মহাকাশে দুঃস্বপ্ন সায়েন্স ফিকশন

আহমেদ বায়েজীদ

ভাসতে ভাসতে জানালার কাছে এলো রুডো। কোনো কাজ নেই হাতে। যাত্রা শুরু হয়েছে এক সপ্তাহ হলো। সঙ্গী দুই নভোচারী এরই মধ্যে শীতল ঘুমে চলে গেছে। রুডোর অবশ্য এখনই শীতল ঘুমে যেতে মন চাইছে না। মহাকাশযানে পৃথিবীর মতো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় আট ঘণ্টা ঘুম, বাকিটা সময় পত্রিকা-জার্নালে চোখ বুলানো, জানালা দিয়ে আকাশ দেখা, স্পেসশিপের এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘুরে বেড়ানো আর প্রিয়জনদের স্মৃতিচারণ করেই কাটাতে চায়। যখন একঘেয়েমি এসে যাবে তখনই কেবল শীতল ঘুমে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পৃথিবী থেকে তিন মহাকাশচারীকে নিয়ে স্পেসশিপ রিক্ট-১৬ ছুটে চলছে ছয় আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্রহে। নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটিতেই এটিই প্রথম মনুষ্য অভিযান। এর আগে একাধিকবার রোবট পাঠানো হয়েছে। সব কিছু ইতিবাচক মনে হওয়াতেই এবার সরাসরি মানুষ যাচ্ছে। গ্রহটির নাম রাখা হয়েছে নিনি। তিনজন নভোচারী রয়েছেন এই অভিযানে। তিনজনের মধ্যে বয়স আর পদমর্যাদায় রুডোই সবচেয়ে ছোট। দেড় বছর লাগবে গন্তব্যে পৌঁছতে। মহাকাশে দীর্ঘ যাত্রায় মহাকাশচারীদের সময় কাটানোর প্রধান কৌশল হলো শীতল ঘুম। শয়নকক্ষে যার যত দিন খুশি সময় সেট করে ঘুমিয়ে পড়া যায়। নির্দিষ্ট সময় শেষ হলে স্বাভাবিক ঘুম ভাঙার মতোই জেগে উঠবে। দীর্ঘ ঘুম হলেও এতটুকু ক্লান্তি বা অবসাদ থাকবে না। মনে হবে রাত ১০টায় ঘুমিয়ে খুব ভোরে ঘুম ভেঙেছে। রুডোর দুই সঙ্গী এরই মধ্যে শীতল ঘুমে গেছে। টানা কয়েক মাস ঘুমিয়ে জেগে উঠবে তারা। রুডো ইচ্ছে করেই ব্যতিক্রম করল। অন্তত যতটা দিন একঘেয়েমি না আসে, যাবে না শীতল ঘুমে। সারা দিন এটা-সেটা করে সময় কাটায়। ইচ্ছে হলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে উল্কা, তারকারাজি দেখে কাটিয়ে দেয় অনেকটা সময়।
পাশের একটা সুইচে চাপ দিয়ে জানালার ওপর থেকে কালো আবরণটা সরিয়ে দিলো রুডো। মুহূর্তেই এক বর্গফুটের জানালা দিয়ে দৃষ্টি হারিয়ে গেল বাইরের অসীম জগতে। আবছা আলো-আঁধারি সেই জগৎ। তারাদের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে হঠাৎ যেন ভ‚ত দেখার মতো চমকে উঠল। এটা কী দেখছে! ওদের মহাকাশযানের সমান্তরাল আরেকটা মহাকাশযান ছুটে চলছে একই পথে। এতটা কাছ দিয়ে চলছে যে খালি চোখেই দেখা যায়; কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটার তো ওকে কিছুই জানায়নি যে এত কাছ দিয়ে আরেকটি মহাকাশযান চলছে! পৃথিবীর কন্ট্রোল রুম থেকেও কোনো বার্তা পায়নি। মহাকাশে কয়েক হাজার মাইলের মধ্যেও কোনো যান কিংবা অনাকাক্সিক্ষত কিছু থাকলে তা সাথে সাথে জানিয়ে দেয় কম্পিউটার। কিন্তু এই যানটা তো মনে হচ্ছে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। বুকটা ধক করে উঠল রুডোর, সিস্টেমে কোনো গোলমাল হয়েছে নিশ্চয়ই। দলনেতাকে এখনই জাগাতে হবে ঘুম থেকে। তার আগে নিজেই পরিস্থিতিটা ভালো করে বুঝে নিতে যোগাযোগ মডিউল অন করল রুডো। কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করল; কিন্তু কোনো লাভ হলো না। কোনো সিগনালই আসছে না। তবে কিছুক্ষণ পর একটি অচেনা সিগনাল পেল রুডো। কয়েক সেকেন্ড দ্বিধা করে অবশেষে রিসিভ করল সেটি। ভেসে এলো অচেনা কণ্ঠস্বর। ‘তোমাদের বহু আগেই আমরা নিনি গ্রহে অভিযানের পরিকল্পনা করেছি।’ বলল সেই কণ্ঠ। ‘ওটা আমাদের গন্তব্য, তোমরা সেখানে যেতে পারবে না।’
‘কারা তোমরা’ ভয় আর আতঙ্ক চেপে রেখে অনেক কষ্টে প্রশ্নটা করল রুডো।
‘মহাজগতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান আর উন্নত প্রাণী। তোমাদের মহাকাশযানের সিস্টেম অচল করা দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমাদের ক্ষমতা। তোমাদের যান এখন পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে।’ মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্র্রোত বয়ে গেল রুডোর। কিছু একটা করতে হবে। সবার আগে শীতল ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে হবে দলনেতাকে।
‘তোমাকে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে রুডো।’ এবার কথা বলে উঠল আরেকটি কণ্ঠ। এই কণ্ঠটি চিনতে পারল রুডো। মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটারের যান্ত্রিক কণ্ঠ। তাহলে কি শত্রæর কবল থেকে মুক্ত হয়েছে যান! আবার কম্পিউটার বলল, ‘মহাকাশযানের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে তোমার হেয়ালিতে।’ এবার সম্বিত ফিরে পেল রুডো। আশপাশে তাকিয়ে দেখল নিজের শয়নকক্ষেই রয়েছে সে। জানালার কাছে নয়, বিছানায়। এতক্ষণ কী ঘটেছে সেটি বুঝতে চেষ্টা করল। কম্পিউটার আবার বলল, ‘একাকিত্ব মানুষকে নানা সমস্যায় ভোগায়। তোমার দুই সঙ্গী শীতল ঘুমে, তুমি এক সপ্তাহ ধরে একাকী সময় কাটাচ্ছ। ক্লান্তি আর অবসাদে এতক্ষণ দুঃস্বপ্ন দেখছিলে। তোমার দ্রæত শীতল ঘুমে যাওয়া উচিত। এক ঘণ্টার মধ্যে না গেলে জোর করে শীতল ঘুমে পাঠানোর নির্দেশ রয়েছে আমার ওপর।’

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.