অগ্নিগর্ভ জেরুসালেম
অগ্নিগর্ভ জেরুসালেম

অগ্নিগর্ভ জেরুসালেম

অধ্যক্ষ মো: নাজমুল হুদা

জেরুসালেম নগরীকে ইসরাইল রাষ্ট্রের রাজধানী করার পরিকল্পনা বাস্তব রূপ লাভ করতে চলেছে। পশ্চিমা বিশ্ব তথা আমেরিকার প্রথম পরিকল্পনা ছিল পৃথিবীতে বিক্ষিপ্ত ইহুদি জাতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বল প্রয়োগ করে তাদের জন্য একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘বেলফোর ঘোষণা’র মধ্য দিয়ে সে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল। সম্পূর্ণ ধর্মীয় ভিত্তিতে ইহুদিদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে দখলদারদের একটি অবৈধ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে। সে রাষ্ট্রের নাম ইসরাইল। ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের বাস্তুচ্যুত করে ইহুদিদের পুনর্বাসনের সূচনা করা হয় এবং তাদের পুনর্বাসন অব্যাহত থাকে। এ প্রক্রিয়ায় ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল নামক অদ্ভুত রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়া হয়। একাধিকবার আরব-ইসরাইল যুদ্ধের মাধ্যমে এই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে আর আরব রাষ্ট্রগুলোর সীমানা ক্রমাগত সঙ্কুচিত হয়েছে। এ দিকে, ইসরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সীমানা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানত আরব রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগে ইসরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এত দিন পর্যন্ত তেলআবিব ছিল ইসরাইলের রাজধানী। সম্প্রতি জেরুসালেমকে রাজধানী করার প্রক্রিয়ায় তার মুরব্বি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন এই নগরীকে রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে। আমেরিকার এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিরা প্রবল প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। এটা দমন করতে গিয়ে ইসরাইলি বাহিনী কয়েকজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ফলে সমগ্র বিশ্বে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মূলত ইসরাইল বা ইহুদি জাতি ছিল হজরত মুসা আ:-এর উম্মত বা অনুসারী। পবিত্র কালামে পাকে এই জাতি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রয়েছে। হজরত মুসা আ: মিসরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

বনি ইসরাইল তাকে বলেছিল, পবিত্র কালামে পাকের ভাষায়- ‘(হে মুসা!) আমরা তোমার আগমনের আগেও নির্যাতিত হয়েছি এবং তোমার আগমনের পরেও।’ (সূরা আরাফ : আয়াত-১২৯)। ফেরাউনের অত্যাচারে হজরত মুসা আ: মিসর থেকে বনি ইসরাইলকে সাথে নিয়ে ফোরাত নদী পার হয়ে ফিলিস্তিনে আগমন করেন। তারপর পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত হন। তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে অত্যাচারী লোকদের বহিষ্কার করেন। সে কারণে ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে জেরুসালেম পবিত্র নগরী। অপর দিকে, খ্রিষ্টান সম্প্রদায় হজরত ঈসা আ:-এর উম্মত বা অনুসারী। মুসলমানেরাও হজরত মুসা আ: ও ঈসা আ:কে নবী হিসেবে মান্য করে। হজরত ঈসার নবুওয়াতের মিশন বায়তুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনেই বিকশিত হয়েছিল। সে কারণে বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুসালেম নগরী খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে হজরত ঈসা ও তার মা মরিয়মের স্মৃতিবিজড়িত অত্যন্ত পবিত্র স্থান। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে জেরুসালেম নগরীর ওপরে ইহুদিদের চেয়ে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের দাবি অধিক বলা যায়।

অপর দিকে, ইসলামের শিক্ষার অনুসারে- সব নবীর ওপরে ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করা কর্তব্য। শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ সা: মেরাজের সময়ে সর্বপ্রথম মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকে তিনি ঊর্র্ধ্বলোকে পরিভ্রমণ করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায় বর্ণিত হয়েছে- ‘তিনি পবিত্রতম, যিনি একদা রাতে তার সেবককে তার নিদর্শন দেখানোর জন্য ভ্রমণ করিয়েছিলেন। মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার সীমাকে আমি সৌভাগ্যযুক্ত করেছি, তাকে কিছু নিদর্শন দেখিয়েছি; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।’ (সূরা বনি ইসরাইল : আয়াত-০১)। মেরাজ গমন উপলক্ষে মানবজাতির ওপর আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। সে কারণে মুসলিম জাতির কাছেও বায়তুল মুকাদ্দাস অত্যন্ত পবিত্র। এ মসজিদে নামাজ আদায় করলে প্রতি রাকাতে ২৫ হাজার রাকাত নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়। ইসলামের প্রথম কিবলা ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। মহানবী সা:সহ মুসলমানেরা প্রথম ১৬ মাস বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা মেনেই নামাজ আদায় করেছিলেন। সে কারণে মুসলমানদের কাছে বায়তুল মুকাদ্দাস পবিত্র মসজিদ ও জেরুসালেম অত্যন্ত পবিত্র নগরী হিসেবে বিবেচিত।

যা হোক, মুসলিমবিদ্বেষী ইহুদি জাতি পৃথিবীতে সর্বাধুনিক শিক্ষিত জাতি হয়েও ইসরাইল নামক ধর্মীয় রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইহুদিদের অবর্ণনীয় অত্যাচারে ফিলিস্তিনি মুসলমান ও সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানরা ক্রমাগত পিছু হটছে। তারা পার্শ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলোতে উদ্বাস্তু বা অভিবাসী হিসেবে দীর্ঘকাল মানবেতর জীবন যাপন করে আসছে। আন্তর্জাতিকভাবে জেরুসালেমকে ইসরাইল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক রাজধানীর মর্যাদা না দিয়ে ধর্মীয় নগরীর মর্যাদা দেয়াই সবার কর্তব্য। তাহলে খ্রিষ্টান ও মুসলমানেরাও জেরুসালেমে তাদের ধর্মীয় অধিকার ভোগ করতে পারবে। এভাবে জেরুসালেমকেন্দ্রিক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.