভিন্ন হাওর-বাঁওড় জলাশয়, লেক এরই মধ্যে অতিথি পাখির আগমনে মুখর হয়ে উঠেছে। রুহুলদের বাড়ির পশ্চিম পাশেই দাঁতভাঙাবিল। ধান কাটা হয়ে গেছে। তবুও বিল গোড়ালি পানিতে ভরা। এখানেও অতিথি পাখিরা আসতে শুরু করেছে। পাখিরা ভোর হলে বিলের পানিতে খাবারের খোঁজে ব্যস্ত হয়ে যায়। কেউবা ডুব সাঁতার কেটে হুটোপুটি বাধায়।
রুহুলদের গ্রামের নাম ভাড়–খালি। ওপাশের গ্রাম মাহমুদপুর হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। ওর বাবা একজন সাধারণ গরিব কৃষক। চাষবাস করে কোনো রকমে কষ্টে সৃষ্টে সংসার চালায়। রুহুলও স্কুলের ফাঁকে বাবাকে ক্ষেতের কাজে সাহায্য করে। প্রতি বছর শীত এলেই রুহুল খুশিতে আটখানা হয়ে যায়। পাখি ধরার আনন্দে।
সন্ধ্যাবেলা বিলে রুহুল পাখি ধরা ফাঁদ পেতে রাখে। ভোর হলে ওর পাতা ফাঁদে পাখিরা আটকা পড়ে ঝটপট করতে থাকে। রুহুল চটপট ফাঁদ থেকে পাখিগুলো ছাড়িয়ে এনে বাজারে বিক্রি করে দেয়। তাতে ওর বেশ টাকা রোজগার হয়। টাকাগুলো ওর মার হাতে তুলে দেয় রুহুল। মাও টাকা পেয়ে খুশি হন।
আমিন সাহেব একজন রিটায়ার স্কুলশিক্ষক। প্রতিদিন পুবের আকাশ ফর্সা হতে শুরু করলে ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে যান। একেক দিন একেক দিকে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে। একদিন তার সামনে পড়ল রুহুল। রুহুলের হাতে পাঁচটি পাখি। হায় হায় করে উঠলেন আমিন সাহেব। একি সর্বনাশ করেছ তুমি। এ কাজ কতদিন ধরে করছ? আমিন সাহেব এবার নরম সুরে রুহুলকে বুঝালেন, ‘ওরা আমাদের অতিথি। অতিথিকে কেউ কি মারে? ওরা প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচতে সুদূর সাইবেরিয়া, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আমাদের দেশে একটু উষ্ণ আবহাওয়া ও খাবারের সন্ধানে এসেছে। আমরা যদি অতিথি পাখিদের খাদ্যে পরিণত করি, এটা কি ঠিক হবে? রুহুল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো কথা বলে না। আমিন সাহেব পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে ২০০ টাকা বের করে দেন রুহুলের দিকে। রুহুল টাকাটা নেয় না। আমিন সাহেব বলেন : টাকাটা নাও, আমি পাখিগুলো কিনে নিলাম। আর পাখিগুলোর বাঁধন খুলে তুমি আকাশে উড়িয়ে দাও। আর প্রতিজ্ঞা করো কোনো দিন এমনটি করবে না। রুহুল পাখিগুলোর পায়ের বাঁধন খুলে উড়িয়ে দিলো। পাখিগুলো ভোরের সোনালি সূর্যের রাঙা আভায় ডিগবাজি খেতে খেতে উড়ে চলে গেল বিলের দিকে। মুগ্ধ নয়নে দু’জন চেয়ে চেয়ে দেখল পাখিদের চলে যাওয়া। রুহুলও প্রতিজ্ঞা করল অতিথি পাখিদের মারবে না, ধরবে না, কাউকে এ কাজ করতেও দেবে না। দু’জনের মুখে তখন হাসির ঝিলিক।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.